তখন বলেছিলাম আমি আজ হোক বা কাল আমাকে তো কলকাতায় ফিরে যেতে হবে। যত দিন মোর্চার প্রতি মোহ ছিল ফিরে যাবার কথা মনে পড়েনি। ফিরে গেলে তখন যারা আপনাকে কলকাতায় চেনে সবাই আমাকে দোষ দেবে। বলবে, নিয়োগীজির মত মানুষের সঙ্গে যখন তুমি কাজ করতে পারোনি, তুমি লোকটা ঠিক লোকনও। সেই জন্য চিঠি দিয়ে অবস্থাটা তাদের জানিয়েছি।
তখন উনি ধৈর্য ধরে বিশদভাবে আমাকে বলেন–ছত্তিশগড়মুক্তিমোর্চা সেই অর্থে আটোসাটো কোন রাজনৈতিক দল নয়। এটা ছত্তিশগড়ের শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থরক্ষায় নিয়োজিত একটা সামাজিক সংগঠন। শ্রম জীবনের সমস্ত রকম বিকাশের লক্ষ্যে আমাদের রয়েছে বহুমুখীন কার্যক্রম। যেমন ধরা যাক, পর্যাবরণ রক্ষা, মাদক বর্জন আন্দোলন। শিক্ষা বিস্তার এবং লোক সংস্কৃতি-লোক সাহিত্যের প্রচার প্রসার। স্বাস্থ্য বিষয়ক বিবিধ প্রোগ্রাম। এই রকম আন্দোলন বা কার্যক্রমে বিভিন্ন সংগঠন আমাদের পাশে এসে দাঁড়ায়, সময়ে সময়ে আমরাও ওই সব সংগঠন বা ব্যক্তি বিশেষের সহযোগিতা নিয়ে থাকি। এই দেওয়া এবং নেওয়ার সঙ্গে আমাদের মূল রাজনীতি বা সিদ্ধান্তের কোন সম্পর্ক নেই।
আমরা যখন মাদক বর্জন আন্দোলন করেছিলাম, গান্ধীজির এক আত্মীয় সুশীলা নায়ার আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। আমরা তাকে সঙ্গে নিয়েছি। এই ভাবে গান্ধীবাদী বাবা আমটের নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনের নেত্রী মেধা পাটকর, পি ইউ সি এল-এর রাজেন্দ্র সায়েল, ভারত জন আন্দোলনের ড, ব্রহ্মদেও শর্মা, বন্ধুয়া মুক্তি মোর্চার স্বামী অগ্নিবেশ যারা কোন না কোন সময়ে মোর্চার আন্দোলনে সামিল হয়েছে। প্রফুল্ল ঝাঁও সেই রকম এক জন। এ মোর্চার কেউ নন। তিনি যা বলেছেন, ঠিক না বেঠিক সে দায় কোন মতে মোর্চার উপর বর্তায় না। মোর্চা প্রফুল্ল আঁকে নিশ্চয় এই মন্তব্য প্রত্যাহার করে ক্ষমা চাইতে বলবে। আর তা না হলে তাকে দল্লী ছেড়ে চলে যেতে হবে।
এরপর ঠিক ঠিক কি ঘটেছিল আমি জানি না। তবে প্রফুল্ল ঝাঁ দল্লী ছেড়ে রায়পুর চলে যান এবং সেখানে গিয়ে নব ভাস্কর পত্রিকার সহকারী সম্পাদকের চাকরি নেন। বহুদিন পরে আর একবার তিনি দল্লী এসেছিলেন। সেটা ১৯৯১ সালের ২৮ শে সেপ্টেম্বর।
নানা কথা শেষ করে সেদিন নিয়োগীজি জিজ্ঞাসা করেছিলেন–কী করবেন?
–কী করবো!
–কলকাতায় চলে যাবেন?
