জীবনে বহুবার বাঘের মতো মানুষের মুখোমুখি হয়েছি। কিন্তু সত্যিকারের বাঘের সামনে পড়িনি কখনও। এমন কী চিড়িয়াখানার বাঘ আমি তখন পর্যন্ত দেখিনি। এবার সেই বাঘের সামনে পড়ে গেলাম একদিন, একেবারে একা এক জঙ্গলে।
সেদিন বিকেল বেলা, বড়েগাঁও হাট থেকে ডিউটি শেষ করে থানায় ফিরে যাবার সময় বুলেট মোর্টর সাইকেল চালিয়ে এক পুলিশ অফিসার এসে দাঁড়িয়ে পড়ল আমার ঘরের দরজায়–ব্যাপারীজি, আভি আপকো থোরা থানেমে যানা পড়েগা। বড় সাহেব আপকো লে যানেকা লিয়ে বোলা। পুলিশ অফিসারের চোখ মুখ দেখে মনে হচ্ছিল আমাকে এ্যারেস্ট করতেই এসেছে। যদিও সেটা সে বলছেনা। তাহলে তো কেন এ্যারেস্ট করছে জিজ্ঞাসা করা যায়। ওয়ারেন্ট দেখতে চাওয়া যায়। তাই অনুকে বলি–এ বেলা আর আমার জন্য রান্না করার দরকার নেই। ফালতু চালটুকু নষ্ট হবে। ওটুকু থাকলে কাল দুপুরে তোমাদের কাজে লাগবে। আমার মনে হচ্ছে বাড়ি আসতে সেই কাল রাত আটটা নটা হয়ে যাবে।
আমার বাড়ি থেকে পাখানজুড় থানার দূরত্ব এগার/বারো মাইল। পথের দুধারেই ঘন বন। তবে সবটা বন নয়, কোথাও কোথাও পথের পাশের কিছু বন সাফ করে চাষের উপযুক্ত কিছু কিছু জমিও বের করা হয়েছে। পি.ভি ৫৬ থেকে দক্ষিণ মুখে আদিবাসী গ্রাম হারানগড় পেরিয়ে খানিকটা পথ গেলে একটা পাহাড় আছে। পাহাড়ের উপরে বাঁশ শাল সেগুন অর্জুন আমলকি আরও নানা ধরনের প্রচুর গাছ গাছালি। পাহাড় পার হলে রাস্তার দুধারে নয় নাম্বার ভিলেজের মানুষদের বেশ কিছুটা চাষের জমি আছে। নয় নাম্বার ভিলেজ এখান থেকে পূর্বদিকের দুই আড়াই মাইল দূরে। তবু এই পাহাড়টার নাম নয় নাম্বারের পাহাড়।
বড় সাহেব আমাকে থানায় নিয়ে আসতে বলেছে, থানায় গিয়ে শুনি তিনি এই কিছুক্ষণ আগে বান্দে বলে এক জায়গায় গেছেন। কখন ফিরবেন কিছু বলে যাননি। আর জানবার এখন কোন উপায়ও নেই। সে সময় মোবাইল ফোন এত সস্তা ও সর্বসাধারণের ব্যবহারযোগ্য মোটেই ছিল না।
এখন কি করা? যে অফিসারটি আমাকে নিয়ে এসেছে সে আর আমাকে এখন লকআপে দিল না। থানার সামনে বহেড়া গাছের বাঁধানো গোড়ায় বসিয়ে রাখল বড় সাহেব কখন আসবে সেই অপেক্ষায়। আমার পাহারায় রইল থানার গেটের ডিউটি সেপাই। প্রায় দু আড়াই ঘণ্টা ঠায় বসে রইলাম সেখানে। এর মধ্যে থানায় দু দুটো কেস এসে গেল। একটা মারপিটের আর একটা মোষ চুরির। তার ডায়েরি লেখা হল কিন্তু বড়বাবু এল না। এক সময় বলে গেট ডিউটির সেপাই–যাইয়ে ব্যাপারীজি–ঘুমকে চায় বায় পি পাকে আইয়ে। কিতনা দের এইসা বইঠিয়েগা। এ্যারেস্ট হো যাতা তো বাত কুছ ঔর থা, ফোকটমে বইঠে রহনা…। তা চা খেতে যেতে বলার সময় এটাও মনে করিয়ে দিল যে–আমি যেন বাড়ি চলে না যাই। কারণ আমাকে যদি এ্যারেস্ট করার জন্য আনা হয়ে থাকে–বড় সাহেব এসে আমাকে না পেলে তাকে ধমকাবে।
