আমার মনে হয় আপনাদের এটা বস্তারের মানুষকে এখন থেকে বোঝানো শুরু করা দরকার। পারলে আজ থেকে এই কাজটা শুরু করে দিন।
কাপসীতে ফিরে আসবার সময় দেখা করেছিলাম ডাঃ জানার সাথে। যা আমি কল্পনাও করিনি, পাঁচশো টাকা দিয়েছিলেন উনি। বলেছিলেন–আপনার মাসের খরচ। নিয়োগীজির পরিবারে আমার চেয়ে একজন সদস্য বেশি। ছেলে মেয়েরা উঁচু ক্লাশে পড়ে। যে কারণে খরচ বেশি। তাই উনি পান সাতশো টাকা মাসের খরচ। তাহলে আমার জন্য পাঁচশোর বেশি আর কি হবে?
দিল্লীর যোগেন দা আর দল্লীর ডাঃ শৈবাল জানা দুজনের সঙ্গে এই চার দিনে ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল সবচেয়ে বেশি। কাপসী ফিরে আসার আগে ডাঃ জানাকে হেসে জিজ্ঞাসা করেছিলাম আমি–ছত্তিশগড় মুক্তি মোর্চার পতাকার দুটো রঙ। শ্রমিকের জন্য লাল কৃষকের জন্য হারা (সবুজ) তাহলে আমার জন্য কি? আমি তো শ্রমিকও নই কৃষকও নই। আমার জীবন কাহিনীর কিছু ডাঃ জানা জানতেন। উনি তখন মজা করে বলেছিলেন, আপনার জন্য আছে ঝান্ডা বাঁধা ওই ডাণ্ডা।
এর কিছুদিন মনে হয় এক দেড় মাস পড়ে এসে গেল বিধান সভার নির্বাচন। নিয়োগীজি আমাকে ডেকে পাঠালেন দল্লী। গিয়ে দেখি আমার আগেই সেখানে গিয়ে বসে আছে চেতনা মন্ডল নামক এক সামাজিক সংস্থার অধ্যক্ষ সুরেশ মোড়ে। মোড়ে আসলে মহারাষ্ট্রের গড় চিরোলির লোক। এখন এসে ঘাঁটি গেড়েছে উত্তর বস্তারে। এ এখানে আদিবাসীদের সংগঠিত করে নানা ধরনের ছোট খাটো আন্দোলন করে। এবং সে ভীষণ রকম বাঙালী বিদ্বেষী। তার সংগঠনে কোন বাঙালীর স্থান নেই। সে বলে বাঙালী এখানে বহিরাগত। যারা জঙ্গল ধ্বংস করছে। জমি হরপ করেছে। চাকরি ব্যবসা সব দখল করে নিয়েছে। আদিবাসীদের সে উস্কানি দেয়–এখান থেকে এদের তাড়াতে হবে।
কংগ্রেস নেতা অরবিন্দ নেতামেরও বাঙালীদের উপর খুব রাগ। কারণ বাঙালীরা তাকে ভোট দেয় না। কাকের লোকসভার অন্তর্গত এই নারায়ণপুর বিধানসভার সিটে বিজেপি জেতে। সে কারণে সুরেশ মোড়ে আর অরবিন্দ নেতামের খুবই দোস্তি।
আর একজন মানুষকে এখানে দেখলাম। ইনি রবিশংকর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন প্রফেসর প্রফুল্ল কুমার ঝ। সম্প্রতি উনি রিটায়ার করেছেন। হাতে বিশেষ কাজ নেই। অবসর সময় কাটে না। তাই মুক্তি মোর্চার সাথে কাজ করে সময় কাটাতে চান।
আমাদের তিন জনকে নিয়ে এক মিটিংয়ে বসে নিয়োগীজি জানালেন যে এবার ছত্তিশগড় মুক্তিমোর্চা বিধান সভার নির্বাচনে মোট ১৩টা কেন্দ্রে প্রার্থী দেবার কথা ভাবছে। যার মধ্যে একটা নারায়ণপুর। উনি আমাদের তিন জনের এক কমিটি বানিয়ে ভার দিলেন সর্ব সম্মতি ক্রমে একজন প্রার্থী বাছাই করার। আমি এক নগণ্য মানুষ। সমাজে যার মূল্য এক কানাকড়িও নয়, তাকে এত গুরুত্ব! এ আমার কল্পনারও অতীত।
