তিনশো কুড়িটা গ্রামের মানুষকে এ সব বোঝান তিনি। এবং সংগঠিত করেন। এই পর্বে ওনার ছদ্মনাম ছিল-মদন। আমার মনে আছে এ তথ্য কলকাতার কোন এক কাগজে যেন “খবর” হয়ে ছিল।
এই সময় নিয়োগীজির সাথে সিপিআই এমএল–এর গণ সংগঠন গড়ার প্রশ্নে মতানৈক্য দেখা দেয়। তারা গণ সংগঠন গড়ার চাইতে গুপ্ত সংগঠন গড়ে শ্রেণি শত্রুর উপর গেরিলা আক্রমণের উপর জোর দিতো। আর নিয়োগীজি চাইতেন গণ সংগঠনের মাধ্যমে ছোট ছোট দাবি দাওয়ার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে প্রচুর মানুষকে একত্র করে ধাপে ধাপে সেই অন্তিম লড়াইয়ের দিকে অগ্রসর হওয়া। মত বিরোধের পরিণামে সিপিআই এমএল ওনাকে বহিষ্কার করে দেয় দল থেকে।
এর পরে উনি চলে যান দানী টোলা পাথর খাদানে। পরিচয় গোপন রেখে এক ঠিকাদারের অধীনে মুনশীর কাজ নেন এবং খাদান মজুরদের সংগঠিত করেন। একদিন উনি লেবার পেমেন্টের টাকা আনবার জন্য ভিলাইয়ে ঠিকাদারের কাছে গিয়ে ছিলেন। পুলিশ তো ওনাকে খুঁজে হয়রান হচ্ছিল। এবার তারা ওনাকে ধরে ফেললো এবং মিসায় জেলে পুরে দিল। তখন উনি সাহস আর সতোর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে গেছেন৷ ছত্রিশগড় ওনাকে চিনে ফেলেছে। তাই দিল্লীর এক শ্রমিক প্রতিনিধিদল জেলখানায় গিয়ে ওনার সাথে দেখা করে এবং আবেদন জানায়–আপনি দল্লীর শ্রমিকদের নেতৃত্ব দিন। আপনাকে আমরা দল্লীতে নিয়ে যেতে চাই।
তখনো নিয়োগীজির কারাবাস শেষ হতে ছয় মাস বাকি ছিল। উনি বলেছিলেন-জেল মুক্ত হই। নিশ্চয় যাবো দল্লী। আর তারপর যেদিন উনি জেল মুক্ত হলেন, জেল গেটে অপেক্ষামান আট হাজার মানুষ ষোল হাজার হাতে ওনাকে বরণ করে নিয়ে এলেন দল্লী। তারপর একটানা চৌদ্দ বছর শুধু লড়াই আর বিজয়ের ইতিহাস। দীর্ঘ পরাজয়ের গ্লানি ঝেড়ে ফেলে মানুষের হেসে ওঠার গল্প। ১৯৭৭ সালে যে মজুর হাড়ভাঙা খাটুনির পর মজুরি হাতে পেত মাত্র ৭ টাকা, কঠিন লড়াইয়ের ফলে সে ৮০ টাকা মজুরি আদায় করে নিতে সমর্থ হয়েছে। স্বামী স্ত্রী মিলিত মজুরিতে জীবন সচ্ছল হয়েছে। ছেলে মেয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে। দৃঢ় সংকল্প, অটুট মনোবল, অসীম সাহস আর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব এই ছিল তাদের লড়াই জেতার প্রধান অস্ত্র। কিন্তু এই সব কিছুকে সুপরিকল্পিত ভাবে একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন যে পরাক্রমী সেনাপতি তার নাম শংকর গুহ নিয়োগী। আপামর জনতার বড় শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার জন–নিয়োগী ভাইয়া।
