বৃদ্ধের কাছে খাবার পয়সা নেই, শোবার কোন বিছানা নেই। সাথে কোন লোকও আসেনি, নিয়োগীজি জনকলাল ঠাকুরের ছোট ভাইকে ডেকে বললেন–এনাকে মেস থেকে খাবার খাইয়ে আনো। আর হাসপাতাল থেকে দুটো কম্বল এনে একটা ভালো জায়গায় শুইয়ে দাও। এরপর তিনি নানান জায়গা থেকে আসা মোর্চর কর্মীদের সাথে সংগঠন বিষয়ক আলোচনা শুরু করলেন। যে আলোচনা শেষ হল রাত দুটোর সময়। এত কিছু আলোচনার মধ্যেও উনি বৃদ্ধ লোকটির কথা ভোলেননি। ঘরে ফেরবার আগে একবার খোঁজ নিতে গেলেন তার। গিয়ে দেখলেন বৃদ্ধ কম্বল না পেয়ে একটা ছেঁড়া সতরঞ্চি জড়িয়ে জড়োসড়ো হয়ে শুয়ে আছে।
সদা প্রশান্ত নিয়োগীজির সেদিন যে ভয়ংকর রুদ্রমূর্তি দেখেছিলাম তা আমার পক্ষে এ জীবনে ভোলবার নয়। বৃদ্ধের ওই অবস্থা দেখার সঙ্গে সঙ্গে ওনার মুখ থেকে চির পরিচিত হাসি মিলিয়ে গিয়ে নিরেট একটা কালো পাথরের আকার ধারণ করল। পরক্ষণে ফেটে পড়লেন তীব্র রাগেও কঁহা! বুলাও উসকো।
জনকলাল ঠাকুরের ভাইমুখকাঁচুমাঁচুকরে সামনে এসে দাঁড়াতেইনিয়োগীজির ক্ষিপ্ত গর্জন-কা বোলা থা তুমকো?ইতনা ছোটাসা এক কাম কর নেহি পায়া তো ক্যা তুম জনতাকে সেবা করোগে?
আমতা আমতা করে বলে সে–হাসপাতালের স্টোরে কোন কম্বল নেই। রোগী খুব বেশি এসে গেছে। তাই তাদের কম্বল পেতে মেঝেতে রাখা হয়েছে।
এটা কোন যুক্তি নয়। যেখান থেকে হোক একে কম্বল এনে দিতে হবে। জনকের ঘরে যাও। ওখানে না পাও সাইকেল নিয়ে আমার ঘরে গিয়ে নিয়ে এসো।
জনকলাল ঠাকুরের ঘর ইউনিয়ন অফিসের কাছেই। তার ঘর থেকে কম্বল আনিয়ে বৃদ্ধকে শুইয়ে তবে সে রাতে নিয়োগীজি ঘরে গিয়েছিলেন। অনাথ অসহায় একজন অচেনা মানুষ, বলা চলে সমাজ সংসার যাকে পরিত্যাগ করে দিয়েছে। পৃথিবীকে দেবার মত যার আর কিছুই অবশিষ্ট নেই তার প্রতি এমন আন্তরিক দরদ। এই দরদ-ই শংকর গুহ নিয়োগীজিকে বানিয়েছে নিয়োগী ভাইয়া। আর বসিয়ে দিয়েছে লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদয়ের সিংহাসনে।
আমি শংকর গুহ নিয়োগীর লোক। আমার সারা জীবন তার কাছে কৃতজ্ঞতায় অবনত। যে ভয়ংকর দুর্দিনে তিনি আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন, যদি তিনি সেদিন না দাঁড়াতেন সপরিবারে। কোথায় হারিয়ে যেতাম আমি তা কে জানে! আর শুধু আমি কেন ছত্তিশগড়ের লক্ষ মানুষের ত্রাতা মিত্র বন্ধু সহায়ক হয়ে জীবন বিপন্ন করে বার বার তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়ানো–এটাই ছিল তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। যা তাকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে ছত্তিশগড়ে মানুষের মনে মহাকাব্যের এক মহানায়ক রূপে।
