আমি ঠিক জানি না কখন আমার মুষ্টিবদ্ধ হাত আকাশে উঠে যায় এবং সূর্যকে সাক্ষী রেখে ঘোষণা করে–নিয়োগীজি তোমায় লাল সেলাম। তোমার অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করার ভার আমার। এবং আমাদের।
০৭. নিয়োগীজির মৃত্যুর পরে
নিয়োগীজির মৃত্যুর পরে মোর্চার নেতারা আর তেমন করে বস্তার জেলার দিকে দৃকপাত করার ফুরসত পাননি। তখন ভিলাই তাদের কাছে এক মরণ বাঁচন সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। শিল্পপতিরা ও সমস্ত রাজনৈতিক দল মিলে মুক্তিমোর্চাকে শেষ করে দেবার ঘৃণ্য অপচেষ্টা শুরু করে দেয়। আর মোর্চা তার সর্বশক্তি নিয়ে ভিলাইয়ের শ্রমিক আন্দোলনকে জয় যুক্ত করবার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ে। নিয়োগীজিকে হত্যা করে দিতে পারার ফলে এবং শাসন প্রশাসন থেকে সেভাবে কোন চাপ না আসায় শিল্পপতিদের মনোবল তখন তুঙ্গে। তারা আর মোর্চা নেতাদের সঙ্গে শ্রমিক সমস্যা সমাধানের জন্যে কোন রকম আলোচনায় বসতে রাজি ছিল না। যখন কোনভাবে আর মালিক পক্ষকে সরকারি মধ্যস্থতায় আলোচনার টেবিলে বসানো গেল না তখন মুক্তি মোর্চা এক রেল অবরোধ কর্মসূচি গ্রহণ করে। প্রায় কুড়ি হাজার মানুষ রেল লাইনের উপর বসে পড়ে এই দাবি নিয়ে যে সরকারকে নিয়োগী হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও মজুরদের ন্যায্য দাবি পূরণে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। তখন বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী সুন্দর লাল পটোয়ার নির্দেশে পুলিশ প্রশাসন মজুরদের উপর এক ভয়ংকর আঘাত হানে। তারা বৃষ্টির মত গুলি চালিয়ে আন্দোলনরত মজুরদের ষোলজনকে হত্যা আর দেড়দুশো জনকে মারাত্মক ভাবে ঘায়েল করে দেয়। তাদের একটাই উদ্দেশ্য থাকে যত বেশি সংখ্যক মানুষকে খুন করে আন্দোলনকারীদের আতঙ্কিত করে ফেলা। বলা চলে এতে তারা সফল হয়। এরপর মুক্তিমোর্চা ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়তে থাকে। তারপক্ষে আর সেভাবে শক্তিশালী আন্দোলন সংগঠিত করা সম্ভব হয় না। আন্দোলন হয় তবে তা দুর্ধর্ষ মালিক শ্রেণিকে নত করার পক্ষে যথেষ্ট নয়, নিয়োগীজির মত সবল সাহসী নেতৃত্ব না থাকায় মোর্চা মালিক এবং সরকারের মিলিতআক্রমণের সামনে দাঁড়াতে পারে না।
নিয়োগীগির অন্তিম সময়ে তার মৃতদেহের সামনে আমরা যে তিনজন বাঙালী উপস্থিত ছিলাম যাদের সাথে পশ্চিমবঙ্গের একটা যোগ আছে তার একজন ডাক্তার পুণ্যব্রত গুণ। নিয়োগীজির মৃত্যুর অল্প কিছুদিন পরে মুক্তিমোর্চার স্থানীয় নেতাদের সাথে তার মতোবিরোধ ঘটে এবং তিনি কলকাতায় ফিরে যান, এবার চলে গেলেন ডঃ শৈবাল জানা, উনি কলকাতায় গিয়ে দুর্বার মহিলা সমিতিতে যোগ দেন। কিন্তু আমি কোথায় যাব! আমার তখন যাবার মত কোন