দিন কয়েক পরে একদিন পারালকোট অঞ্চলের সব থেকে বড় বাজার পাখান জুড়ে এক নির্বাচনী জনসভার আয়োজন করেছিল ছত্তিশগড় মুক্তিমোর্চা। আমাকে সেদিন সেখানে নিয়ে গেলেন যোগেন দা। সভার কাজ শুরু হয়ে যাবার অল্প কিছু সময় পরে আমরা পৌঁছে ছিলাম সভাস্থলে। দেখেছিলাম মোটা খদ্দরের পাঞ্জাবি পায়জামা পড়া একজন ফরসা দীর্ঘদেহী উজ্জ্বল চোখ মানুষ সব মানুষের সাথে মিশে মাঠের ঘাসের উপর বসে আছেন। সবার সঙ্গে মিশে থাকলেও মোটেই তিনি সব মানুষের মতো নন। আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব। হাসি মাখা অমলিন মুখ। সব মাথা ছাড়িয়ে যায় এমন এক উঁচু মাথা। দেখলেই বুঝে নেওয়া যায় এ মাথা কখনো কোন অন্যায় অত্যাচারের সামনে নত হতে শেখেনি। ভয়ে ভেঙে নুয়ে পড়ে না। অর্থে কেনা যায় না!
আমি নিয়োগীজির সাথে কথা বলেছিলাম মাত্র দশ কি বারো মিনিট। মনে হয়েছিল যেন আমার বহু বছরের চেনা। আপন, পরম আত্মীয়। আর তারপরই মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ছিলাম আজ থেকে আমার এই পরিচয় হোক–আমি শংকর গুহ নিয়োগীর লোক।
আমি আমার ঘামে ভেজা ছেঁড়া জামার পকেট থেকে বিড়ি বের করে ওনার হাতে দিয়েছিলাম। আর উনি আমার দিকে এগিয়ে দিয়েছিলেন দেশলাই। বলেছিলেন–একবার দল্লী আসুন।
আদেশ নয় অনুরোধ নয়, উনি মাত্র তিনটে শব্দে আমাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন আমার সঠিক স্থান। ওই শব্দ কটায় কি জাদু, কি সম্মোহন ছিল কে জানে–আমি ঘাড় কাত করেছিলাম যাবো। নিশ্চয় যাবো।
যেতে তো আমাকে হবেই। আমার ভবিতব্য যে আমার জন্য ওই গন্তব্য নির্ধারণ করে রেখেছে। না গিয়ে উপায় আছে? যে কথা প্রকাশ হয় না, বুকে যেমন দাগ কেটে বসে যে জলকনা সমুদ্রে পৌঁছাতে পারে না, মাটি তাকে শোষে। যদি একবার সে সমুদ্রে পৌঁছে যায় সমাপ্ত হয়ে যায় তার সব ক্ষুদ্রতা। বিশালের অংশ হয়ে সেও বিশাল বিরাট মহান হয়ে যায়। আমাকে সমুদ্র ডাকছে সমুদ্র হবার জন্য। আর আমি যাবো না?
লোকসভার নির্বাচন শেষ হয়ে গেল। এবারও অন্য বারের মতো ভোটে জিতে গেল কংগ্রেস প্রার্থী অরবিন্দ নেতাম। মুক্তি মোর্চার সবাই ফিরে গেল দল্লী। এর পর মাস দুয়েক তাদের আর কোন খবর নেই। নিয়োগীজি আমাকে দল্লী যেতে বলে গিয়েছিলেন। কিন্তু গাড়ি ভাড়ার টাকা। আমি কিছুতেই যোগাড় করে উঠতে পারি না। যেতে কুড়ি আসতে কুড়ি, দশ টাকা অন্য খরচ, পঞ্চাশ টাকা সব মিলিয়ে। এত টাকা পাবো কোথায়। মনে একটু কষ্ট হচ্ছিল। এত কথা বলে গেল, আর এত দিনে ওরা আমার কোন খোঁজ খবর নিল না!
