পরের দিন সকাল বেলায় দেখা করতে গেলাম নিয়োগীজির বাসভবনে। বাসভবন! হায় রে বাসভবন! মাটির দেওয়াল দেওয়া একটা মাত্র বড় ঘর যার দুটো বারান্দা। ঘরটির ছাউনি দেওয়ায় ব্যবহার করা হয়েছে পোড়া মাটির খাপরেল। ঠিক যেন শ্রমিক বস্তির একখানা ঘর। ঘরে বিশেষ কোন আসবাব নেই। পাশের একটা বারান্দায় রান্না করা হয়। সেই রান্নাঘরে কাঠের উনুনে নিজের হাতে রান্না করেন নিয়োগীজির স্ত্রী যিনি এক আদিবাসী কন্যা আশা গুহ নিয়োগী। তখন মুক্তি মোর্চা থেকে মাসে সাতশো টাকা ভাতা পেয়ে স্ত্রী দুই মেয়ে এক ছেলে নিয়ে সংসার প্রতিপালন করা ছত্তিশগড়ের অবিসংবাদী নেতা নড়বড়ে চৌকিতে বসে চা খাচ্ছিলেন। আমি যাওয়া মাত্র আশা দিদি এক কাপ চা আমাকে দিলেন। তখন বলেন নিয়োগীজি, এই প্রথম দল্লী এলেন, দু চার দিন থাকুন। ভালো করে এখানকার মানুষদের সাথে পরিচিত হোন। খাদানে যান, আমাদের স্কুল-ওয়াকশপ সব দেখুন। তারপর কথা হবে।
বলেন তিনি–আমরা একটা ব্যবস্থা ধ্বংস করতে চাইছি। কিন্তু তার পরে কি নির্মাণ করবো তার কোনো মডেল যদি মানুষকে দেখাতে না পারি মানুষ ধ্বংস প্রবণ হবে কেন? এক সময় জয় প্রকাশ নারায়ণ নির্মাণ প্রধান আন্দোলন করেছিলেন, সে আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে। এক সময় নকশালপন্থীরা ধ্বংস প্রধান আন্দোলন করেছিল সেটাও কোন সুফল দিতে পারেনি। আমার এর ফলে যেটা মনে হয় যে ধ্বংস এবং নির্মাণ দুটোর মধ্যে একটা সমন্বয় খুবই জরুরি। যে কারণে আমাদের একটা প্রিয় শ্লোগান ধ্বংসের জন্য নির্মাণ, আর নির্মাণের জন্য ধ্বংস। এই ভাবনা মাথায় রেখেই আমরা আমাদের সংগঠনের মধ্য দিয়ে হাসপাতাল স্কুল ছোট ছোট ওয়ার্কশপ, সমবায়, এছাড়া সংস্কৃতি-সাহিত্য এ সবের নির্মাণ এবং পরিচালনার মধ্য দিয়ে মানুষের কাছে একটা বার্তা পৌঁছে দিতে চেয়েছি যে আমরা যে সমাজ ব্যবস্থাটা চাই সেটা কেমন হবে। আর একটা কাজ আমরা করে থাকি সেটা হল-গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আমাদের জন্য আবেদন নিবেদন আন্দোলন মিটিং মিছিল আইন আদালতের যে কটা দরজা এখনো খুলে রেখেছে সেই পথ পদ্ধতির মাধ্যমে যতটুকু যা পারা যায় মানুষের জন্য দাবি আদায় করা এবং তাকে বোঝানো যে এই পথে বিশেষ কিছু পাওয়া সম্ভব নয়। সেটা পেতে হলে শেষ লড়াই আমাদের লড়তেই হবে।
কিছু পরে আবার বলেন তিনি–দেশে অনেক বড় বড় ট্রেড ইউনিয়ান মুভমেন্ট হয়েছে। কিন্তু সে সব ইউনিয়ন শ্রমিক শ্রেণিকে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক দাবি দাওয়ার সংকীর্ণ রাজনীতির মধ্যে আটকে রাখা ছাড়া আর কোন কাজ করেনি। একজন শ্রমিক কারখানা বা খনিতে যেটুকু সময় কাজ করে তার পরে আর যে বাকি সময় সেটাকে কি ভাবে সদুপযোগ করবে সে বিষয়ে কোন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করেনি বা করতে পারেনি। সেটা আমরা করেছি। একজন শ্রমিক এবং তার সন্তান সন্ততির জীবনে যাতে সর্বাঙ্গীন বিকাশ ঘটে সে দিকেও আমাদের দৃষ্টি আছে। এটাই আমাদের বিশেষত্ব এবং অন্যান্য ইউনিয়ানের সঙ্গে মৌলিক পার্থক্য।
