এ সময়ে জিপের আওয়াজ পাওয়া গেল। ঘরের সামনে জিপ থামলে তা থেকে নেমে এলেন। নিয়োগীজি। সাথে আরো তিনজন। এসে আমাদের দেখে বললেন–কখন এসেছেন? এলাকার কি খবর? খিদে লেগেছে, আগে খেয়ে নেওয়া যাক পরে সব শুনবো।
সুধা চলে গেল খাবার পরিবেশনে। নিয়োগীজি লেগে গেলেন পেঁয়াজ কাটতে। অন্য একজন গেলাসে জল ঢালতে। আগে জানা ছিল না দুজন তোক বেড়ে যাবে। রান্না হয়েছিল পাঁচজনার। এখন সেই খাবার সাত ভাগ করে সাত থালায় পরিবেশন করল সুধা। আহা রে! সে কি খাবার, দেখে চোখ ফেটে জল আসতে চায়। আতপ চালের দলা দুলা ভাত আর সাথে না হলুদ না লঙ্কা না কোন ফোড়ন–খানিকটা অরহরের সেদ্ধ ডাল। খাবার টেবিল ছোট। নিয়োগীজি তো বসারও জায়গা পেলেন না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চার গ্রাস ভাত খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুললেন।
কাকেরে পরিবর্তন নামে একটা এন.জি.ও আছে। যার প্রধান রত্নেশ্বর নাথ। একবার সেখানে জনকলাল ঠাকুর ও আমার রাতে থাকতে হয়েছিল। রাতের খাবারে মাছ মাংস তো ছিল না তবু ঝাল টকমিষ্টি আঠাশ রকম পদ ছিল সেইনৈশ ভোজে। এত রকম পদ আমি কোন বিয়ে বাড়িতেও দেখিনি। দেখেছিলাম একমাত্র নাগপুর টাইমস পত্রিকার সম্পাদক–যার ভাইনা কে যেন মহারাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী ছিল–সেই বাড়িতে। স্বামী অগ্নিবেশ অনুপ সিং আর আমি খেয়েছিলাম সে বাড়িতে। নাগপুর টাইমসের মালিকের বা সমাজ সেবক রত্নেশ্বর নাথের সাথে তুলনা করছি না, লোহা খাদানের একজন সাধারণ মজুরেরও দুপুরের ভোজনে ডালের সাথে কমপক্ষে একটা ভাজা কিছু থাকে, নিদেন পক্ষে এক কুচি আচার–নিয়োগীজির তাও ছিল না।
এত ত্যাগ এত কৃচ্ছসাধন-দুঃখ কষ্টের স্বেচ্ছাবরণ আমি ঠিক জানিনা ভারতবর্ষের এই মাপের নেতা আর কেউ করেছেন কিনা! আজ আমার মনে হয় ওই ত্যাগ, কৃচ্ছসাধনের উদ্দেশ্য সফল হয়েছে নিয়োগীজির। মানুষের মনে যে শ্রদ্ধার চিরস্থায়ী আসন তিনি পেয়েছেন তা এক অমূল্য অর্জন, মহাপুরুষদের কামনার ধন।
…আজ আবার দেখতে এসেছি আমার পরম শ্রদ্ধেয় কমরেড শংকর গুহ নিয়োগীকে। আজ ১৯৯১ সালের ২৮শে সেপ্টেম্বর! দল্লী শহীদ চকের সামনে ফুল মালায় আবিরে সজ্জিত নিয়োগীজি আজো শুয়ে আছেন। ছেচল্লিশটা বছর বড় কঠিন পরিশ্রমের পর ক্লান্ত হয়ে চির ঘুমে ঘুমিয়ে পড়েছেন নিপীড়িত জনতার সেই সদা জাগ্রত প্রহরী।
১৯৮৯ সালের ২৬শে জুলাই নিয়োগীজির নেতৃত্বে সর্ব প্রথম একটি আন্দোলন হয় জামুলের সিমেন্ট কারখানায়। গত তিরিশ বছরের মধ্যে এটাই প্রথম আন্দোলন যাতে ভিলাইয়ের শ্রমিক শ্রেণি জয়ের স্বাদ পায়। দীর্ঘ পরাজয়ের পর এই বিজয় শ্রমিকদের মনোবল তুঙ্গে তুলে দেয়। ফলে ভীত উদ্যোগপতিরা সংঘবদ্ধ হয়ে সিদ্ধান্ত নেয়–এই প্রথম এই শেষ। আর কোন আন্দোলনে নিয়োগীকে জিততে দেওয়া যাবে না।