নারায়ণপুর বিধানসভার আসন আদিবাসীদের জন্য সংরক্ষিত। প্রফুল্ল কুমার ঝাঁ এবং সুরেশ মোড়ে প্রস্তাব করলেন চেতনা মণ্ডলের এক নেতা সুরজারাম নরেটির নাম। এমনিতে সুরজারাম লোকটা ভালো। আদিবাসীদের সমর্থনও আছে তার পিছনে। তবে সে অরবিন্দ নেতামের কাছের লোক। নেতাম পরাল কোটির যেখানে টিকবে সুরজারাম মঞ্চে বসে থাকে। আমি সে কথা নিয়োগীজিকে জানাই। সুরজা ভোটে দাঁড়ালে বাঙালীরা তাকে ভোট দেবে না। বহু চেষ্টায় আমি যে মুক্তি মোর্চার ছোট একটা সংগঠন গড়ে তুলতে পেরেছি সব বিরূপ হয়ে দূরে সরে যাবে। আমার যুক্তি মেনে নিয়ে দু দুজন প্রবল সমর্থক থাকা সত্ত্বেও নিয়োগীজি সুরজারামকে বাতিল করেদিলেন। আমি শিক্ষা দীক্ষাহীন এক কাঠ বেচা মানুষ নিয়োগীজির কাছে এত গুরুত্ব পাবো কোনদিন ভাবিনি।
সুরজারাম বাদ গেলে বাছাই করা হয় নারায়ণপুরের এক স্কুল মাস্টার মুরহারাম দেহারীকে। যার প্রচারে ডাঃ জানা তো ছিলেনই, যোগেন দা, তাছাড়া পশ্চিমবঙ্গ থেকে কনোরিয়া জুট মিলের শ্রমিক সংগঠনের নেতা প্রফুল্ল চক্রবর্তী, কুশল দেবনাথ, পূর্ণেন্দু বোস, চঞ্চল মুন্সী সহ আরো দু তিনজন গিয়েছিলেন। কিন্তু তবুমুরহারাম দেহারী হেরে গেলেন। হেরে গিয়েছিলেন মোর্চার প্রার্থী অন্য এগারো জনও। শুধু ডোণ্ডি লোহরা ক্ষেত্র থেকে জয়ী হয়েছিলেন জনক লাল ঠাকুর।
এরপর যোগেন দা দিল্লী ফিরে যান, কলকাতার লোকজন সব ফিরে যায় কলকাতায়। সেই সময় একদিন দল্লীতে গেছি। এক চা দোকানে বসে চা খাচ্ছিল প্রফুল্ল ঝাঁ। আমার উপর তার রাগ ছিল। আমাকে দেখে সে তার এক সঙ্গীকে বলে–বাঙালীরা সব বেইমান। অসুখ হলে সব দৌড়ে শহীদ হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে চলে আসে। আর ভোট দেবার বেলা দেয় সাম্প্রদায়িক দল বিজেপিকে। এবার আমরাও সুরেশ মোড়ের সাথে মিলে বাঙালী খেদাও আন্দোলন শুরু করবো। এটা সে বলেছিল আমাকে রাগাবার জন্য। এবং আমি রেগে গিয়েছিলাম। ফিরে এসে ছিলাম কাপসী। আর একটা চিঠির দুটো কপি করে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম একটা দিল্লী একটা কলকাতায়। যাতে আমার প্রশ্ন ছিল–মোর্চা যদি বাঙালী খেদাও আন্দোলন করে আমরা সে সংগঠনে কেন থাকবো? প্রফুল্ল চক্রবর্তী বাবুরা সে চিঠি নিয়োগীজির কাছে পাঠিয়ে দেয়। এরপর যা হয়–নিয়োগীজি আমাকে ডেকে পাঠান।
আমি জানি অন্য কোন নেতা হলে আমার কৃতকর্মের জন্য আমাকে মেরে তালগোল পাকিয়ে দিত। উনি কিন্তু সে সব করলেন না, ধীর গলায় বললেন আমাদের যদি কোন ভুল ত্রুটি ঘটে যায় আপনি সেটা নিয়ে আমাদের সঙ্গে আলোচনা না করে যদি দিল্লী কলকাতায় চিঠি লিখে বেড়ান তাহলে আমরা ভুলটা সংশোধন কি করে করবো। এটা আপনি কেন করলেন?
