মহাশ্বেতা দেবীর উপন্যাস চেটি মুণ্ডা এবং তার তির-এ পড়েছি কেমন করে একজন মানুষ চিরকালের সঙ্গে মিশে হয়ে যায় নদী পাহাড় কিংবদন্তী–অবিনশ্বর। যা একমাত্র মানুষই পারে। শংকর গুহ নিয়োগী তা পেরেছেন। এখন আর এ কথা কোন প্রমাণের অপেক্ষা রাখে না।
একবার নিয়োগীজির বাসায় গেছি আমি আর আমার এক বন্ধু রবি টেইলর। গতকাল উনি ভিলাই থেকে বাসায় এসেছেন। কথা যা ছিল আমাদের তা কালই ইউনিয়ন অফিসে বসে সেরে নিয়েছি। আজ শুধু আশা দিদির সাথে দেখা করে নিজস্ব কর্মাঞ্চল বস্তারে ফিরে যাব।
ইউনিয়ন অফিস থেকে এবরো থেবরো রাস্তায় মিনিট পাঁচ সাত এক শ্রমিক মহল্লার মধ্যে দিয়ে হেঁটে পৌঁছে যাওয়া যায় ওনার কুঁড়ে ঘরের সামনে। অবাক হবার মত কথা। সত্যি সত্যি একটা ভাঙা চোরা ঘরে বাস করেন লক্ষ লক্ষ মানুষের নেতা শংকর গুহ নিয়োগী। যদি উনি চাইতেন দল্লী শহরের সবচেয়ে উঁচু বাড়িটার মালিক হতে পারতেন। যদি নিজের অবস্থান থেকে সরে তথা কথিত শ্রমিক নেতাদের মত মালিক তোষক হতেন। উনি তা চাননি। চাননি শ্রমিক স্বার্থ বলি দিয়ে নিজের সুখ কিনতে। তাই সবার সমান জীবন–সবার সুখে সুখী হয়ে প্রবল দারিদ্রতার মধ্যে কাটিয়ে গেছেন সারাটা জীবন।
তখন সবে সকাল হয়েছে। আমি গিয়ে ডাকতেই নিয়োগীজির ছোট মেয়ে মুক্তি এসে দরজা খুলে দিল। তারপর আমাদের বসতে বলে কিছু না বুঝে ঘুম থেকে ডেকে তুলল নিয়োগীজিকে। মুক্তি ভুল করে ফেলেছে। আমরা তার মায়ের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলাম। আশা দিদি অবশ্য কোন দিন কোন রাজনৈতিক আলোচনায় অংশ নেন না। তবু দল্লী এলে তার সঙ্গে দেখা না করে ফিরে যেতে মন চায় না।
আজ যে মানুষটির নামে লক্ষ লক্ষ মানুষ উত্তাল হয়, একদিন সে ছিল একেবারে একা। তার পিছনে পাগলা কুকুরের মত ছুটে বেড়াত পুলিশ। তখন নিয়োগীজি লুকিয়ে থেকেছেন জঙ্গল পাহাড় গুহায়। সেই সব দিনে আমাদের প্রিয় নেতা নিয়োগীজিকে তৃষ্ণার জল, অসুখে ওষুধ পথ্য খিদের অন্ন লুকিয়ে লুকিয়ে দিয়ে এসেছেন এই আদিবাসী ললনা। সেদিন আশা দিদি না পাশে থাকলে নিয়োগীজির কি হতো তা কে জানে! এই কথা মনে রেখে আমি আশা দিদির কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে যাই। মুক্তি সেটা না জেনে নিয়োগীজিকে ঘুম থেকে ডেকে তুলেছে। গতরাতে প্রায় দুটো অবধি মিটিং চলেছে। এত সকালে ওনাকে ডাকা মোটেই উচিৎ হয়নি।
কিন্তু ডাকা মাত্র উনি বিছানা থেকে নেমে এসে আমাদের সামনের বেঞ্চিতে বসে পড়লেন। মুখে কোন রাগ বা বিরক্তির চিহ্ন নেই। কথা বলা শুরু করলেন স্বাভাবিক গলায়। অতি সাধারণ কথার মাঝে আশা দিদি চা এনে আমাদের সামনে রাখলেন। রান্না বাসন মাজা জল তোলা সংসারের সব কাজ তিনি নিজের হাতে করেন। এত বড় এক জন নেতার সহধর্মিনীর একজন কাজের লোকও নেই। ভাবা যায়?
