বেশ কিছুক্ষণের নিস্তব্ধতার পর প্রথম যে শব্দ হল তা আমার বাবা তুলে বিশ্রি গালাগালি। যা দিয়েছে এক বিজেপি সমর্থক–শুয়োরের বাচ্চা। কাঠের চোরা কারবারি সেই সমর্থক তারপর আমার দু পায়ের ফাঁকে মাথা গলিয়ে কাঁধের উপর তুলে নেচে নিল এক পাক ধেই ধেই করে। রাস্তার পাশে অবিনাশের মদের দোকানে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল-শালা শুয়োরের বাচ্চা! তুমি এত জানো! আর শালা কাঠ বেচে চোলাই খেয়ে লাইফটা খারাপ করে দিচ্ছো! এর পর অবিনাশের দিকে হুংকার গুরুকে এক পাইট ইংলিশ দাও।
কবিয়াল বিজয় সরকার একবার গান গাইতে গেছেন কোন এক গ্রামে। গান শুনে এক শ্রোতা এমন মুগ্ধ যে সে তা ভাষায় প্রকাশ করে এমন ক্ষমতা নেই। সে তা প্রকাশ করে নিজের ভাষায়–হালার পো হালারে ধইরা গলাটা কাইট্যা আন, দেখি ওয়ার মইধ্যে কি আছে!
একটা মেয়েকে গণেশ খুব ভালোবাসতো। সে একবার বলেছিল তুমি আমাকে আর ভালোবাসো। রাগে গণেশ তার গালে এমন চড় মেরেছিল যে পাঁচ আঙুলের দাগ বসে গিয়েছিল আর বলবি আমি তোকে ভালোবাসি না! ভালোবাসা এ ভাবেও প্রকাশ করা যায়।
ছেলেটার কথায় তাই আমি রাগ করতে পারি না। ওর কাছে যে ভাষা নেই, তাবলে মনের ভালোলাগা প্রকাশ করবে না? বলে সে মালটা খেয়ে বাড়ি চলে যাও গুরু। রাত্রে এসে আবার একখানা ঘাপান দেবে।
একজন গিয়ে ধরাম করে লাথি মেরে আমার কাঠ বোঝাই সাইকেলটা ফেলে দিল।
–আজ থেকে কাঠ ফাঠ বেচা বন্ধ। তোমার সংসার আমরা চালাবো। ভোটের কদিন আর কোন কাজ নেই। মাল খাও আর ঘাপান দাও।
যুবক ছেলেদের একটা দল চলে গেল চাদা তুলতে। ব্লু ফিল্ম দেখানো ভিডিও হলের মালিক দিল বিশ টাকা। অ্যাবর্সন বিশেষজ্ঞ সতীশ ডাক্তার সে দিল বিশ। মদঅলা অবিনাশ দশ। সারের কালোবাজারি করা মিশ্রা দশ। এ ভাবে সারা বাজার ঘুরে তারা আধ ঘন্টায় পৌনে দুশো টাকা জোগাড় করে এনে আমায় দিল মাল খেয়ে বাজার করে বাড়ি যাও।
টাকা পেয়ে বাজার করে বাসায় এসেছিলাম। অনেকদিন পরে পেটভরে মাছভাত খেয়েছিলাম। কিন্তু মদের নেশা যখন কেটে গেল মাথায় চেপে বসলো এক নিদারুণ ভয়। এটা জঙ্গল এলাকা। এখানকার সব আইন জঙ্গলের আইন। পুলিশ এখানকার সর্বময় কর্তা। অসীম ক্ষমতা তার। কেউ পুলিশের উপর কোন কথা বলতে পারে না। পাগলা ষাড়ের মত যাকে ইচ্ছা তাকে গুতিয়ে দিতে পারে। সমস্ত দণ্ডকারণ্য জুড়ে এখন পিপলস ওয়্যার গ্রুপের সমান্তরাল প্রশাসন চলছে। তাদের দমন করার জন্য পুলিশের হাতে প্রচুর ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। বস্তার জেলার পুলিশ প্রশাসন কেন্দ্রীয় কৃষি মন্ত্রী অরবিন্দ নেতামের কথায় ওঠে বসে। কাপসীতে নেতামের সব থেকে বড় চামচা জীতেন ব্যানার্জী। নেতামের প্রিয় বলে থানা ফরেষ্ট ইরিগেশান ব্যাঙ্ক পোস্টাপিস রেশন সপ সবাই তাকে সমীহ করে চলে। সে যদি পুলিশকে খুঁচিয়ে দেয়–এ লোকটা এখানে নতুন এসেছে। একটু খোঁজ খবর নিন তো এর আসল পরিচয় কি! নকশাল ফকশাল নয় তো? তাহলেই আমি গেছি। ব্যাঙ খুঁজতে সাপ বেড়িয়ে পড়বে।
