নিয়োগীজি আবার উচ্চন্যায়ালয়ে আপিল করেন। ন্যায়ালয় এই আদেশের বিরুদ্ধেও স্থগিতাদেশ দেয়। সমস্ত পরিকল্পনা এভাবে ব্যর্থ হয়ে যেতে দেখে ক্ষিপ্ত উদ্যোগপতিরা এবার নিয়োগীজিকে হত্যা করার উদ্যোগ নেয়। নেপালে গিয়ে অস্ত্র এবং মজফরপুর থেকে ভাড়াটে খুনি পল্টন মল্লারকে নিয়ে আসা হয়।
রাজ্য সরকারের কাছে কোন সুবিচার পাবার আশা আর ছিল না তাই ৫০ হাজার মানুষের সাক্ষর সম্বলিত পত্র এবং ৪০০ জন মজদুর প্রতিনিধি নিয়ে ১০ই সেপ্টেম্বর ‘৯১ দিল্লীতে সুবিচার চাইতে গেলেন নিয়োগীজি। ১১ এবং ১২ দু’দিন শ্রমশক্তি ভবনের সামনে ধর্না দিলেন। কিন্তু শ্রম পুত্রদের আবেদন শ্রমশক্তি ভবনের নিরেট দেওয়াল ভেদ করে কুম্ভকর্ণদের নিদ্রা ভাঙাতে অসমর্থ হল। ১৬ই সেপ্টেম্বর বহু কষ্টে দেখা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে। কিন্তু ১ লক্ষ মজুরদের প্রতিনিধিদের জন্য মাত্র ২৫ সেকেন্ডের বেশি সময় বরাদ্দ না থাকায় কোন কথা হল না। নিয়োগীজি দেখা করেছিলেন রাষ্ট্রপতি এবং বিরোধী দলনেতা লালকৃষ্ণ আডবানীর সাথেও। কিন্তু ভিলাইয়ের লাখ খানেক মজুরের জন্য তারা কোন মাথা ঘামায়নি। উনি তাদের বলেছিলেন নিজের প্রাণনাশের আশঙ্কার কথাও। তাতে কোন ফল ফলেনি।
ফেরবার সময় নিয়োগীজি ২২ ও ২৩শে সেপ্টেম্বর ভিলাইয়ে থেকে সুন্দরলাল পটোয়ার সাথে দেখা করার চেষ্টা করেন। কিন্তু পটোয়া দেখা করেননি। পটোয়ার মন্ত্রীসভার এক মন্ত্রী প্রস্তাব রাখে যদি নিয়োগী ভারতীয় জনতা পার্টিতে যোগ দেয় তাহলে মজদুর সমস্যার কিভাবে সমাধান করা যায়, দেখা হবে। নিয়োগীজি নিজের বিচার ধারা থেকে সরে আসতে রাজি ছিলেন না। মন্ত্রী তখন আভাসে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দেন এর ফল ভালো হবার নয়। এটাই ছিল হত্যার কার্যকারণ।
নিয়োগীজি ভিলাই ফিরে আসবার সাথে সাথে সক্রিয় হয়ে ওঠে খুনি চক্র। উদ্যোগপতিদের অর্থ অস্ত্র বিভিন্ন দলের রাজনেতাদের সমর্থন এবং শাসক পক্ষের আশীর্বাদে সাহসী ঘাতকদের অপেক্ষা থাকে একটা সুযোগের। সে সুযোগ তারা ২৮শে সেপ্টেম্বর ভোর রাতে পেয়েও যায়। ঘরে শুয়ে বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন নিয়োগীজি। জানালা খোলা ছিল। খোলা জানালা দিয়ে ওনার বুকে গুলি চালায় ভাড়াটে খুনি।
পোস্ট মর্টেমের পর ভিলাই থেকে দল্লী নিয়ে আসা হয়েছে ওনাকে, এখন উনি শুয়ে আছেন একটা খোলা ট্রাকে শহীদ হাসপাতালের সামনের বড় রাস্তায়।
আমি সামনে গিয়ে অভিবাদন করি। অন্য দিনের মত আজ উনি প্রত্যুত্তরে নিজের বদ্ধমুষ্টি আকাশে তোলেন না। মনে হয় যেন গভীর কোন স্বপ্নের মধ্যে ডুবে আছেন। মুখে এখনো লেগে আছে চির চেনা সেই অমলিন হাসির রেশ। যে হাসি ঘাতকের বুলেটে ছিনিয়ে নিতে পারেনি। ছিনিয়ে নিতে পারে না। মৃত্যুও পারে না সেই স্বপ্নের সমাপ্তি আনতে–সব জমিতে জল, সব শরীরে স্বাস্থ্য। সব মুখে হাসি। সব জীবনে সুখ। সব মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার।
ইচ্ছা করে এখন আমি আকাশ বাতাস মাটি কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠি–উঠুন নিয়োগীজি উঠে পড়ুন ওই ফুলশয্যা ছেড়ে। অসময়ে এ ঘুম আপনার সাজে না। নিয়োগীজি উঠে দেখুন এখনও সুসজ্জিত লক্ষ পদাতিক আপনার নির্দেশের জন্য দাঁড়িয়ে আছে। আপনার চোখের দিকে তাকিয়ে যারা জেগে উঠতে শিখেছিল। চিনতে শিখেছিল ধ্রুব তারা। আপনি ঘুমিয়ে থাকলে কে তাদের পথ চিনিয়ে সঠিক লক্ষ্যে এগিয়ে নিয়ে যাবে?
