একজন চর্ট ধারী যে একটু লম্বা, চোখে চশমা মুখে দাড়ি আছে আমার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের পরিচয় দেয় সে–আমরা সবাই ছত্তিশগড় মুক্তি মোর্চার লোক। একটু আপনার সাথে আলাপ করতে এসেছি।
আমি নিয়োগীজির নাম জানতাম। কাপসী এসে ওনার ঠিকানায় দু খানা পোস্ট কার্ডও ছেড়েছিলাম দেখা করার সুযোগ চেয়ে। সে চিঠির কোন জবাব আসেনি। তবে আমি তখনো জানতাম না যে উনি ছত্তিশগড় মুক্তি মোর্চার প্রাণপুরুষ–প্রতিষ্ঠাতা।
বলি–বসুন। আর আমার কিছু নেই, এই ছেঁড়া মাদুরেই বসতে হবে।
বসে তারা। এর মধ্যে আছে দু জন বাঙালী, যার একজন দল্লী শহীদ হাসপাতালের ডাক্তার শৈবাল জানা। ইনিই কাপসীতে আমার নাম ঠিকানা জেনে নিয়েছিলেন। অন্যজন–!
ইনি চান না তার নাম প্রকাশ হোক। প্রচার বিমুখ এই লোকটি লোকচক্ষুর অন্তরালে–প্রচারের আলো থেকে দুরে বসে নিঃশব্দে কাজ করে যেতে ভালোবাসেন। তাই বাধ্য হয়ে ওনার নাম গোপন করে যাচ্ছি। এনাকে দিচ্ছি আমার অন্য এক পরিচিত প্রিয় মানুষের নাম–যোগেন। ইনি দিল্লীর চিত্তরঞ্জন পার্কের বাসিন্দা। এনার বাবা ছিলেন ভারত সরকারের উচ্চপদস্থ একজন কর্মচারী। মা কোন এক হাসপাতালের সুপারিন্টেন্ডেন্ড।
এই রকম পরিবারের একমাত্র পুত্র যোগেন উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছেন দিল্লীর নামি দামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। বন্ধু বান্ধবও জুটেছে সব সম্পন্ন স্বচ্ছল ঘরের ছেলে মেয়ে। তবে এদের একটা বিশেষ বিশেষত্ব ছিল যে এরা শুধু নিজেদের সুখ সাচ্ছন্দ কেরিয়ার এসব নিয়ে ভাবিত ছিল না। দেশের আপামর জনসাধারণের দারিদ্র বঞ্চনা নিয়েও ভাবনা চিন্তা করতো। এরা চাইতো দেশ থেকে অসাম্য দূর হোক। সব মানুষ পাক খাদ্য বস্তু শিক্ষা বাসস্থান চিকিৎসা এবং কর্মসংস্থানের সম অধিকার। বলা বাহুল্য এরা মানসিক দিক থেকে কিছুটা নকশালপন্থীদের কাছাকাছি ছিল।
যোগেনের বাবা চাইতেন ছেলে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হোক। হাসিল করুক সর্বোচ্চ ডিগ্রি। বিদেশে যাক, নিজের কেরিয়ার গড়ুক। সেই ছেলে “নকশাল পন্থী” হয়ে যাওয়ায় পড়াশোনা মুলতুবী রেখে রাষ্ট্রবিরোধী কাজে লিপ্ত হওয়ায় ক্রোধে দিশেহারা হয়ে যোগেনকে ত্যাজ্য পুত্র করে দেন। বঞ্চিত করেন তাকে তার সম্পদ-সম্পত্তি থেকে। এতে অবশ্য যোগেনের জীবনে কোন পরিবর্তন ঘটে না। সে তার পূর্বের ভূমিকায় রয়ে যায়।
এর পর এক সময় উত্তাল সাত-এর দশকের সমাপ্তি ঘটে। দিকে দিকে জেগে ওঠা বিপ্লবী সম্ভাবনা পিছু হটে। হতাশ যোগেনের বন্ধুরা “আর কিছু হবে না” ভেবে দেশে বিদেশে বড় বড় চাকরি নিয়ে বিয়ে থা করে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। তবে দেশের দরিদ্র মানুষের প্রতি তাদের যে দরদ তা তখনো সবটা মরে যায়নি। তখন সেই সব লোকেরা একত্র হয়ে ঠিক করে যে তারা তাদের বেতনের একটা অংশ দেশের কাজে ব্যয় করবে। এ জন্য সবাই মিলে একটা ফান্ড গঠন করে। এবং এর সব ভার ন্যস্ত হয় যোগেনের উপর। সে চাকরি বাকরি বিয়ে ঘর সংসার কিছুই না করে সন্ন্যাসী তুল্য জীবন কাটাচ্ছে। দেশের প্রায় সব গণ সংগঠন গণ আন্দোলনের সাথে যোগাযোগ রেখে চলে। এই ফান্ডের অর্থ কোথায় কি ভাবে খরচ করা উচিত সেই সিদ্ধান্ত নেবে যোগেন। এ ব্যাপারে সে সম্পূর্ণ স্বাধীন।
