ভাল কথা বলে যে এমন ভালোরকম খিচুনি খাবো আগে জানতাম না। সত্যিই এখানে ভালো মন্দ বলে কিছু নেই। সব কিছু সবার জন্য সমান। যে কারণে এক ভোর বেলায় নিয়োগীজিকে দেখেছিলাম অসুস্থ ছোট মেয়ে মুক্তিকে নিয়ে ডাক্তার দেখাবার জন্য দশ বারো জনের পিছনে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে। ডেকে পাঠালে ডাক্তার তার বাড়ি দৌড়ে যাবার কথা–কিন্তু উনি তা করেন না। এবং এখানকার সব মানুষই নিয়োগীজির শিক্ষায় শিক্ষিত।
আমি যখন ডা:জানার সঙ্গে দেখা করলাম।বললেন উনি-আমরা একটা পরিকল্পনা করেছি। বাড়ি যাবার আগে আমার সঙ্গে দেখা করে যাবেন। সব বুঝিয়ে বলব। পরের দিন সকালে সেটা বুঝিয়ে বললেন তিনি–বাচ্চাদের পরীক্ষা শেষ হয়ে গেছে। একদুদিনের মধ্যে রেজাল্ট বের হয়ে যাবে। আমরা দেখছি আপনাদের ওখানে প্রতিটা পাঠ্য পুস্তকের উপর দোকানদাররা দুইতিন টাকা বেশি দাম নেয়। আমরা চাই আপনি ওখানে একটা বইয়ের দোকান করুন। এবং ন্যায্য দামে বই বিক্রি করুন। এতে মানুষের উপকার হবে আর আপনার সংসারও চলে যাবে।
ডা: জানা দু হাজার টাকা দিয়ে বললেন–এটা নিয়ে আপনি কাকের চলে যান। কাকেরে নাজিব কুরেশি থাকে। টাকাটা তাকে দেবেন। নাজিবের বই দোকান আছে–কুরেশি বুক ডিপো। সে আপনাকে একটা দোকানের যা যা বই প্রয়োজন সব দিয়ে দেবে। কথা বলা আছে।
মুক্তি মোর্চার সমর্থক নাজিব কুরেশি আমাকে প্রায় দশ হাজার টাকার বই খাতা পেন কাগজ দিয়েছিল। কাপসীতে একটা ঘর ভাড়া করে খুলেছিলাম ন্যায্য মূল্যের বইয়ের দোকান। যার নাম দিয়েছিলাম–কবি সুকান্ত পুস্তকালয়। বইয়ের দোকানের একটা অংশে তৈরি করেছিলাম পাঠচক্র। যার নাম দিয়েছিলাম পারালকোট পাঠচক্র। চেষ্টা ছিল পারালকোটে বসবাসকারী বাংলা ভুলে যাওয়া বাঙালী সন্তানদের বাংলা ভাষায় প্রকাশিত সাহিত্যের সাথে পরিচিত করানো। বই কেনবার তো সামর্থ্য ছিল না। তাই একখানা আবেদন পত্র ছাপিয়ে বাংলার বিভিন্ন মানুষের কাছে পাঠিয়েছিলাম বই ভিক্ষা চেয়ে। একখানা মহাশ্বেতা দেবীর ঠিকানায়ও পাঠাই। উনি এটাকে সবিশেষ গুরুত্ব দেন এবং বর্তমান পত্রিকার মাধ্যমে বাংলার মানুষের কাছে বইয়ের আবেদন রাখেন। ফলে প্রচুর বই পাওয়া যায়। ঘর ভরে যায় ওনার। যখন সেই বই নিতে আমি ওনার বাসায় যাই তখনই উনি জানতে পারেন আমিই সেই রিকশাঅলা মদন। যার আসল নাম–মনোরঞ্জন।