এখনো যুদ্ধ জয় হয়নি। শত্রু দুর্গে শেষ আর্তনাদ না শোনার আগে আপনার বিশ্রাম নেই, ছুটি নেই। দেখুন নিয়োগীজি লক্ষ লক্ষ মানুষ এখন আপনার মুখের দিকে তাকিয়ে কাঁদছে। আপনি ঘুমিয়ে থাকলে কে তাদের চোখের জল মুছে দিয়ে আগুন হবার ইতিহাস শোনাবে। কে বলবে–এই তপ্ত অশ্রু হোক শক্তি, শোকের আগুন জ্বলুক দ্বিগুণ হয়ে।
চারদিকে তাকাই আমি। সমস্ত বাতাবরণ কেমন যেন নিশ্চুপ। তারই মাঝে মানুষের কান্না ভেজা শ্লোগান কমরেড শংকর গুহ নিয়োগী অমর রহে। কখন যেন একটু অসাবধান হয়ে পড়েছিলাম। বুকের মধ্যে থেকে একটা প্রবল জলপ্রপাত আছাড় খেয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। আর তখনই মনে পড়ে গেল আমার নেতা নিয়োগীজির শেষ নির্দেশ—”আমাদের উপর অতীতে অনেক বার হামলা হয়েছে। হয়ত আরো হামলা হবে। এমন ঘটনাও ঘটতে পারে যা শুনে তোমাদের লোমকুপ পর্যন্ত খাড়া হয়ে উঠবে…।
সেই দিন উঠে দাঁড়িও বন্ধু। আর তা না পারলে আমাদের বলিদানের কথা মনে করে ফেলো দু ফোঁটা চোখের জল।”
আমি এখন চোখের জল ফেলছি কেন! আমাকে তো নিয়োগীজি এত নরম এত অক্ষম করে গড়েননি। আমাকে তো ঘটোৎকচের মত শত্রুর সামনে পাহাড় হয়ে দাঁড়াতে হবে। দু হাত যদি চোখের জল মুছতে ব্যস্ত থাকে অস্ত্র ধরবো কি করে!
চোখ মুছে সামনে তাকাই। নিয়োগীজিকে নিয়ে এখন বিশাল এক পদাতিক বাহিনী সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে। যেমন ভাবে মানুষকে আগাতে দেখেছি রায়পুর ভিলাই এবং এই দল্লী শহরে। আর মনে হয় না, উনি আমাদের মধ্যে নেই। মনে হচ্ছে পাহাড় নদী মিছিল হয়ে, আকাশ বাতাস স্বপ্ন হয়ে–সংগ্রামী মানুষের প্রেরণা বিজয় ভবিষ্যৎ হয়ে মিশে গেছেন।
বাংলার এক কবি লিখেছিলেন–বিপ্লব স্পন্দিত বুকে মনে হয় আমিই লেনিন। এখন শ্রেণিশত্রুর প্রতি তীব্র ক্রোধে মনে হয় আমিই শংকর গুহনিয়োগী। তার আরদ্ধ কাজ সম্পন্ন করার দায় ভার আজ আমার কাঁধে।