খবর আমার তারা নিয়েছে। সেটা আমি জানি না। এখন থেকে প্রচুর রোগী শহীদ হাসপাতালে যায়। তাদের কাছ থেকে আমার প্রতি দিনকার জীবন চর্যা তারা জেনেছে। কিন্তু নানা ধরনের ব্যস্ততার জন্য আমাকে দল্লী নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করে উঠতে পারেনি। হঠাৎ একদিন আমার ভাঙা ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালো দুধ সাদা এক অ্যামবাসাডার, যার চালক আমাকে বলল–নিয়োগীজি তুমকো লে জানেকে লিয়ে ভেজা।
এ সেই গাড়ি যা নিয়োগীজি ব্যবহার করেন। এ সেই গাড়ি যা বিশেষ বিশেষ সময়ে সম্মানীয় মানুষকে নিয়ে আসার জন্য পাঠানো হয় বিমান বন্দরে রেল স্টেশনে। এই গাড়িতে চেপেই একদিন দল্লী আসেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং, রাম বিলাস পাশোয়ান, জর্জ ফার্নান্ডেজ। এই গাড়ি চেপেই নাগপুর থেকে ভিলাই গিয়েছিলেন আর্য সমাজি নেতা এবং রাষ্ট্র সংঘের “দলিত দাসতানিধি”র তিন বছরের জন্য সম্মানীয় অধ্যক্ষ স্বামী অগ্নিবেশজি। সেদিন অবশ্য তার সহযাত্রী আমিও ছিলাম। অনুপ সিং ছিল।
সেই গাড়ি আজ একশো মাইল পথ পার হয়ে এক কাঠঅলাকে নিয়ে যাবার জন্য এসেছে। আমি কি এই গাড়িতে চড়বার উপযুক্ত মানুষ! যার গায়ের জামা ছেঁড়া, পায়ে একটা দশ টাকা দামের টায়ারের চপ্পল পর্যন্ত নেই! খালি পায়েই গিয়ে উঠে বসলাম সেই গাড়িতে। কি নেই কি আছে সেসব আমার ভাববার অবকাশ কোথায়!
যখন আমরা দল্লী গিয়ে পৌঁছলাম নিয়োগীজি রাজনাদ গাঁও চলে গেছেন। ফিরবেন রাতে। তবে কত রাতে তা কেউ জানে না। এখানে দেখা হল ডা. জানা আর যোগেনদার সাথে। ডা. জানা তো খুব ব্যস্ত মানুষ এত বড় হাসপাতালের সব দায় তার ঘাড়ে। বেশিক্ষণ কথা বলতে পারলেন না তিনি। তবে যোগেনদা রইল সর্বক্ষণ আমরা সাথে সাথে। তার চোখে পড়ল আমার পা খালি। এটা পশ্চিম বাংলার সমতল পথ নয়। এ ছত্তিশগড়ের উবর খাবর পাথরের দাঁত বের করা পথ। খালি পায়ে চলতে গেলে যে কোন সময়ে ঠোক্করে ক্ষত বিক্ষত রক্তাক্ত হবার ভয়। যা হয়েছিলও বেশ কবার। এখন যোগেনদা সামনে পেয়ে গেলেন প্রদীপ দাস নামে এক তরুণ ডাক্তারকে। যার পায়ে হাওয়াই চটি। বললেন তাকে, ঘরে নিশ্চয় অন্য চটি আরো আছে। তবে এটা একে দিয়ে দাও। এবং দিয়ে দিল সে।
নিয়োগীজি সেদিন অনেক রাতে ফিরেছিলেন ক্লান্ত হয়ে। মোর্চার অফিসে আমাকে দেখে হেসে বলেছিলেন–আপনি এসে গেছেন। বিশ্রাম করুন অনেক রাত হয়ে গেছে। কাল কথা হবে।
মোর্চার অফিস ঘরটা বিরাট। দু তিনশো লোক এখানে অনায়াসে ঘুমোতে পারে। সে জন্য যথেষ্ট সতরঞ্চি আছে। অফিস ঘরের সাথে লাগোয়া মোর্চার রান্না ঘর। রোজ সেখানে দু বেলায় চল্লিশ পঞ্চাশ কিলো চাল, দশ বারো কিলো ডাল রান্না হয়। দুর দুরান্ত থেকে আসা মোর্চর কর্মীরা পেট ভরে ডাল ভাত খেয়ে অফিসের মধ্যে ঘুমোয়। সে রাতে আমিও খেয়ে সেখানে ঘুমোলাম।
