এ সব ভাবনা-বোধ আমার নয়, আমার পেটের মধ্যে পড়ে থাকা তরল পদার্থের। এবং এটা সত্যি যে এখানকার একশো তেত্রিশটি বাঙালী গ্রামের প্রায় পঁচাত্তর হাজার মানুষের কাছে কেউ কোন দিন বস্তুবাদী দর্শনের কথা বলেনি। এখানকার মানুষ ভূত ভগবান ভাগ্য পরকাল স্বর্গ নরক গুরু গোঁসাই ঝাড় ফুক তাবিজ কবচ আরো শতেক রকম কুসংস্কার অন্ধ বিশ্বাস নিয়ে পড়ে আছে পাঁচশো বছর আগের সেই চৈতন্য মহাপ্রভুর কালে। এদের কাছে রাজনীতি মানে ভোট দেওয়া আর তার বিনিময়ে কিছু নগদ নারায়ণ হাতিয়ে নেওয়া। এর বেশি আর কিছু নয়।
এই অবস্থা-ব্যবস্থা, রামায়ণ মহাভারত ভূত প্রেত রাজা রানীর গল্পের মধ্যে বলতে হবে অন্য এক গল্প। বলতে হবে ব্রহ্মা নয় এই পৃথিবীর সৃষ্টি হয়েছে সুর্যে এক বিস্ফোরণের ফলে, বলতে হবে আজ আমার এই দুরবস্থার জন্য পূর্বজন্ম নয়, এক দল মানুষই দায়ী। বলতে হবে কোন গুরু গোঁসাই নয়, এ অবস্থা পরিবর্তন করতে পারি আমি এক আপোসহীন সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে।
আমার খালি গা খালি পা স্রেফ কোমরে জড়ানো একটা গামছা-মাথার চুল রুক্ষ গায়ের রঙ কালো যা রোদে পুড়ে আরো কালো দেখাচ্ছে। এমন আদিবাসী মার্কা চেহারার লোক এখানে বক্তৃতা করে না, বক্তৃতা শোনে আর হাততালি দেয়। আমার হাতে লাউড স্পিকার দেখে কৌতূহলে বাজারের ভিড় থমকে গেল আমার চারপাশে। আমি শুরু করলাম আমার জীবনের সেই প্রথম বক্তৃতা। যার প্রেরণা কেন্দ্রে অবশ্যই ছিল মদ।
শুরু করলাম বহু দুর কয়েক কোটি বছর আগের সেই মহা বিস্ফোরণ কাল থেকে। বন্ধুগণ, কোন গড় আল্লা ভগবান নয়, এই পৃথিবীর সৃষ্টি হয়েছে সূর্য থেকে। সূর্য হচ্ছে এক অনির্বাণ আগুনের গোলা। পৃথিবী তার অংশ। আমরা সেই পৃথিবীর সন্তান। আমাদের মধ্যেও সুপ্তাকারে আছে সেই আগুন, যা সব অন্যায় অত্যাচারকে দহন করে দিতে পারে। সেই আগুনকে জাগাতে হবে। তার দীপ্তি আর দহনেলিসাদের আগাছার মতো জ্বালিয়ে দিতে হবে…..।
সূর্য গ্রহে বিস্ফোরণ। পৃথিবীর সৃষ্টি। প্রাণের উদ্ভব। বিবর্তন বাদ। আদিম সাম্যবাদী সমাজ। গোষ্ঠি সমাজ। দাস প্রথা। সামন্ততন্ত্র। ধর্ম গুরুদের ভূমিকা। রাজতন্ত্র। সামন্ততন্ত্রের শক্তিক্ষয় এবং পূজির বিকাশ। শ্রমিক শ্রেণির জন্ম। আট ঘন্টার লড়াই। লাল ঝাণ্ডার ঐতিহাসিক গুরুত্ব। মার্কসের দাস ক্যাপিটাল। প্যারি কমিউন। সোভিয়েত সমাজতন্ত্র। আন্তর্জাতিক ক্যুনিস্ট পার্টি। মানবেন্দ্র নাথ, রজনী পাম দত্ত। সিপিআই। ভারত চিন যুদ্ধ। সিপিএম। নকশাল আন্দোলন। জরুরি অবস্থা। জনতা দল। ভিন্দ্রেনওয়ালা। স্বর্ণমন্দির।ইন্দিরা হত্যা।রাজীব। বোফর্স। আজকের জোট এবং ভোট।
এতদিন ধরে কমিউনিস্ট কর্মীদের কাছে যা শুনেছি যা শিখেছি সব বলে গেলাম যাত্রা দলের অভিনেতার মতো কখনো গলা খাঁদে নামিয়ে, কখনো চড়া সুরে। তখন আমি যেন লেনিন’ যাত্রা পালার শান্তিগোপাল।
