নিয়োগী এখানে পৌঁছে যাবার পর হাড়কম্পন শুরু হয়ে গেল দালাল ইউনিয়ন আর রক্তচোষা মালিক পক্ষের। তখন মধ্য প্রদেশের শাসন ক্ষমতায় বিজেপি। যার মুখ্যমন্ত্রী সুন্দর লাল পটোয়া। প্রমাদ গুনলো পটোয়ার প্রশাসন। আর বোধহয় রামভক্ত–লক্ষ লক্ষ টাকা চাঁদা দেওয়া পুঁজিপতিদের বাঁচানো গেল না।
১৯৯০-এর ২রা অক্টোবর গান্ধী জয়ন্তীর দিন ভিলাইয়ের শ্রমিক শ্রেণির প্রতি সহানুভূতি সম্পন্ন সমস্ত শ্রেণির মানুষকে জমায়েত হবার আহ্বান জানালেন নিয়োগীজি। চেষ্টা হল–সমস্ত মানুষকে সংগঠিত করে শ্রমিক শোষণের বিরুদ্ধে একটা দুর্বার গণ আন্দোলন গড়ে তোলবার।
ছত্তিশগড়ের যেখানে নিয়োগী আন্দোলন সংগঠিত করে, লাঠি গুলি নিয়ে আন্দোলন দমন করতে ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রশাসন। এবারও তার ব্যতিক্রম হল না। ভীত উদ্যোগপতিদের ইশারায় বিজেপি প্রশাসন নিয়োগীজির প্রচেষ্টা ব্যর্থ করার জন্য মাত্র ২৪ ঘণ্টা আগে ভিলাই জমায়েতের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করল। জারি হল ১৪৪ ধারা। কিন্তু হার মেনে নেবার মানুষ উনি নন। ১৪৪ ধারা ভেঙে উনি পুলিশ প্রশাসনকে শ্রমিকদের উপর আক্রমণের সুযোগ না দিয়ে ৩০/৪০ হাজার মানুষের ওই বিশাল সমাবেশ ভিলাই থেকে রায়পুরে সরিয়ে এনেতাদের খাদ্য দ্রব্য পানীয় জল, অসুস্থ হলে চিকিৎসার ব্যবস্থা সর্বশেষে একটি সফল জনসভা করে প্রশাসনকে মুখের মত জবাব দিলেন। ছত্তিশগড়ে এমন ক্ষমতা একমাত্র ওনারই ছিল। এই ঘটনায় তার সংগঠন শক্তি এবং কর্ম তৎপরতার পরিচয় পেয়ে সমস্ত পত্রপত্রিকা এবং নেতা বুদ্ধিজীবীরা এক বাক্যে স্বীকার করেছিল–নিয়োগীজি এক অসাধারণ নেতা।
উত্তর বস্তার থেকে ছয়খানা ট্রাকে দুশো কার্যকর্তা নিয়ে আমরাও গিয়েছিলাম সেই সমাবেশে। তিন দিন থেকে শুরু হয়েছিল প্রবল বৃষ্টিপাত। এ বৃষ্টি পশ্চিমবঙ্গের নয়, ছত্তিশগড়ের বৃষ্টি। বরফের মত ঠাণ্ডা সে বৃষ্টির ফোঁটা লোমকুপ থেকে ভিতরে ঢুকে হাড়ে গিয়ে কামড় বসায়। এই বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে আসছিল শুধু মানুষ আর মানুষ। দিল্লীর সভ্য শিক্ষিত মানুষ যেমন এ সমাবেশে ছিল, তেমনই ছিল বস্তার জেলার গভীর বন “অবুঝ মাড়”-এর মুড়িয়া আদিবাসী। যারা হিন্দি ভাষা বোঝে না ছত্তিশগড়ী ভাষা জানে না, জানে শুধু ভালোবাসার সেই ভাষা যে ভাষায় নিয়োগী ভাইয়া কথা বলে।
বাবুদের শহর রায়পুরে এদের জন্য কোন আশা আশ্বাস আশ্রয় ছিল না। ছিল না সমবেদনা সহানুভূতির কোন লেশমাত্র।এরা কারো সমবেদনা চাইতে আসেওনি। এসেছিল লড়াইয়ের ময়দানে কাঁধে তির ধনুক টাঙ্গি নিয়ে তাদের প্রিয় সেনাপতির আহ্বানে। অনুশাসিত সেই সেনাবাহিনীর তিন লাইনের একটা ছয় মাইল লম্বা মিছিল হয়েছিল। নিয়োগীজি সেদিন একটা ভোলা মঞ্চে দাঁড়িয়ে জনতার উদ্দেশ্যে রেখেছিলেন তার অগ্নিবর্ষী বক্তব্য। সবাই ভিজছিল, বৃষ্টিতে ভিজছিলেন তিনিও। সবাইকে জলে নামিয়ে দিয়ে একা ডাঙায় থাকার মানুষ নিয়োগীজি ছিলেন না। কোন অর্থেই ছিলেন না। তাই সবাই নিয়োগীজিকে এত আপন ভাবত। তার ডাকে এমন ভাবে সাড়া দিত।
