ওই তিনটে দল লোকাল দল। এখানে এবারের নির্বাচনে নতুন এসেছে ছত্তিশগড় মুক্তি মোর্চা। এদের সব কর্মকর্তা দল্লীর। এখানে এখনো এরা সঙ্গে কোন লোকাল লোক পায়নি। কাপসী পাখানজুর আর বান্দে তিন জায়গায় তিনটে ঘর ভাড়া নিয়ে নির্বাচনী প্রচার অফিস খুলেছে। চার দলেরই প্রচার এখন তুঙ্গে। সিপিএম-বিজেপি যদিও একই প্রার্থীর পক্ষে প্রচারে নেমেছে কিন্তু তাদের প্রচার অফিস আলাদা আলাদা। তাদের দুটো কংগ্রেস আর মুক্তি মোর্চার দুটো, কাপসী বাজারে এই চারটে অফিস বলতে গেলে মুখোমুখি।
সেদিন আমি আমার কাঠের বোঝা নিয়ে দুপুর বেলায় কাপসী বাজারে এসেছি। আজ আমি গিয়েছিলাম খ্যারকাটা জঙ্গলে। এ জঙ্গল ১৩০-এর মত ভয়ংকর নয়। পথও অতি সরল। কাপসী থেকে খ্যারকাটা যদিও দশ কিলোমিটার তবে মজাটা এই, যা কিছু চড়াই সে যাবার বেলা পড়ে। ফেরবার সময় পথ একেবারে ঢালু। ফলে কাঠ নিয়ে আসতে খুব একটা কষ্ট হয় না।
আজ রবিবার।কাপসীর হাটবারের দিন। প্রায় গোটা কুড়ি বাঙালী আর গোটা পঁচিশ আদিবাসী গ্রামের মানুষ এদিন আসে কিছু বেচতে কিছু কিনতে। এর উপর আছে বাইরে থেকে আসা ফড়ে দালাল ব্যাপারী ব্যবসায়ীর দল। সব মিলিয়ে কয়েকহাজার লোকের সমাগমে থিক থিক করে হাটবার। আমাকে হাটের মধ্যে থেকে পথ করে পৌঁছাতে হবে বাজারের পূর্ব প্রান্তে নদীর কিনারে গোপালের হোটেলে। এসে দেখি হাটের মধ্যে সাইকেলে মাইক বেঁধে ঘুরে ঘুরে সিপিএম পার্টির প্রচার চলছে। লাউড স্পিকার হাতে তখন কোন এক সিপিএম নেতা হরিদাস মালাকারের ভাই মধু মালাকার বক্তৃতা দিচ্ছে বন্ধুগণ কোনদিন যা হয়নি এবার তা ভগবানের দয়ায় হয়ে গেছে। সব দল আমরা এক হয়ে গেছি। এবার আমরা ঠিক ভগবানের দয়ায় কংগ্রেসকে হারিয়ে দেবো।
বক্তৃতা নয়, আমার তখন মনে হচ্ছে মানুষের সামনে একটা বেড়াল মিউ মিউ করছে। নাকে কাঁদছে। নামটা যখন কমিউনিস্ট সেই পার্টির কর্মীর গলায় এমন ম্যাড়মেড়ে আওয়াজ কেন! যে আগুন যে তেজ যে আশা স্বপ্ন দ্রোহ মানুষকে উজ্জীবিত করে তা কোথায় এই কাঁদুনে ভাষায়। শব্দের পরে শব্দ সাজিয়ে যে শব্দভেদী বাণ, যা ছুঁড়ে মানুষকে মাতিয়ে দেওয়া যায়, মধু মালাকারের শব্দ ভান্ডারে সেশব্দ কই! সিপিএম বলেনয়, লাল পতাকাবাহী একটা দল যে পতাকা দণ্ডকারণ্যের আগুনখোর দল পিপলস ওয়্যার গ্রুপের সদস্যরা বহন করে শাসক শ্রেণির রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে, তা নিয়ে দাঁড়িয়ে মধু মালাকারের নাকে কাদায় মনে বড় কষ্ট পাই আমি।