–না। জোর দিয়ে বলেছিলাম আমি।
–তাহলে আর কোনদিন যেন কোথাও চিঠি লিখবেন না।
একটা ছোট্ট ডোবা গ্রীষ্মের দারুণ দাবদাহে শুকিয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ কোথা থেকে যেন উড়ে এল এক খণ্ড মৌসুমি মেঘ। সে অকৃপণ জল ধারা ঢেলে দিল মাটির উপর। মাটির শিরা বেয়ে-উপশিরা বেয়ে সে জল গিয়ে পড়ল শুকনো ডোবায়। যত জলচর প্রাণী জল ছাড়া মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছিল সব আবার বাঁচার আশ্বাস পেয়ে সজীব হয়ে উঠল।
মনে হয়েছিল বস্তারের জঙ্গলে এসে বুঝি আমি নিঃশেষ হয়ে যাবো। কিন্তু না, তা হল না। জঙ্গলই এল আমার কাছে মহা মঙ্গল হয়ে।
.
তখন আর আমি অনেকদিন দল্লী যেতে পারিনি। একবার সেই যে পাঁচশো টাকা নিয়ে এসেছিলাম যাতে এক মাস সংসার চলে ছিল, তারপর তো এসে গিয়েছিল বিধানসভার ভোট। সে সময় প্রচুর মুক্তিমোর্চার কর্মী কাপসী এসেছিল যাদের রান্না খাওয়া এখানেই হোত। তাদের খাওয়া দাওয়ার পর যে খাবার বেঁচে যেত আমার পুরো পরিবার খেয়ে শেষ করতে পারত না। এর পর ঘটে সেই চিঠি চাপাটির ঘটনা। যার ফলে আমি কেমন ম্রিয়মাণ হয়ে গিয়েছিলাম। দল্লী গিয়ে যে দাবি করবো সে মনের জোর পাচ্ছিলাম না।
তবে দল্লী যাই বা না যাই আমি যেমন জানতাম আমি মুক্তি মোর্চার সঙ্গেই আছি স্থানীয় মানুষ পুলিশ, ফরেস্ট এবং সব সরকারি কর্মচারী এমন কি কাকেরের এল আই বি শ্রী বাস্তব সেও তাই জানত এবং মাঝে মাঝে এসে আমরা বস্তারে কি করছি তার খোঁজ খবর নিয়ে যেত।
সে সময় আমি অমৃত সন্দেশ নামে এক হিন্দি পত্রিকার স্থানীয় এজেন্ট হয়ে গিয়েছিলাম। এ সব পত্রিকার কোন সংবাদদাতা থাকে না। যারা এজেন্সি নেয় তারাই সংবাদ পাঠায়। বাধ্য হয়ে আমাকে রাত জেগে হিন্দি পড়াটাও শিখে নিতে হল। কাপসীতে তখন অমৃত সন্দেশ তিরিশখানার মতো চলত। যার কমিশন পনেরো টাকা পেয়ে যেতাম। এতে আমাদের চাল আলু কেনা হয়ে যেত। আর একটা সুবিধাও হল, একবেলা সংগঠনের কাজ করার সময় পেয়ে যেতাম।
একদিন পত্রিকা বিলি করতে কাপসী প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দিকে গেছি। তখন হাসপাতালেরই এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটা খবর জানালো পত্রিকায় প্রকাশ করার জন্য। বলল যে হাসপাতালের স্টোরে প্রচুর ওষুধ–যা বোকা হাবা আদিবাসীদের নামে প্রেসক্রিপশান করা হয়েছিল–অথচ দেওয়া হয়নি তা জমে জমে এখন পাহাড়। এ সব ওষুধ বাইরে বিক্রির জন্য যে কোন দিন পাচার হবে।
হাসপাতাল থেকে যে রাস্তাটা দুভাগে ভাগ হয়ে একটা পাখানজুর একটা ভানু প্রতাপপুর চলে গেছে, তা গেছে কাপসী বাজারের পাশ থেকে। কটা ছেলেকে সেখানে পাহারায় বসিয়ে দিলাম নজর রাখার জন্য। জিপ সাইকেল যাতেই ওষুধ আসুক ধরা হবে। কিন্তু আমাদের এ খবর গোপন রইল না। একটা ছেলে–যে আমাদের সাথে আছে তার এক জামাইবাবু হাসপাতালের কর্মী। জামাইবাবু যাতে বিপদে না পড়ে সে দিদিকে বলে আসে-ওষুধ পাচার হওয়া গাড়িতে সে যেন থাকে। মুক্তি মোর্চার ছেলেরা ধরবে।