এখনো আমার স্বপ্নের মত মনে হয় সেদিনের সেই সভা শুরু হবার দৃশ্য : পায়ের নিচে থকথকে কাদা। বসবার উপায় নেই; সব মানুষ মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে :হঠাৎ মাইকে ভেসে এল পরম শ্রদ্ধেয় নিয়োগীজির গলা–ভাই সব, হামলোগ তো কিষান মজদুর। এহি মিট্টি পানীমেই হামলোগকা জিনা-মরনা। হো সকতা হ্যায় তো আপ সব বইঠ জাইয়ে।
দুবার আর কেউ কিছু শোনবার অপেক্ষা করেনি। নিয়োগী ভাইয়া বসতে বলেছে, মাত্র দু মিনিটের মধ্যে ওই বিশাল জনসমুদ্র নিশ্চপ আসন নিয়ে ছিল সেই কাদার মধ্যে–প্রিয় নেতার বক্তব্য শোনার জন্য। তাকিয়ে দেখেছিলাম আমার সামনে পিছনে ডানে বায়ে সবাই বসে পড়েছে।
নিয়োগীজি তখন পুরোপুরি ভিলাইয়ের বাসিন্দা হয়ে গেছেন। পরিবারের সবাইকে ওখানে নিয়ে যাবেন এই রকম পরিকল্পনা। তখন উনি আর দল্লী আসবার বিশেষ সময় পান না। আমাদের খুব দেখা করবার দরকার ছিল। তাই একদিন আমি আর নাজিব কুরেশি দুজনে গেলাম ভিলাই। সেক্টর নাইনের যে বাসায় উনি থাকতেন সেখানে তখন উনি ছিলেন না। কি আর করার, আমি আর নাজিব অপেক্ষায় বসে রইলাম সেই ঘরে।
ঘরে কোন লোক নেই। মাত্র এক জন আঠাশ তিরিশ বছরের সুন্দরী মহিলা রান্না করছে। পরে জেনেছিলাম-এর নাম সুধা ভরদ্বাজ। সে এল এল বি পাশ। এবং রায়পুর কোর্টে প্র্যাকটিস করে। আমার মাথা সত্যি সত্যি ঘুরে গিয়েছিল। একজন উচ্চশিক্ষিত মানুষ–এ সব মানুষ আমি যা জানি সে হল, রান্না করা বাসন মাজা এ সব শ্রমের কাজকে এড়িয়ে চলে। যারা এগুলো করে তাদের ঘৃণা করে ছোট লোক বলে। কিন্তু সুধা নামের এই মেয়ে উকিল হয়েও রান্না করছে।
এটাই শংকর গুহ নিয়োগীর শিক্ষা। সে শিখিয়েছে, কোন কাজ ছোট নয় কোন কাজ বড় নয়। এই শিক্ষায় শিক্ষিত বলে ডা: শৈবাল জানা সকালবেলা হাসপাতালে রাউন্ড দিতে গিয়ে মেঝের এক জায়গায় জল পড়ে আছে দেখে নিজেই তোয়ালে টেনে মুছতে শুরু করে দেন। কে সাফাই কর্মী, তাকে হুকুম দিয়ে দায় সারেন না।
বেলা তখন প্রায় একটা বেজে গেছে। খিদেয় পেট চো চো করছে আমার। ভাবছি কখন রান্না হবে আর কখন আমাদের খেতে দেবে। মনে খুব আনন্দও হচ্ছে। এত বড় নেতার বাসা, নিশ্চয় ভাল মন্দ কিছু রান্না হচ্ছে। কিন্তু রান্না হয়ে গেলে সুধা নামের সেই মেয়ে আমাদের খেতে দিল না। খাবার দাবার ঢাকা দিয়ে রেখে এক গোছ পেপার নিয়ে পড়তে বসে গেল। নাজিব তখন শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে খিদের জ্বালায়। আর আমি ঘুমোতে পারছি না সেও ওই খিদের জ্বালায়। খিদে দুজনার উপর দুরকম প্রভাব ফেলেছে। সুধা পেপার পড়ছে আর গুরুত্বপূর্ণ খবর কাচি দিয়ে কেটে ফাইলে রাখছে। এই করতে করতে বেলা তিনটে।