আমার সঙ্গে সিপিএম-এর যে বিরোধ সে আমি পরে বুঝে নেব। এখন লাল পতাকার সম্মান রক্ষার প্রশ্ন। লাল পতাকার লাল আগুন কাপসীবাসীর মনে ছড়িয়ে দেবার প্রশ্ন। এবং মরিচঝাঁপির দুষ্কৃতকারীদের হাত থেকে ওই পতাকা কেড়ে নিয়ে সঠিক মানুষের হাতে ধরিয়ে দেবারও প্রশ্ন। কেউ আমাকে নিয়োগ করেনি, যেন আজ এই বনরাজ্যে সেই ঐতিহাসিক দায়িত্বের গুরুভার আমার কাঁধে ন্যস্ত হয়েছে।
এ সব কি তখন আমি ভেবেছিলাম? না, আমার পেটের মধ্যে টগবগ করে ফোঁটা মহুয়ার মদ তখন আমাকে দিয়ে এসব ভাবাচ্ছিল। আগেই বলেছি মদ এমন একটা জিনিস যে ভীতুকে করে সাহসী আর সাহসীকে দুঃসাহসী। বোকাকে করে বাঁচাল আর বাঁচালকে মহা বাঁচাল। তা না হলে যে আমি জীবনে কোনদিন পাঁচজনের সামনে কথা বলার সাহস করিনি, পাছে লোকে কি না কি ভাবে। সেই আমি মধু মালাকারের হাত থেকে লাউড স্পিকার কি করে কেড়ে নিলাম।
–এই যে দাদা, অনেক বলেছেন এই বার আমাকে দিন।
সঙ্গে থাকা সিপিএম-এর কর্মীরাও মধু মালাকারের ভাষণে ঠিক সন্তুষ্ট হতে পারছিল না। তাদের অসন্তুষ্টির কারণ অবশ্য অন্য। এখানকার রোদ চড়া, মাটি কঠোর তাই ভাষাও কিছু কঠোরতা দাবি করে। এখানকার যে কোন রাজনৈতিক বক্তৃতা শুরু হয় প্রতিপক্ষের মাকে গালাগালি দিয়ে। শেষও হয় ওই ভাবে। যত গালাগালি তত হাততালি। যে বক্তা মা নামের শব্দটাকে যত বার ধর্ষণ করতে পারে সে তত ভাল বক্তা। মধু মালাকার তার লম্বা বক্তৃতায় একবারও ‘মাদার চোত’ বলেনি। এমন বক্তৃতায় মানুষের মন ভরবে কেন?
আমি কাঠ বিক্রি করি অর্থাৎ সমাজের চোখে এক নিকৃষ্ট জীব। খেয়ে রয়েছি মদ। যা মানুষকে ভালো কথার চেয়ে মন্দ বলায় বেশি। আমাকে দেখে সবার উৎসাহ বেড়ে যায়। মধু মালাকার আমার হাত থেকে লাউড স্পিকার নিয়ে নিতে গেলে সবাই তাকে থামায় থাক থাক, ওকে বলতে দাও। একজন আমাকে বক্তৃতার সুরটা ধরিয়ে দেয় দাও ভাই, কষে চার গাছা গাল দাও তো। তাকে বলি, গালাগালি আমি দেবো না। তবে যা দেবো সে গালাগালির বাবা। বলা বাহুল্য মাইক বাহিত সে শব্দ পাশের কংগ্রেস কার্যালয়েও পৌঁছায়। তারা কান উৎকর্ণ করে। গালাগালির বাবা! সে বস্তুটা কি!
আমি তখন আত্মবিশ্বাসে টগবগ করে ফুটছি। মদই আমাকে ফোঁটাচ্ছে। তখন আমাকে মনে হচ্ছে আমার চারপাশের এই যে মানুষ এরা সব শিশু নাবালক অর্বাচীন। আমি সেই প্রাজ্ঞ ঋষি। যার কাছে এরা আজ প্রথম পাঠ নিতে এসেছে। এরা কেউ কিছু জানে না কেউ কিছু এখনো শিখতে পারেনি। সব অজ্ঞ সব মূর্খ। আজ আমি প্রেরিত পুরুষের মতো ওদের শুন্য পাত্রে পরিবেশন করবো জ্ঞান বৃক্ষের স্বাদু ফল। যা খেলে মানুষ চির অন্ধকার থেকে আলোর দিকে, অজ্ঞানতা থেকে জ্ঞান মার্গের দিকে, মৃত্যু থেকে মহা মহাজীবনের দিকে অগ্রসর হয়। আমি মহা গুরু। আমি আজ এদের এমন কিছু নতুন কথা শেখাবো যা এর আগে কোনদিন শোনেনি। আমার আগে এদের কাছে কেউ বলেনি।