কাল যখন এখানে এসেছিলাম রাত হয়ে গিয়েছিল। বিশেষ কিছু দেখতে পাইনি। এখন পথে পা দিয়ে আমি চমকে উঠলাম। দোকান বাজার রাস্তাঘাট সর্বত্র উড়ছে লাল সবুজ নিশান। যত শ্রমিক পুরুষ সবার গায়ে লাল জামা পরনে সবুজহাফ প্যান্ট। নারীদের গায়ে লাল ব্লাউজ পরিধানে সবুজ শাড়ি। বালক বৃদ্ধ সবাই লাল সবুজে মাখামাখি। চলন্ত ট্রাকে উড়ছে লাল সবুজ পতাকা। জিপ সাইকেল রিকশা কোথাও খালি নেই। গুটি কয়েক বাবু গোছের লোক ছাড়া সবার শরীরে এই দুই রঙ। সবার এ রঙ বড় প্রিয় বড় আপনার। দূরের ওই যে লোহা পাহাড়, পঁচিশ হাজার মজুর সেখানে ঘাম ঝরায় সেই পাহাড়টাও যেন পরম মমতায় শরীরে মেখে নিয়েছে ওই দুই রঙ “লাল হারা”। এই রঙ ছত্তিশগড় মুক্তি মোর্চার পতাকার রঙ। এরঙ শ্রমিক কৃষক মেহনতি জনতার এবং মেহনতি জনতার প্রিয় নেতা শংকর গুহ নিয়োগীর।
এরপর দেখতে গেলাম লোহার খাদান। দেখলাম আত্মবিশ্বাসী আত্ম সম্মান সচেতন একদল কর্মরত নারী পুরুষ। প্রত্যেকের চোখে মুখে দৃঢ় দৃপ্ত প্রত্যয়। শাবল গাইতি কোদাল চালানো হাতে যারা আমাকে সাথী বলে বুকে টেনে নিল। ছত্তিশগড় সাত জেলা নিয়ে গঠিত। ছয় জেলার প্রতিনিধি মুক্তি মোর্চার সঙ্গে আছে। বাকি ছিল বস্তার। আমি বস্তার জেলা থেকে গেছি শুনে আনন্দে উদ্বেল হল তারা।
দেখলাম সেই ১৯৭৭ সালে আন্দোলনরত শ্রমিকদের উপর গুলি চালনায় নিহত ১১ জন শহীদ সাথীর স্মৃতি স্তম্ভ। সেদিন রাতে কিছু মজদুর সাথী নিয়ে ইউনিয়নের মাঠের মাঝখানে শুয়েছিলেন নিয়োগীজি। দুখানা ভ্যান বোঝই পুলিশ নিয়ে এক অফিসার হামলে পড়েছিল নিয়োগীজির উপর। যার প্রতি গোপন নির্দেশ ছিল নিয়োগীজিকে “এনকাউন্টার” করে দেবার। ঘুমন্ত মজদুর সাথীরা কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগে নিয়োগীজিকে ভ্যানে তুলে নিয়ে এসেছিল “বালোদ”-এর ঘন জঙ্গলে। বড় মোলায়েম গলায় বলেছিল ধূর্ত পুলিশ অফিসার–হাম আপকো বহুত রেসপেক্ট করতে হ্যায়। আপকো জেলমে ঠুস দেনা হামে আচছা নেহী লাগেগা। হাম চাহতে হ্যায় আপ ভাগ যাইয়ে বাঙাল। অউর কভি দল্লী মৎ আইয়ে।
নিয়োগীজি বুঝতে পেরেছিলেন ভ্যান থেকে নামা মাত্র ওনাকে গুলি করা হবে। যা কালকের খবরের কাগজে খবর হবে—পুলিশ ভ্যান থেকে পালাতে গিয়ে গুলিতে নকশাল নেতার মৃত্যু। উনি তখন অফিসারকে বলেছিলেন–আমাকে গুলি করতে হলে ভ্যানের মধ্যেই করতে হবে। অন্য কোন সুযোগ আপনি পাবেন না।
সেটা করাও সেই অফিসারের পক্ষে কঠিন ছিল না। কিন্তু সমস্যা হয়ে গেছে একটা। নিয়োগীজিকে তুলে নিয়ে প্রথম ভ্যানখানা চলে আসার পর মজুররা বুঝে ফেলেছে তাদের নেতাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, কেন নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সাথে সাথে তারা পিছনের ভ্যানখানা ঘিরে ফেলেছিল। এবং ওয়ারলেস মারফত অফিসারকে খবর পাঠিয়ে ছিল, আমাদের নেতার যদি কিছু হয় দশ বারো জন পুলিশের একটাকেও বাঁচিয়ে রাখবো না। যতক্ষণ তাকে আমাদের কাছে পৌঁছে দেবে সব পুলিশ আমাদের বন্ধক থাকবে।