এখন আমার সংসারের সমস্যা অনেকটা মিটে গেছে। ফলে সংগঠনের কাজে নিজেকে সম্পূর্ণ নিয়োজিত করতে পেরেছি। দোকান অণুর উপর চালানোর ভার দিয়ে একটা সাইকেল-যার পিছনের ক্যারিয়ারে জল কিছু শুকনো খাবার আর একটা কম্বল নিয়ে আদিবাসী পাড়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছি। ডোন্ডির পুনউ হারানগড়ের নহুরু এদের আগে পেয়েছিলাম, এবার সাথে পেলাম বড়ে গাওয়ের রবি টেইলার মুর ডোঙ্গরির প্রীতম এবং আরো অনেককে। এদের মাধ্যমে নানা জায়গায় আমাদের মজবুত সংগঠন গড়ে উঠল।
এ সময়ে আমাকে প্রোগ্রেস রিপোর্ট দেবার জন্য মাঝে মাঝে দল্লী যেতে হোত। কোন বাধ্যবাধকতা ছিল না। যেতাম প্রাণের টানে। যেতাম সফলতার সংবাদ দিয়ে আনন্দিত হবার জন্যে।
বহু মানুষের কাছে শংকর গুহ নিয়োগীর বহু রকম রূপ। যে কারণে কেউ কেউ তাকে বলে থাকেন নকশাল। সেটা পুলিশেরও ধারণা যে তিনি তাই। ছত্তিশগড়ে যে ১৩টা গণ সংগঠনকে পুলিশ প্রশাসন নকশালবাদীদের সহযোগী বলে মনে করে, সবার শীর্ষে ছত্তিশগড় মুক্তি মোর্চার নাম। আবার বাবা আমটে মেধা পাটেকর ব্রহ্মদেও শর্মার মত গান্ধীবাদীরা নিয়োগিজীকে মনে করে গান্ধীবাদী। কেউ কেউ তো তাকে ছত্তিশগড়ের গান্ধীও বলে। একবার আলোচনার সময় নিয়োগীজি আমাকে বলেছিলেন তিনি মার্কসবাদী। সিপিআই অবশ্য তাকে মার্কসবাদী মানতে নারাজ। কারণ ভিলাই ইস্পাত কারখানা–যা ভারত সরকার এবং রাশিয়ানদের মিলিত উদ্যোগ, কখন কখনো নিয়োগীজি তার বিরুদ্ধে শ্রমিক শোষণের অভিযোগ তুলেছেন। রাশিয়ার বিরুদ্ধে আঙুল তুললে সে কি করে মার্কসবাদী থাকে!
আমার কিন্তু মনে হয় কোন বিশেষ ‘বাদ’-এর গাড়ায় নিয়োগীজিকে আটকে ফেলা কঠিন শুধু নয়–এক অসম্ভব প্রয়াস। উনি সব ‘বাদ’-এর বাদ বিবাদের উর্ধ্বে। এক মহান মানবতাবাদী। যার সঙ্গে একমাত্র তুলনা করা যায় রাজপ্রাসাদ থেকে নেমে এসে দুঃখী মানুষের মাঝে দাঁড়ানো গৌতম বুদ্ধের। তুলনা করা যায় মহান বিপ্লবী চে গুয়েভারার।
একবার দল্লী গিয়েছি নিয়োগীজির সঙ্গে দেখা করতে। শীতের রাত। গিয়ে দেখলাম ইউনিয়ান অফিসে উনি প্রায় পঁচাত্তর আশি বছরের এক বৃদ্ধের সাথে কথা বলছেন। অতি দরিদ্র বৃদ্ধ দূর কোন গ্রাম থেকে এসেছেন। তিনি কিভাবে কোথা থেকে জেনে এসেছেন যেদল্লীতে নিয়োগী নামের এক ডাক্তার আছে যার বিরাট হাসপাতাল; সে হাতপাতালে মরা রোগী গেলেও নাকি জ্যান্ত হয়ে ফিরে যায়। বৃদ্ধ বড় আশা নিয়ে এখানে এসেছেন ওই নিয়োগী ডাক্তারকে একবার তার রোগ জর্জর দেহটা দেখাবেন।
বার্ধক্য যে রোগের নাম তা কোন ওষুধেই সারবার নয়। অন্য কেউ হলে কি করতেন কে জানে, উনি কিন্তু দুঃখী একজন মানুষের দুঃখের কথা দরদ ভরা মন নিয়ে অনেকক্ষণ ধরে শুনলেন। তারপর সান্ত্বনা দিলেন সব ঠিক হো যায়েগা। আজকের রাতটুকু বিশ্রাম করো। কাল সকালে তোমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাব। সব ঠিক হয়ে যাবে।