আমরা শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির জন্য আন্দোলন করেছি। বেতন বেড়েছে। কিন্তু সে তার বাড়তি বেতন খরচ করার জন্য চলে গেছে মদের দোকানে। যে জন্য আমাদের মদ্যপান বিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলতে হয়েছে। যা মোটেই কোন ট্রেড ইউনিয়নের কাজ নয়। করেওনি কেউ কোন দিন। কমিউনিস্ট পার্টিতে এ ধরনের কোন কর্মসূচিও নেই। যে কারণে আমাদের এই আন্দোলনের প্রেরণা মহাত্মা গান্ধীর কাছ থেকে নিতে হয়েছে। মার্কসবাদ-গান্ধীবাদ লোহিয়াবাদ-আম্বেদকরবাদ, সে সব বাদে যে জনকল্যাণকারী দিক আছে আমরা তার চর্চা করি এবং নিজেদের মতো করে প্রয়োগ করে থাকি। এটাও আমাদের একটা বিশেষত্ব। দু চার দিন এখানে থাকুন। নিজের চোখে দেখুন। জানুন বুঝুন তার পরে আবার কথা হবে।
শ্রমিকতীর্থ দল্লীরাজহারা। এখানেই সর্বপ্রথম শ্রমিক শ্রেণি মালিক তোষক দালাল ট্রেডইউনিয়ান নেতাদের খপ্পর থেকে বের হয়ে এসে তৈরি করেছিল নিজেদের নেতৃত্বে নিজেদের ইউনিয়ান। নিয়োগীজি তখন জেলে ছিলেন। উনি ছিলেন ছত্তিশগড়ে নিবর্তনমূলক আইন-মিসায় প্রথম বন্দী।
শংকর গুহ নিয়োগী পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার লোক। রাজনৈতিক জীবনে প্রবেশ ওখানেই। তখন উনি সিপিআই এমএল পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। চারু মজুমদার সহ সিপিআই এম এল-এর অনেক নেতার সঙ্গে পরিচয় ছিল তার। পরে উনি ভিলাই চলে আসেন এবং ভিলাই ইস্পাত কারখানায় চাকরি নেন। চাকরি, সেটাই তো ওনার এক মাত্র উদ্দেশ্য ছিল না। ছিল একটা জঙ্গি সংগঠন গড়ে তোলার ইচ্ছা। সে কাজে উনি কিছুটা সফল হতেই মালিক শ্রেণির কুনজরে পড়ে যান। ছাটাই করে দেওয়া হয় ওনাকে। পিছনে লেলিয়ে দেওয়া হয় পুলিশ। যার ফলে আত্মগোপন করতে বাধ্য হন।
এই সময় নিয়োগী সমগ্র ছত্তিশগড় পরিভ্রমণ করেন। কখনো ছাগল কেনা বেচা কখনো গ্রামে গিয়ে কাপড় জামা বিক্রি করা এ ভাবে ঘুরে ঘুরে এখানকার মানুষের দুঃখ দুর্দশার সাথে পরিচিত হন। এটা ছত্তিশগড়। ভারতবর্ষের মধ্যে সব থেকে পিছিয়ে থাকা অঞ্চল। এখানে মাটির নিচে রয়েছে লোহা তামা ডিলিমাইট বক্সাইট সব অপার খনিজ সম্পদ। মাটির উপরে রয়েছে শাল সেগুন বীজা বাঁশবল্লী বিড়ির পাতার অফুরন্ত ভান্ডার। এখানকার জমিতে সোনার মত ফসল ফলে। যে কারণে ছত্তিশগড়কে বলা হয়-ধান কি কাটোরা। এত সম্পদ থাকার পরেও এখানকার মূল নিবাসী মানুষ আদিবাসী-বনবাসী মানুষ নিঃস্ব। কারো পেটে ভাত মাথায় তেল পায়ে চপ্পল পরনের কাপড় নেই। এ সবই এক দল বহিরাগত শেঠ বেনিয়া-সাৎকার-শিল্প মাফিয়া এবং রাষ্ট্রীয় শোষণের পরিণাম।