১৯৯০ সালের সেপ্টেম্বরের একত্রিশ তারিখে নিয়োগীজি ভিলাইয়ের পাঁচটি প্রধান শিল্পদ্যোগে আলাদা আলাদা দাবি সনদ পেশ করেন। যার মধ্যে মুখ্য দাবি থাকে বেঁচে থাকার মত মজুরি। যা শ্রম আইন দ্বারা ঘোষিত তা দিতে হবে এবং শিল্প যখন স্থায়ী, ঠিকাদারি প্রথার বিলুপ্তি ঘটিয়ে মজুরদের স্থায়ী করতে হবে। কিন্তু মালিক পক্ষ “লাল হারা” ইউনিয়নের নিয়োগীজির কোন দাবি মানতে রাজি ছিল না।
আন্দোলন শুরু হয়েছিল আনুষ্ঠানিক ভাবে ১৬ই নভেম্বর ‘৯০ থেকে। মালিক পক্ষ তখন থেকেই মজুরদের উপর গুণ্ডা এবং পুলিশ দিয়ে হামলা চালানো শুরু করে দেয়। কাজ থেকে ছাঁটাই করে দেওয়া হয় প্রায় সাড়ে চার হাজার মজুরকে মিথ্যা কেসে জেলে ঢোকানো হয় কয়েকশো জনকে। কিন্তু তাতে আন্দোলনে কোন ভাটা পড়ে না।
এই সময় উদ্যোগপতিরা এক ঘৃণ্যচাল চালে নিয়োগীজিকে ফাঁসিয়ে দেবার জন্য। ৬০ লক্ষ টাকার ইনসুরেন্স করার দেড় মাস পরে আর.কে ইন্ডাস্ট্রিজে আগুন লাগিয়ে দোষ চাপানা হয় নিয়োগীজির উপর। কিন্তু তাদের চালাকি সফল হয় না। নিয়োগীজি সত্য প্রকাশের জন্য সি. বি. আই.তদন্ত দাবি করে বসেন। কয়েক দিন পরে ভিলাই টাইমস এর সাহসী সম্পাদক দেবী দাস এই আগুন লাগানো চক্রান্তে কে বা কারা জড়িত তা তথ্য সহকারে জনসমক্ষে প্রকাশ করে দেন। ফলে মালিকপক্ষের গুণ্ডারা তার প্রাণনাশের চেষ্টা করে। ছুরিকাহত হয়ে কোন ক্রমে প্রাণে বাঁচেন তিনি।
যখন অগ্নিকাণ্ডে নিয়োগীজিকে কিছু করা গেল না তখন শোষক শাসক মিলে শুরু করল নতুন ষড়যন্ত্র। ১৯৯১ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারী ৭২টা সাজানো মামলায় নিয়োগীজিকে গ্রেপ্তার করে জেল কুঠুরিতে বন্ধ করা হল। সারা দেশ এই গ্রেপ্তারির বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। মোর্চার পক্ষ থেকে উচ্চ ন্যায়ালয়ে নিয়োগীজির মুক্তির জন্য আবেদন জানানো হয়। উচ্চ ন্যায়ালয়ের ন্যায়াধীশ নিয়োগীজিকে ব্যক্তিগত মুচলেকায় মুক্তি দিতে গিয়ে টিপ্পনি করেন–নিয়োগী একজন প্রতিষ্ঠিত শ্রমিক নেতা। সে কারণে ন্যায়ালয় তাকে ব্যক্তিগত মুচলেকায় মুক্তি দেবার আদেশ দিচ্ছে। নিয়োগী এমন একজন মান্যগণ্য মজদুর নেতা যে সর্বদাই সমাজের নিচু স্তরের মানুষের হিতে কর্মরত। তাকে জেলে বন্ধ করে রাখা ন্যায়ের পক্ষে কখনো সঠিক নয়।
এবারও ব্যর্থ হল মালিক পক্ষের চক্রান্ত। এবার উদ্যোগপতিগণ ও বিজেপি সরকার আর এক নতুন ষড়যন্ত্র শুরু করল। মুখ্যমন্ত্রী সুন্দরলাল পটোয়ার নির্দেশে দ্রুগ জেলাশাসক ১৯ দফা কারণ দর্শাও নোটিশ দিয়ে ১৮ জুলাই ’৯১ নিয়োগীজিকে ‘জেলাবদর’ করার প্রয়াস শুরু করে। সেই ১৯ দফার কয়েক দফা এই রকম–লাগাতার মজুরদের নিয়ে আন্দোলন, আতঙ্ক ছড়ানো, মজদুরদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার ও আদিবাসী কন্যাকে বিবাহ। এই সব অপরাধের জন্য তাকে ছত্রিশগড় ছেড়ে চলে যেতে হবে।