একটি নকশাল ছেলে যাদবপুর থেকে পালিয়ে এক হোটেলে কাজ নিয়ে লুকিয়ে ছিল। হাবা গোবা চেহারা দেখে কেউ তাকে সন্দেহ করেনি। হঠাৎ একদিন কি হল এক কাস্টমারের ফেলে যাওয়া ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার পাতা উল্টে বসল আর পড়ে ফেললো দুদশ লাইন। ব্যাস আর যায় কোথায়। পড়ে গেল এক আই.বি-র নজরে। ধরা পড়ে শেষে জেল।
আমি এখানে এসেছিলাম কোন ঝামেলায় না জড়িয়ে একটু নিশ্চিন্তে থাকবো বলে। মদের খেয়ালে এ আমি কি করে বসলাম, আমার পরিচয় আর যে লুকানো নেই।
সেদিন বিকালে আর কোথাও বের হলাম না। কে জানে কি বিপদ আসছে। যতটুকু সময় হাতে আছে পরিবারের সঙ্গে কাটিয়ে যাই। কে জানে আর দু চার বছরে যদি এ সুযোগ না পাই!
সেদিন রাতে আকাশে কোন চাঁদ ছিল না। চারদিক ঘিরে ছিল ঘনঘোর অন্ধকারে। আমাদের উঠোনে আম জাম নীম আর কাজু বাদাম গাছের পাতার ছায়ায় আরো ঘন আরো নিকষ হয়ে উঠেছিল সেই অন্ধকার। আমি আর আমার স্ত্রী খেজুর পাতার মাদুর বিছিয়ে শুয়েছিলাম উঠোনের সেই ঘন অন্ধকারে। ঘরে ঘুমাবার উপায় নেই। অসহ্য গরম, বাচ্চা দুটো ছিল আমাদের দু জনার মাঝে। সবে একটু চোখটা বুজে এসেছিল। ডিজেল চালিত জিপ গাড়ির ঘড় ঘড় আওয়াজে চোখ খুলে গেল। দেখলাম বাঘের চোখের মত দুটো হেডলাইট জ্বেলে জিপটা পাকা রাস্তা ছেড়ে আমার বাড়ির রাস্তা ধরে এগিয়ে আসছে। বাড়ি চিনিয়ে নিয়ে আসছে এই গ্রামের ছেলে হারাধন।
তবে কি যা ভেবেছিলাম তাই? বিপদ তাহলে এসেই গেল? অনুরও ঘুম ভেঙে গেছে। তার সারা শরীর থিরথির কাঁপছে। ওর হাতটা আমার হাতের মুঠোয় ধরা। স্পর্শের মধ্যে দিয়ে সে কাপুনি আমার মধ্যেও সঞ্চারিত হয়ে যাচ্ছে। আমি ভীষণ ভয় পাচ্ছি। আমাকে ধরে নিয়ে গেলে এরা বাঁচবে কি করে! কে ওদের দেখবে?
আমার বাসা পর্যন্ত জিপ আসবে না। সে থেমেছে একটু দূরে এ গ্রামের “কোচিয়া” জগোর মুদিখানার সামনে। জগো আজ হাট থেকে যে সব ধান ভুট্টা তিল সরষে আদিবাসীদের কাছ থেকে সস্তায় কিনে এনেছ তা এখন মেপে মেপে বস্তায় ভরা হচ্ছে। যা কাল ট্রাক বোঝাই করে বেশি দামে বেচতে রায়পুর পাঠাবে। জগোর বাড়িতে বিদ্যুৎ আছে। সেই আলোয় দেখতে পাই চার পাঁচ জন কাঠখোট্টা লোক যারা ধুলি ধূসর জিপ থেকে নেমে বড় বড় দু তিনখানা টর্চ জ্বেলে আমার বাসার দিকে আসছে। তারা এসে আমার মাদুর ঘিরে দাঁড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে একজন লোককে চিনতে পারি। একটু রোগা কম উচ্চতার চোখে চশমা অনাকর্ষক চেহারার এই লোকটি কাপসীতে আমার সাথে কথা বলেছিল। আমার নাম ধাম জেনে নিয়েছিল। বাঙালী এই লোকটা তবে পুলিশ?