এ গল্প শেষ করে ধরলাম জনসংঘের গল্প। নাম বদলে যে দল এখন ভারতীয় জনতা পার্টি। এর জন্য যেতে হল চার সাড়ে চার হাজার বছর পুরানো ঋক বেদে। বেদের সেই দশম মণ্ডলের পুরুষ সুক্তের বর্ণবাদ সমর্থনকারী শ্লোক যা জার্মানি দেশের কিছু পণ্ডিতের খুব প্রিয় হওয়ায় তারা বেদকে নিজেদের ভাষায় অনুবাদ করে। পরবর্তী কালে যে বেদ নাৎসিবাদের প্রেরণা যোগায়। নাৎসিবাদ এলে এলো হিটলার। আর্য রক্তের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে অনার্য হিংসা। ইহুদি নিধন। বিশ্ব যুদ্ধ। অক্ষশক্তি মিত্র শক্তি। সোভিয়েত সমাজবাদের উপর আক্রমণ। হিটলারের পরাজয়। নাৎসি বাদের “ভুল থেকে শিক্ষা”নিয়ে শুরু গোলওবাকরের রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ গঠন।ব্রাহ্মণ্যবাদ পুনুরুথানে তথা আর্য প্রাধান্য বিস্তারে নব নাৎসিবাদী প্রয়াস। জনসংঘ, শ্যামাপ্রসাদ এবং সর্বশেষে বিজেপির উত্থান।
বিজেপির কথা শেষ করে এবার কংগ্রেস। কংগ্রেসের ইতিহাসে আসবার জন্য যেতে হল ১৭৫৭ সালের পলাশীতে। পলাশীর যুদ্ধ, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর শাসন, সিপাহিবিদ্রোহ আদিবাসী সহ ছোট বড় অসংখ্য বিদ্রোহ। যার ফলশ্রুতিতে দেশীয় মানুষদের অভাব অভিযোগ জানাবার জন্য এক ইংরেজ এইচ কে হিউম দ্বারা কংগ্রেস দলের গঠন। দক্ষিণ আফ্রিকার আন্দোলন এবং মহাত্মা গান্ধীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন। কংগ্রেসের সর্বময় কর্তৃত্ব। ত্রিপুরি কংগ্রেস, গান্ধী এবং সুভাষ। সুভাষ বোসের দেশত্যাগ। বিশ্বযুদ্ধ। দেশ ভাগ ও ক্ষমতা হস্তান্তর। নেহেরু পরিবারের পরিবার তন্ত্র। জরুরি অবস্থা। নকশাল নিধন এবং বর্তমান সময়।
মনে হয় একনাগাড়ে দুআড়াই ঘন্টা কথা বলেছিলাম আমি। ঘেমে সারা শরীর ভিজে গিয়েছিল আমার, মুখে উঠে গিয়েছিল ফেনা। কপালের শিরাগুলো দপ দপ করে লাফাচ্ছিল। বক্তৃতা শেষ করেছিলাম এই বলে আপনারা বুদ্ধিমান মানুষ। আশা করি এরপর আমাকে বলে দিতে হবে না কোন দলকে ভোট দেবেন। কে আপনাদের স্বার্থ দেখবে। মনে রাখবেন, আজ যদি ভুল করেন সে ভুলের খেসারত আপনাকেই দিতে হবে। তাই চিন্তা ভাবনা করে ভোট দেবেন এই আমার বলার।
যখন আমি বক্তৃতা শেষ করলাম, দেখলাম সাপ্তাহিক বাজারের সেই মহাভিড় আমার সামনে পেছনে ডান দিকে বাঁ দিকে কেমন যেন জাদুকাঠির ছোঁয়ায় সমাধিস্থ হয়ে গেছে। কোথাও কোন কোলাহল নেই, সব নিগ্রুপ। আমার বক্তৃতা শুরু হবার মিনিট পনেরোর মধ্যে দাঁতের মাজন, দাদের মলম, সুন্দরী বিড়ি কোম্পানী সবার সব মাইক পাবলিক বন্ধ করে দিয়েছিল। বিজেপির মাইক তারা বন্ধ করে ছিল নিজেরাই। কারণ তাদের দলের যে জন্ম ইতিহাস তাদের অজানা তা জেনে নেবার আগ্রহ ছিল কংগ্রেসমাইক বন্ধ করেছিলরেল আমি কি খিস্তি দেবো সেটা শুনে তাদেরও তো নতুন কোন খিস্তির জন্ম দিতে হবে। সিপিএম-এর মাইক সে তো আমার দখলে। আর মুক্তিমোর্চা বন্ধ করে ছিল কারণ তাদের নেতা তাদের শিখিয়েছে কাউকে বিরক্ত কোরো না। যার যা ভাষ্য আছে বলতে দাও।
