নিরুপায় হয়ে সে আর নিয়োগীজিকে মেরে ফেলতে পারে না। তাকে থানার লক আপে রেখে আরো পুলিশ নিয়ে বন্ধক পুলিশদের মুক্ত করতে এসে গুলি চালায়। বুকে গুলি লেগে ঢলে পড়ে সাত জন মানুষ। কিন্তু তবু মজুরদের মনোবলে চিড় ধরে না। নিহত সাথীদের তারা ঘিরে বসে থাকে, পুলিশদেরও ঘিরে রাখে। রাত কেটে যায়। পরের দিন পুলিশ আসে আরো বেশি সংখ্যায়। আবার গুলি চালায়। এবার মারা যায় আরো চার জন। মোট এগারো জন মানুষ যার মধ্যে বারো বছরের বালক সুদামা, মহিলা অহল্যা বাইও আছে। এদের খুন করে বন্ধক পুলিশদের মুক্ত করে নেয় তারা। মজুররা স্বজন হারানো শোকে পাগল তো হয়ে গিয়েছিল কিন্তু এত পাগল নয় যে বন্দী পুলিশগুলোকে কেটে কুচি কুচি করে ফেলে। তারা শোকের মধ্যেও মনে রেখেছিল–এরা আমাদের আসল শত্রু নয়। আসল শত্ৰু বিলাসবহুল ভবনে বাস করা ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকা মালিক শ্রেণি আর তাদের রক্ষাকর্তা নেতা মন্ত্রী-সরকার।
পরের দিন মজুররা খাদানের কাজ বন্ধ করে দেয় শংকর গুহ নিয়োগীর মুক্তি এবং মালিক ও সরকার পক্ষের আলোচনার টেবিলে বসার দাবিতে। আঠারো দিন আন্দোলন চলার ফলে লৌহ আকরের অভাবে ভিলাই ইস্পাত কারখানা বন্ধের মুখে এসে দাঁড়ায়। তখন তারা নিয়োগীজিকে মুক্তি দেয় এবং মজুরদের দাবি মেনে নেয়।
দেখলাম শহীদ হাসপাতাল। শাসক এবং শোষক শ্রেণির মাইনে করা ক্রীতদাসরা প্রভুদের নির্দেশে প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল যে ১১ জন মানুষের তাদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে উৎসর্গ এই হাসপাতাল আজ হাজার হাজার মানুষের জীবন রক্ষার প্রধান কেন্দ্র। কুসুমি বাই নামে এক লড়াকু মহিলা নেত্রী সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে উপযুক্ত অভিজ্ঞ ডাক্তার নার্সের অভাবে মারা গিয়েছিলেন। তখন নিয়োগীজির মাথায় আসে একটি হাসপাতাল গড়ে তোলার ভাবনা। ডাক্তার বিনায়ক সেন আর নিয়োগীজি দুজনে মিলে শ্রমিকদের দানে এবং শ্রমে অবশেষে প্রতিষ্ঠা করেন এই হাসপাতাল। এখন যাকে সঞ্চালন করছেন ডাঃ শৈবাল জানা সহ একদল নিয়ম নিষ্ঠ সেবাব্রতী স্বেচ্ছাসেবী। যে কোন অসুখে ওষুধের তো একটা পরিমাপ থাকে, কিন্তু পরিমাপ নেই এখানকার ডাক্তার নার্স সেবিকাদের সেবা পরিচর্যায়। একজন রোগী বললএখানকার মানুষের ব্যবহারে আমাদের অর্ধেক রোগ বিনা ওষুধে সেরে যায়। ডাক্তার নর্মান বেথুন ডাক্তার কোটনিশ ড্রিংক্রার বিনায়ক সেনদের শিক্ষায় শিক্ষিত এই সব স্বাস্থ্যকর্মী সমাজের প্রকৃত বন্ধু।
চারদিন ঘুরে ঘুরে সব কিছু দেখবার পর নতুনতর এক অভিজ্ঞতায় অভিজ্ঞ হবার পর দ্বিতীয় বার মুখোমুখি হলাম আবার নিয়োগীজির। বললাম, এবার আমায় যেতে হবে। উনি তখন অর্থবহ হাসি হাসলেন–যেতে পারবেন? তখন মনে মনে আমিও বুঝে গেছিলাম–যেখানে যত দুরেই যাই এ জীবনে আর দল্লী থেকে যাওয়া হবে না। যাওয়া যাবে না।
আশা দিদি আমাকে চা দিয়ে ছিলেন। চা খেয়ে নিয়োগীজি বললেন–আপনি একজন বামপন্থী মানুষ। আমরাও তাই। একই অঞ্চলে আছি। আমার মনে হয় আপনি যে কাজই করুন মানুষের পক্ষেই করবেন। তাই আমরা আপনাকে কিছু সাহায্যের কথা ভেবেছি। দুবেলা কিছু পেট ভরে খাওয়া তো দরকার কি বলেন? তা এ ব্যাপারে আপনি আমাদের কাছে কি ধরনের সাহায্য আশা করেন?
