এই ওষুধ পাচার চক্রে হাসপাতালের সবাই যুক্ত। যে কারণে সেই জামাইবাবু তার সহকর্মীদের আসন্ন বিপদ থেকে সতর্ক করে দেয়। ফলে স্টোর থেকে ওষুধ আর বাইরে এল না। আমরা তখন গোটা কয়েক দরখাস্ত লিখে থানা বিডিও অফিস তফসিল জেলাশাসককে পাঠিয়ে আবেদন জানালাম হাসপাতালের স্টোর এবং রেজিস্টার চেক করতে। যখন হাসপাতালের কর্মীরা বুঝল একটা সমস্যা আসছে, তারা রাতের অন্ধকারে একটা গর্ত খুঁড়ে সব ওষুধ মাটি চাপা দিয়ে দিল।
সকালবেলা মাঠের মাঝে নতুন খোঁড়া একটা গর্ত দেখে গরু চড়াতে যাওয়া কিছু লোকের সন্দেহ হয় এবং তারা আমাকে খবর দেয়। এরপর যা হল সে আর বলার নয়–কোদাল দিয়ে মাটি সরিয়ে আমার মাথা গরম। সব শুদ্ধ প্রায় এক বস্তা যার দাম নাকি চল্লিশ পঞ্চাশ হাজার টাকা। সেই সব প্রাণদায়ী ওষুধ সব নষ্ট করে ফেলা হয়েছে।
এখানকার মানুষ তো খেপে ছিলই। দরকার ছিল শুধু একটু ইন্ধন। ফলে মানুষ হামলে পড়ল ডাক্তার কম্পাউন্ডার কর্মীদের উপর। বিনা বাছ বিচারে সবাইকে পিটিয়ে দিল। যেহেতু এর সূচনা আমার দ্বারা হয়েছিল পুলিশ আমাকে ধরে নিয়ে গেল। কেস দিয়ে দিল মারপিটের। এটা বস্তারে আমার প্রথম জেল যাত্রা। পরে অবশ্য আরো বার কয়েক যেতে হয়। তবে একটা সুবিধা এখানে ছিল। কাকের কোর্টে প্র্যাকটিস করতেন বিষ্ণু প্ৰসাদ চক্রবর্তী আর ভানু প্রতাপপুরে মুরলি মোহন উপ্ৰেতি এরা দুজন নিয়োগীজির ভক্ত। যারা আমি কোর্টে যাওয়া মাত্র ছাড়াবার চেষ্টা শুরু করে দিতেন। এবং যেদিন ছাড়া পেতাম-সে জেল থেকে হোক বা কোর্ট থেকে, হোটেলে খাইয়ে গাড়ি ভাড়া দিয়ে বাসায় পাঠিয়ে দিতেন।
এবার ছাড়া পেতে তিন দিন লেগেছিল। ততক্ষণে অমৃত সন্দেশ পত্রিকা আমার ফোটো সহ সে খবর ছড়িয়ে দিয়েছিল ছত্তিশগড়ের সর্বত্র। সবাই জেনে গিয়েছিল আমার নাম। বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিলাম আমি। এরপর একটি ছোট্ট আন্দোলন সংগঠিত করেছিলাম তেন্দু পাতা ভাঙার বকেয়া মজুরি আদায়ের দাবিতে। হারানগড়, ডোন্ডি এ দুটো আদিবাসী গ্রাম আর বাঙালী গ্রাম পি ভি ৫৬ নাম্বারের দেড় দুশো লোক নিয়ে ফরেস্টের সব চাইতে খুংখার অফিসার জনসন ক্রাককে তার অফিসের মধ্যে ঘেরাও করে বসেছিলাম দু-ঘণ্টা। যখন সে দুদিনের মধ্যে বকেয়া মজুরি মিটিয়ে দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, ঘেরাও তুলে নিয়েছিলাম এই বলে–যদি দুদিনের মধ্যে টাকা না পাওয়া যায়, আমরা আবার আসবো। সেদিন কিন্তু অহিংস না-ও থাকতে পারি। সে দুদিনের মধ্যে মজুরি মিটিয়ে দেয়।
কিছুদিন পরে একটা মারপিট হয় জীতেন ব্যানার্জীর পরিবারের সাথে। কংগ্রেসের নেতা, নেতামের চামচা, জীতেন ব্যানার্জীরা ছয় ভাই। ছয় ভাইয়ের বারো চোদ্দটা ছেলে। একান্নবর্তী পরিবার। ফলে এদের দাপটে কাপসীর মানুষ অতিষ্ট। কারো কোনদিন সাহস হয়নি এদের কিছু বলবার। জীতেন ব্যানার্জীর ভাই শম্ভ ব্যানার্জী আমাকে চড় মেরেছিল। আমি তারপর তাকে ফেলে পিটিয়েছিলাম।