তারা উপযুক্ত লোককে বাছাই করে উপযুক্ত দায়িত্ব দিয়েছে এ ব্যাপারে কারো কোনো দ্বিমত নেই। যে দায়িত্ব যোগেন বহু বছর ধরে নিষ্ঠার সাথে পালন করে চলেছে। ভূপাল গ্যাস দুর্ঘটনায় সবার আগে ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে যে ট্রাক সেখানে পৌঁছায় সে ট্রাকে সাওয়ার থাকে যোগেন। নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন, মোংগরা বাঁধে মৎস্যজীবীদের আন্দোলন, যেখানেই আন্দোলন যথাসাধ্য সাহায্য নিয়ে পৌঁছে যায় যোগেন এবং নিঃশব্দে নিজের কাজ সেরে ফিরে আসে। মঞ্চে ওঠে না পত্রিকায় ইন্টারভিউ দেয় না টিভিতে মুখ দেখায়না। সব কিছু থেকে দূরে সরে মানুষের কাজ করে যায়।
দিল্লী থেকে এবার দল্লী এসেছে কিছু ওষুধ পত্র নিয়ে ছত্তিশগড় মুক্তি মোর্চা দ্বারা স্থাপিত শহীদ হাসপাতালকে দেবে বলে। এ সময়ে নির্বাচনী মহাযজ্ঞ চলছে। সেই প্রচার জিপে বসে দল্লী থেকে চলে এসেছে আদিবাসী জেলা বস্তারে। জল জঙ্গল জমিন নিয়ে গড়ে ওঠা এখানকার আদিবাসী আন্দোলন–যা চালাচ্ছে চেতনা মণ্ডল নামে এক সংগঠন–সুযোগ পেলে কাছে গিয়ে সে আন্দোলনও একটু দেখবো।
এই দুজন বাঙালীকে দেখে আমার খুব ভালো লাগল। এদের সঙ্গে রয়েছে দল্লীর লোহা খাদানের শ্রমিক এবং ছত্তিশগড়ের প্রখ্যাত লোকশিল্পী ফাগুরাম যাদব। এক জন ড্রাইভার ও আর একজন মোর্চা কর্মী।
বলেন ডা. জানা–আমরা আপনার বক্তৃতার পুরোটা শুনেছি। যার ফলে মনে হয়েছে আপনি এই এলাকার লোক নয়। এখানে তো এ সবের চর্চা নেই বল্লে চলে। পারাল কোট থেকে প্রচুর রোগী শহীদ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য যায়। তাদের সাথে কথা বলে রাজনৈতিক সচেতনতার কোন প্রমাণ পাইনি।
এবার আমি বিশ্বাস করে আমার পরিচয় এখানে আসার কারণ বর্তমানের অবস্থা সব বলে ফেলি। সাথে এও বলি যে আমি একজন লেখক। আমার একটি কবিতা নকশালপন্থীদের কাগজ অনীক-এ প্রকাশিত হয়েছিল, সেটা দেখাই। ডা. জানা কবিতাটি তার ডায়েরিতে লিখে নেন।
সেদিন প্রায় এক ঘন্টা আমরা কথা বলেছিলাম। যার মধ্যে দিয়ে যে যার রাজনৈতিক ধ্যান ধারণার আদান প্রদান করেছিলাম। সেই রাতেই একখানা জিপ দল্লী ফিরে গিয়েছিল। যে জিপে ডা. জানা ছিলেন। পারাল কোটের নির্বাচনী প্রচার বিষয়ক নানা তথ্যের মাঝে নিয়োগীজিকে তিনি আমার কথা বলেছিলেন। পড়িয়ে ছিলেন আমার সেই কবিতা। বলেছিলেন এই কবিতাটির লেখক আগে রিকশা চালাতে এখন কাঠ বেচে। তখন নাকি নিয়োগীজি বলেছিলেন-একে আমার কাছে নিয়ে আসুন।