পশ্চিমবঙ্গে ছিল না, তবে এখানকার পুলিশ বিভাগের সঙ্গে আছে আমার যাকে বলে একটা শত্রুতামূলক বন্ধুত্ব বা বিশ্বস্ততা। তাই শুধু এটাই প্রথম নয়, আগেও এমন হয়েছে। সেটা সেই জীতেন ব্যানার্জির সাথে মারামারির সময়কার ঘটনা। গতকাল বিকালে এ্যারেস্ট হওয়া আমাকে, হাতে হাতকড়া যা নিয়মানুসারে পরানো হয়েছে, সেই পাখানজুড় থানার দুই কনস্টেবল কাকের কোর্টে নিয়ে এসে, বিচার পর্ব শুরু হবার আগে নিজেরা সরকারি পয়সায় খাবে বলে ঢুকে পড়েছিল বাসস্ট্যান্ডের এক দামি হোটেলে। আর আমাকে বিশ্বাস করে ছেড়ে দিয়েছিল কোন সস্তার হোটেলে খেয়ে আসার জন্য। হাতে হাতকড়া নিয়ে আমি একা হেঁটে হেঁটে চলে গিয়েছিলাম আধ মাইল দূরে–দুধ নদীর কিনারে–যেখানে, কাকেরে কোন কাজে এলে ছয়টাকায় ডালভাত তরকারি খাই, সেই গরিব হোটেলে।
আমি সেদিন ইচ্ছা করলে পালিয়ে যেতে পারতাম। আর তা করলে দুই বেচারার চাকরি নিয়ে টানাটানি পড়ে যেত। ওদের বিশ্বাসের মর্যাদা দিতে সেটা করতে পারিনি। ওরা খেয়ে দেয়ে পরম নিশ্চিন্তে বসেছিল আমার ফেরবার অপেক্ষায়। আর আমি ফিরে এসেছিলাম। এই কারণেই এখন সেপাই বলতে পারছে–যান চাটা খেয়ে আসুন।
সে যাইহোক, চাটা খেয়ে ফিরে এসে আবার বসে পড়লাম সেই গাছের গোড়ায়। রাত যখন মনে হয় নটা কি সাড়ে নটা তখন এলেন বড় সাহেব। এসে আমাকে দেখে মাথা নাড়লেন–আপ আ গিয়া!
বলি–আমি আসিনি, আমাকে আনা হয়েছে।
–আমি আনতে বলেছিলাম।
–কেন?
–কাল আপনাদের কি পোগ্রাম?
-–কি পোগ্রাম মানে! ঠিক বুঝলাম না!
উনি বুঝিয়ে বললেন–এবং জানতে চাইলেন-–কালকে ছত্তিশগড় মুক্তিমোর্চা যে ছত্তিশগড় জুড়ে থানা তহসিল এসবের সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে তাতে আমাদের পারালকোটবাসী কর্মী সমর্থকরা অংশ নেবে কিনা! সত্যি বলতে কী আমি এটা জানতামই না। আর তো দল্লীর সাথে তেমন যোগাযোগ নেই। তাছাড়া পেপারও পড়িনি। তাই বলি–আমরা কিছু করব না। বলতে পারি না, যে কিছু করার মত জনবলও আর আমাদের নেই।
ব্যাস! এটাই জানবার ছিল। স্বস্তির শ্বাস ছেড়ে বলেন তিনি–যান আপনি। অনেক রাত হয়ে গেছে। আর আপনাকে আটকাব না।
উনি তো বলে দিলেন যান। কিন্তু এখন এই এগার বারো মাইল পথ যাব কি করে! পথঘাট একেবারে শুনশান। একটাও জিপ লরী নেই। শেষ বাসটা চলে গেছে বিকেল চারটেয়। অথচ আমাকে তো যেতেই হবে। না গেলে বাড়ির লোক চিন্তায় থাকবে। অনুকে বলে এসেছি আমি হয়ত এ্যারেস্ট হবো। এই রাতে আমি না গেলে সে কী ঘুমাতে পারবে? স্বামী লকআপে থাকলে কোন স্ত্রীর কি ঘুম আসে?ফায়েকোন ভাবে বাড়ি আমাকে যেহেব। অগত্যা আর কোনদিকে না তাকিয়ে রাতের খাবার জন্য একটা পাউরুটি কিনে হাঁটা দিলাম বাড়ির দিকে। আজ মনে হয় পূর্ণিমা আকাশে রূপোর থালার মত গোলাকার চাঁদ, যার উজ্জ্বল জোছনায় ভেসে যাচ্ছে মাঠপাথার বন জঙ্গল। বেশ ফুরফুরে হাওয়া আছে। দু ঘণ্টা হাঁটলে কি বাড়ি পৌঁছাতে পারব না!