ওরা থানায় গিয়ে কেস লেখায়। যে পুলিশ অফিসার আমাকে ধরে নিয়ে যেতে আসে সে ব্যানার্জীদের খুশি করার জন্য আমাকে বলে-মাদার চোদ্দ, চল তেরেকো থানে লেকে হাড্ডি তোড়ুঙ্গা।
সেটা ছিল কাপসীর হাটবার। বহু মানুষ, যার মধ্যে কিছু মুক্তি মোর্চার সমর্থকও আমাকে দেখেছিল। তখন আমার মনে হয়েছিল এখানকার পুলিশ এবং ব্যানার্জী পরিবারের ভয় মানুষের মন থেকে দূর করার জন্য এখনই আমার একটা কিছু করা খুব দরকার। এ ভয় না কাটাতে পারলে তারা আমার সাথে আসবে না। তাই সাহসী গলায় অফিসারকে বলেছিলাম, দেখো সাব, গালি উলি মাৎ দো। দুবারা আগার মা উঠাকে গালি দিয়া তো তুমহারা জবান খিচু লুঙ্গা। তুমহারা বর্দী তুমে ইতনা তাকত নেহী দিয়া কি কিসিকো মা উঠাকে গালি দো। যাহা তক মারনে কা বাত, লক আপমে লেকে মারনা। নেহীতো দো গবাহি লেকে তুমে কোর্টমে ঘসিট দুঙ্গা।
এ ভাষা পুলিশ অফিসার কোনদিন শোনেনি। পারাল কোর্টে শুনবে তা কোনদিন ভাবেও নি। বুলি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল তার।
এর কদিন পরে বিজেপির ছোটখাটো এক নেতার সাথে হাতাহাতি হয়ে গিয়েছিল। সেও কেস দেয়। তবে কিছুদিন পরে নিজেই কেস তুলে নেয়। আমাদের ক্ষতি পূরণ বাবদ বারোশো টাকাও দেয়। এ কেসে আমি এবং আমার দুই ভাই আসামি হয়েছিলাম। এরা আমার জেঠতুতো ভাই সুধীর আর অধীর।
.
অনেকদিন পরে আবার আমার ডাক এসেছে দল্লী থেকে। ৫৬ নম্বর ভিলেজের গণেশ মণ্ডল শহীদ হাসপাতালে গিয়েছিল চিকিৎসার জন্য। তারই কাছে খবর পাঠিয়েছেন ডাঃ জানা। একবার আসুন, দরকারি কথা আছে। আমি যখন এদিক সেদিক চলে যাই আমার স্ত্রী অনু পত্রিকা বিলি করে। এখন অবশ্য তিরিশ থেকে পত্রিকা পনেরোয় নেমে গেছে। হাসপাতালের যারা গ্রাহক ছিল আর পত্রিকা নেয় না। ফরেস্টের অফিসাররাও বন্ধ করে দিয়েছে পত্রিকা নেওয়া। রোজগার আমাদের অর্ধেক কমে গেছে। আমি দল্লী যাবার গাড়ি ভাড়া পাই কোথায়?
বেশি দিন অপেক্ষা করতে হল না। ৫৬ নাম্বার ভিলেজের একটা ছেলের শরীর খারাপ হল। মা আর ছেলের সংসার। মা এসে আমাকে ধরলো-বাবা আমার সাথে তুমি একটু দল্লী চলো। তোমার তো চেনা জানা আছে। বলে দিলে একটু “ভালো”চিকিৎসা হবে। তাই যেতে পেরেছিলাম দল্লী। আর “ভালো” চিকিৎসার কথা বলে ডাক্তার পুণ্যব্রত গুণের কাছে ধমক খেয়েছিলাম আমি।—ভাল চিকিৎসা মানে কি! এর যে রোগ হয়েছে তাতে যে ওষুধ লাগে সেটাই দেওয়া হবে। একে দেওয়া হবে, একজন ভিখারি হলেও বা একজন শিল্পপতি হলেও তাই করা হবে। এখানে ভাল মন্দের কথা আসছে কেন? একে ভাল চিকিৎসা করব তাহলে মন্দ চিকিৎসা কাকে করবো? এর মানে এখানে মুখ চিনে চিনে চিকিৎসা করা হয়। কাউকে ভাল কাউকে মন্দ!