কত কিছু আগে ভেবে রেখেছিলাম বলবো বলে। এখন সে সব কথা আর মনে পড়ে না। নিয়োগীজিকে দেখার পর সব প্রশ্নের অনায়াস পরিসমাপ্তি ঘটে গেছে। এত বড় একজন নেতার কী কৃচ্ছসাধন, কী সাধারণ জীবন যাপন, হাসি মুখে কী ভীষণ দারিদ্রের মধ্যে সংসার প্রতিপালন। সংগঠন থেকে সাতশো টাকা ভাতা নেন তিনি। মাত্র সাতশো! তেইশ টাকা তেত্রিশ পয়সা রোজ। এর চেয়ে তো আমার রোজগার কম নয়। কোনদিন দু সাইকেল কোনদিন তিন সাইকেল কাঠ বেচি।
অনেক ভেবে শেষে বলি-আমার ভালো কুড়ুল নেই। যদি আপনারা আমাকে একখানা কুড়ুল বানিয়ে দ্যান তত খুব উপকার হয়। তা হলে যেভাবে হোক আমি সংসার চালিয়ে নিতে পারবো।
আমার কথা শুনে নিয়োগীজি হাসলেন। এ হাসির কারণ কি? আমি কি কোন ভুল কিছু বলে ফেলেছি? আমার বাবা আমাকে বলে গেছেন কোন নিমন্ত্রণ বাড়িতে গিয়ে এমন খাবি না যে পরের বার নিমন্ত্রণ করার আগে গৃহকর্তার চিন্তায় পড়তে হয়! আমি তো সামান্য মাত্র পঞ্চাশ টাকার বস্তু চেয়েছি! এর চেয়ে কম আর আমার কোন কাজের।
একটু পরে বলেন তিনি–জঙ্গলে যাবেন, কাঠ কাটবেন বাজারে এনে বেচবেন। সারা দিন তো এতেই শেষ। তাহলে মানুষের জন্য কাজ করবেন কখন?
বলি–দিনের পরে সারা রাত থাকে! এক টাকার কেরোসিন কিনতে পারলে রাত দুপুর পর্যন্ত বসে লেখায় আর কোন সমস্যা থাকবে না।
আচ্ছা এ ব্যাপারটা ছেড়ে দিন। বলেন তিনি–আপনার সংসার কি ভাবে চলবে সে দায়িত্ব আমাদের। কবে কাপসী যাবেন? যাবার আগে ডাক্তার জানার সঙ্গে দেখা করে যাবেন।
একটু সময় থেমে ফের বলেন তিনি দল্লীর খাদান আর খুব বেশি হলে দশ বছর চলবে। এরপর এটা বন্ধ হয়ে যাবে। তখন ভিলাইইস্পাত কারখানাকে সচল রাখতে হলে বস্তারের রাওঘাট খাদান চালু করতে হবে। রাওঘাটে রয়েছে অতি উন্নত মানের লৌহ আকর। এবং এটা এশিয়া মহাদেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় লোহার খাদান। সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে একেসম্পূর্ণ মেকানাইজ মাইন্সে পরিণত করার। বিদেশ থেকে বড় বড় মেশিন আসবে। যা চালনা করার জন্য বাইরে থেকে আনা হবে চার পাঁচশো অপারেটার। এতে অঞ্চলের কতটুকু বিকাশ হবে? আদিবাসীর জঙ্গল যাবে, জমিন যাবে, জল যাবে, তাদের জীবন ধারণ প্রণালী নষ্ট হবে, অস্মিতা এবং সংস্কৃতির উপর বহিরাগতের হামলা হবে। এত কিছু যাবে কিন্তু বিনিময়ে তারা কিছু পাবে না। সেই জন্য আমরা চাইরাওঘাটে মেকানাইজ নয়, ম্যানুয়াল মাইন্স হোক। দল্লীতেও পূর্ণ মেশিনীকরণের প্রয়াস চলেছিল। আন্দোলন করে আমরা সেটা রুখে দিতে পেরেছি। এখানে অর্ধ মেশিনীকরণ হয়েছে। যে কাজ মানুষের পক্ষে অসাধ্য সেটা মেশিন করবে। যদি রানাঘাটেও সেটা করা যায় কম পক্ষে তিরিশ হাজার মানুষ কাজ পাবে। সভ্যতার অগ্রগতিতে লোহার অবদান অসামান্য। লোহা অবশ্যই চাই তবে সেটা বহু সংখ্যক মানুষের ক্ষতি করে নয়।