চা খেতে খেতে বলেন নিয়োগীজী—”শরীরটা ভাল নেই। কাল রাতে হঠাৎ করে জ্বর এসে গেছে।” হঠাৎ বুকের ভিতরটা কেমন একটা মোচড় খেল আমার। কি করতে যাচ্ছি বুঝে ওঠার আগেই ওনার গায়ে হাত দিয়ে বসলাম। টের পেলাম প্রচণ্ড তাপ শরীরে বিশ্বাস করতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল, এই অবস্থায় উনি উঠে বসে আছেন। আর আমাদের মত অতি সাধারণ মানুষের অতি সাধারণ কথা শুনছেন।
এটাই ছিল ওনার বৈশিষ্ট্য। কেউ ওনার কাছে সাধারণ নয়। সবাইবিশিষ্ট, সবাই সমান গুরুত্বপূর্ণ। যে মানুষ তার কাছে আসত সবাইকে ভালোবাসতেন সবার কথা শুনতেন। সকাল দুপুর বিকেল রাতের প্রতিটা মুহূর্ত তার উৎসর্গ করা ছিল মানুষের জন্য। এক সমুদ্র সমান ভালোবাসার ভাণ্ডার তিনি নিঃশেষে ছড়িয়ে দিয়ে গেছেন মানুষের জন্যে।
আমি নিজেকে ধন্য মনে করি এমন মানুষের সাথে কাজ করতে পেরেছি বলে। তার শিক্ষায় নিজেকে শিক্ষিত করতে পেরে।
এর কিছুদিন পরে ১৯৯০ সালে উনি আহ্বান পেলেন ভিলাইয়ের হাজার হাজার অসহায়, মালিক শোষণে জর্জর শ্রমিকদের কাছ থেকে–আপনি আসুন নিয়োগীজি। আমরা আপনার নেতৃত্ব চাই। যেখানে অত্যাচার সেইখানে নিয়োগী। যেখানে নিয়োগী সেখানে প্রতিরোধ। সেখানে বিজয়। মানুষ ডাকছে আর কি করে চুপ থাকেন শংকর গুহ নিয়োগী? উনি যেভাবে একদিন দানী টোলা থেকে দল্লী এসেছিলেন ঠিক সেইভাবে দল্লী থেকে ভিলাই চলে গেলেন। এ সেই ভিলাই যেখান থেকে একদিন পূজিপতি-রাজনৈতিক দলের নানা ইউনিয়ান আর পুলিশের তাড়নায় চলে গিয়েছিলেন একা। আজ যখন বিশ বছর পরে আবার সেই ভিলাইয়ে ফিরে এলেন পথের দুধারে লক্ষ মানুষের আন্দোলিত হাত–স্বাগতম কমরেড।
রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে–সোভিয়েত সহযোগিতায় ১৯৫৮ সালে এখানে স্থাপন করা হয়েছে এশিয়ার বৃহত্তম ইস্পাত কারখানা। যে কারখানার অনুসারী শিল্প হিসাবে অন্যান্য আরো ১৫০টি সংস্থা স্থাপন করা হয়েছে। যেগুলোর অধিকাংশের মালিক পাঁচটি শিল্পপতি পরিবার। যারা ২৫/৩০ বছর ধরে শ্রমিককে শোষণ করে কোটি কোটি টাকা কামিয়েছে। সামন্ত মানসিকতার এই সব নব ধনাঢ্য এক একটা গুণ্ডা বিশেষ। যাদের রয়েছে নিজস্ব মাফিয়া সংগঠন। যারা হিংস্রতায় পৃথিবীর যে কোন মাফিয়া সংগঠনের সঙ্গে পাল্লা দিতে সক্ষম।
ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে ওঠা এই সব শিল্পদ্যোগের একটাতেও শ্রম কানুন যথাযথভাবে পালন করা হয় না। নাম মাত্র মাইনে আর কথায় কথায় ছাঁটাই। প্রতিবাদ করলে মারধোর নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। প্রতিকার পাবার কোন উপায় ছিল না এখানে।কারণ এখানকার শ্রমিক নেতারা সব ভয়ে এবং উৎকোচের লোভে পড়েছিল মালিক শ্রেণির পায়ের কাছে।