একবার এক সকালে ডাঃ শৈবাল জানা আমাকে বললেন–চলুন ব্যাপারীদা একজন রুগী দেখে আসি। সেই যে বহু বছর আগে এক মানব দরদি ডাক্তার নর্মান বেথুন চিকিৎসার মধ্যে প্রচলন করেছিলেন এক নতুন নিয়ম-গুরুতর অসুস্থ রোগী ডাক্তারের কাছে আসবে না। ডাক্তার যাবে রোগীর কাছে। শহীদ হাসপাতালের সব ডাক্তার এই নিয়ম মেনে চলেন। এদের রয়েছে স্বাস্থ্য-ভ্যান যা চিকিৎসা এবং মানুষকে স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতন করার জন্য পৌঁছে যায় দূর-দূরান্তের গ্রামে।
আমরা অবশ্য সেদিন পায়ে হেঁটেই গিয়েছিলাম মাইল দুয়েক দূরে এক শ্রমিক বস্তিতে। দেখেছিলাম শয্যাশায়ী আর এক বৃদ্ধকে। আমাদের দেখে বার্ধক্য ভুলে ধরমর করে বিছানার উপর উঠে বসল সে। ডাঃ জানা তার নাড়ি দেখলেন জিভ দেখলেন তারপর বললেন–আর তোমার কোন শরীর খারাপ নেই। একদম ফিট। ঘরে অন্য কোন লোক নেই। বৃদ্ধ নিজে হাতে আমাদের জন্য হাতল ভাঙা কাপে দুধ ছাড়া চা বানিয়ে নিয়ে এল। চায়ে চুমুক দিয়ে ডাঃ জানা বৃদ্ধকে বললেন–ডোকরা (বুড়ো) হামারা এ সাথী কাপসীসে আয়া হ্যায়। হাম ইনহে বোলা, তোম বহুত আচ্ছা কাহানি বলতে হোসাথীকো এক কাহানি শুনা দো!
নড়ে চড়ে বসল সেই বৃদ্ধ। যেন বহুদিন পরে সে গল্প শোনার লোক পেয়ে মহাখুশি। খুলে। বসল সে তার গল্পের ঝুলি। গল্পটা রামায়ণের। বৃদ্ধ দল্লীর একজন সাধারণ শ্রমিক। ৭৭ সালের সেই মজদুর আন্দোলন সব তার স্বচক্ষে দেখা। স্মৃতির কোঠায় সে কাহিনী এখনো এত সজীব যে রামায়ণ কথকতায় বার বার এসে পড়তে লাগল মজদুর আর মজদুর নেতা শংকর গুহ নিয়োগীর কথা। এক সময় বৃদ্ধের গল্প এসে গেল রাবণ পুত্র মহীরাবণ কর্তৃক রাম লক্ষ্মণ হরণ বৃত্তান্তে। বৃদ্ধ বলে চলে—
রাম কা সাথ রাবণ কা মহারণ ….. মজদুর কা সাথ মালিক লোপোকা। তো রাবণ নে ক্যা কিয়া? আপনা লেড়কা মহীরাবণ-যো কি রসাতল কা রাজা থা–উসকো বুলায়া! কহা, যা বেটা রামকা সাথ যা কর যুদ্ধ কর। উসকো মার আউর হামারা লঙ্কা রাজকো রকসা কর। দেখা নেহী ঠিক উসি প্রকার মালিক লোগছি পুলিকা স্মাণ লিয়া। কন্থা, নিয়োগীকা হাত সে হাম লোগোকো বাঁচাও। হামারা লুঠ খসোটকা ধান্ধা রকসা করো। কহা কি নেহী?–কহা। অভি তো পুলিশ আইন (এল)। আউর মজদুর কো গোলি মারিন। তো মহীরাবণ–যো এক মায়া ভি থা! মায়া সে-মতলব ধোঁকে সে রামজীকো–যেইসে হামারা নিয়োগীজিকো পুলিশ ধোকে সে গ্রেপ্তার কর লিয়া থা।
একজন কাব্যের কল্পিত বীর আর একজন জীবন্ত মানুষ সেদিন মিলে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছিল এক বৃদ্ধের গল্পে। একজন থেকে কিছুতে আর একজনকে আলাদা করা যাচ্ছিল না।