জায়গা ছিল না বলে থেকে গিয়েছিলাম। তখন সংগঠনে নিজেকে ভীষণ উপেক্ষিত বলে মনে হতো। কারণ আমি বা বস্তার জেলার সংগঠন নিয়ে তখন মোর্চার নেতাদের আর কোন মাথা ব্যথা ছিল না। আছে থাকুক না থাকে তো যাক এমন একটা মনোভাব প্রকাশ পেত প্রত্যেকের ব্যবহারে। সংগঠনের ভগ্নদশা, নেতাদের অমনোযোগ সংগঠনের সঙ্গে যারা যুক্ত তাদের ব্যক্তি জীবন ও রাজনৈতিক ভূমিকাকে প্রভাবিত না করে পারে না। মানুষ এক্ষেত্রে হতোদ্যম হয়ে পড়াটা অস্বাভাবিক নয়।
আমার তখন সাংসারিক অবস্থাও বড় খারাপ। আমি আগে তো কখনও ব্যবসা করিনি, ফলে কোন মাল কখন কতটা স্টক করা দরকার, কখন স্টক খালি না করে দিলে পুঁজি আটকে যায় তার কোন পূর্বধারণা নেই। আমার দোকানটি স্কুল পাঠ্য বইয়ের দোকান। প্রধানতঃ যার বিক্রয় নতুন সেশন শুরু হবার পর এক দেড়মাস ভালো চলে। এবং এর ক্রেতার সংখ্যাও সীমিত। একবার বই কেনা হয়ে গেলে মানুষ আর সারা বছর বইয়ের দোকানের দিকে ফিরেও তাকাবে না। গত বছর প্রথম দু সপ্তাহ ধূম বই বিক্রি হচ্ছিল বলে না বুঝে কাঁকেরের নাজিব কুরেশির কাছ থেকে একগাদা বই তুলে নিয়ে এসেছিলাম। সে সব বই আর বিক্রি হয়নি। আশা করেছিলাম এ বছর বিক্রি হয়ে যাবে। কিন্তু তা আর হল না। মধ্যপ্রদেশ শিক্ষাপর্ষদ সে সব বই বাতিল করে নতুন সিলেবাস চালু করে দেওয়ায় সর্বনাশ হয়ে গেল আমার। এখন যে নতুন বই তুলবো সেই পুঁজি আর নেই। প্রচুর টাকা লোকসান দিয়ে ব্যবসা ডুবে গেল আমার। নাজিব কুরেশি নিয়োগীজি জীবিত থাকাকালীন সময়ে আমার প্রতি যে বদান্যতা দেখিয়ে ছিল তা উবে গেছে। কারণ তখন তার বিশ্বাস ছিল, বাকিতে বই এনে আমি যদি তার মূল্য পরিশোধ দিতে না পারি, নিয়োগীজি দিয়ে দেবেন। এখন তো তিনি নেই, তাই বাকিতে মাল দেবার ঝুঁকি নিতে রাজি হল না। বলল-আমি আর ব্যবসা দেখাশোনা করি না। আমার ভাইয়েরা দোকান চালাচ্ছে। ওরা নগদ ছাড়া মাল দেবে না বলেছে।
নিয়োগীজি না থাকায় এবং মোর্চার নেতৃত্ব আমাদের সাথে কোন যোগাযোগ না রাখায় কাপসীর মুক্তিমোর্চার ছেলেরা হতাশ নিরাশ হয়ে একে একে অন্য দলে চলে গেল। পারালকোট সর্ব অর্থে একটা কুয়ো। সমুদ্রের সঙ্গে সংযোগ থাকলে তবেই কুয়োয় জল থাকে। যদি সমুদ্রের জলস্তর নিচে চলে যায় কুয়ো শুকিয়ে খটখটে। এখন আমি সারা অঞ্চলে একেবারে একা হয়ে গেলাম। এই সুযোগে জীতেন ব্যানার্জিরা নানাভাবে আমাকে বিপদে ফেলার চেষ্টা চালাতে লাগল। বিজেপির কাপসী পঞ্চায়েতের সরপঞ্চ অরুণ দত্ত চাপ দিতে লাগল তাদের দলে যোগ দেবার জন্য। আর পুলিশ? তারাও মাঝে মাঝে থানায় ডেকে নিয়ে এসে জিজ্ঞাসাবাদের নামে ঘণ্টার পর ঘন্টা বসিয়ে রেখে কেন কে জানেহয়রান করা শুরু করে দিল। এ সময়ে বস্তার জেলা জুড়ে পি.ডব্লু.জি-র ব্যাপক সক্রিয়তা, পুলিশ তো মুক্তিমোর্চাকে ওদের সহযোগী সংগঠন বলে মনে করে।
