এই রকম ভয়ংকর দিনে নির্বান্ধব নিঃসহায় বস্তার জেলায় বাস করার সময়ে যে মানুষটার কথা আমার সব চেয়ে বেশি মনে পড়ত তিনি শংকর গুহ নিয়োগী। আমার মন বলছিল যদি একবার তার সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারি আর আমি আমার পরিচয়–যা অর্জন করেছি অনেক রক্ত ঝরিয়ে অনেক অধ্যবসায় আর কষ্ট স্বীকারের মধ্য দিয়ে, তা প্রকাশ করতে পারি, ওনার সাহায্য থেকে বঞ্চিত হবে না।
আমি অতি ক্ষুদ্র মানুষ। এমন কি বড় জিনিস চাই আমার? চাই এমন একটা ছোট খাটো কাজ যা করে চারটে প্রাণী দু বেলা খেয়ে পড়ে বাঁচতে পারি। চাই একটা জনমঙ্গল কাজের সঙ্গে যুক্ত হবার মানসিক সুখ। কিন্তু তখন যে আমি দল্লী যাব ওনার সঙ্গে দেখা করতে, আমার কাছে সেই বাস ভাড়া, পথ খরচটুকু ছিল না। তখন আমি দুসাইকেল কাঠ বিক্রি করে যে কুড়ি টাকা পাই তার দশ টাকা চলে যায় চাল ডালে। বাকি দশ টাকার পাঁচ টাকা চলে যায় সাইকেল ভাড়ায়। বাকি যে পাঁচ টাকা থাকে তা দিয়ে মহুয়ার মদগিলি। তখন আমার নিজেকে মনে হতো জীবন যুদ্ধে পরাজিত ব্যর্থ এক ফুরিয়ে যাওয়া মানুষ। পৃথিবী আমাকে পরিত্যাগ করেছে। তার কাছে আর আমার কানাকড়ি মূল্য নেই।
এক সময় আমি লিখতাম। তখন সমাজের কতো সম্মানীয় মানুষের কত সমীহ পেয়েছি। সব হারিয়ে আমি এখন বস্তার জেলার এক কাঠ অলা। যার সম্মান কলকাতার রাস্তায় কাগজ কুড়ানো লোকের সমান। এ জীবনের কি দাম! কি দরকার? তাই মনের কষ্টে মদ গিলি। মানুষের সামনে থেকে মুখ লুকিয়ে জঙ্গলে গিয়ে একা একা বসে থাকি। যখন কাঠ নিয়ে কাপসী আসি মনে হয় মানুষ আমাকে দেখে হাসছে, উপহাস করছে। তাই তাদের কাছ থেকে যত দ্রুত সম্ভব দূরে পালাই। মানুষ এখন আর আমার ভালো লাগে না। ভালো লাগে নির্জনতা। জঙ্গল। বড় কাপসী বলে একটা জায়গা আছে। যেখানে দুদিক থেকে দুটো নদী গিয়ে একটা ত্রিভুজ তৈরি করেছে। সেখানে যেমন কিছু ফাঁকা জায়গা আছে, আছে ঘন জঙ্গল। আমি এখানে একটা কুড়ে ঘর বানিয়েছি জঙ্গলের বাঁশ বল্লি দিয়ে। যাতে ছাউনি দিয়েছি হেতাল পাতা দিয়ে। দু বার কাপসীতে কাঠ নিয়ে যাওয়া ছাড়া সারা দিন আমি এখানে পড়ে থাকি। অনু দুপুরবেলা আমাকে ভাত জল দিয়ে যায়।
সেটা ১৯৮৯ সাল। যেবার অর্জুন সিং রাজীব গান্ধির উপর রাগ করে কংগ্রেস ছেড়ে বের হয়ে এসে কংগ্রেস দলের ভরা তরী ডোবাবার বাসনায় সব বিরোধী দলগুলোকে একত্র করে জনতা দল নামে একটা প্ল্যাটফর্ম দাঁড় করিয়ে ভোটে নেমে ছিল। চির শত্রু সিপিএম এবং বিজেপিও জড়ো হয়ে ছিল সেই ছাতার তলায় এবং বোফর্স ইস্যু সামনে রেখে ভোট যুদ্ধে নেমেছিল।
আমি তখন অন্ধ হয়ে গেছি। এখানে কোন বাংলা সংবাদপত্র নেই। যা আছে সব হিন্দি। আমি তো তখন হিন্দি পড়তে পারতাম না। পরে অবশ্য বাংলা ভাষার মত নিজের চেষ্টায় হিন্দিও শিখে নিয়েছিলাম। যার ফলে অমৃত সন্দেশ পত্রিকার রিপোর্টারও হয়েছিলাম। সে অনেক পরের ব্যাপার। এখন আমি যা কিছু খবর পাই লোকের মুখে, কিছু পাই রেডিওতে। জানতে পারি আসন্ন নির্বাচনের সারা দেশে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে একের বিরুদ্ধে এক প্রার্থী দিয়ে জনতা দল ভোট যুদ্ধে নামছে।
আমরা যে লোকসভার অন্তর্গত তার নাম কাঁকের লোকসভা। স্বাধীনতার পর থেকে এই লোক সভায় কংগ্রেস জিতে আসছে। এক মাত্র নারানপুর বিধান সভা বাদে বাকি সবকটা বিধান সভার সিট কংগ্রেসের কবজায়। এবার এখানে জনতা দলের প্রার্থী লম্বোদর বলিহার। ছত্তিশগড় মুক্তি মোর্চা-যাদের দল্লীতে বিশাল শ্রমিক সংগঠন, গতবার যাদের প্রার্থী জনকলাল ঠাকুর ডোন্ডি লোহরা বিধানসভা সিটে জয়ী হয়েছিল তারা দাবি করেছিল এই সিটটা তাদের ছেড়ে দেওয়া হোক। বিনিময়ে তারা ছত্তিশগড়ের সব সিটে জনতা দলকে সমর্থন দেবে। কিন্তু জনতা দল রাজি হয়নি। ফলে ছত্তিশগড় মুক্তি মোর্চাও এখানে একজন প্রার্থী দিয়েছে যে ওই জনক লাল ঠাকুর। আর কংগ্রেসের রয়েছে বরাবরের জেতা প্রার্থী অরবিন্দ নেতাম।
কাপসী বান্দে পাখান জুর বাঙালী অধ্যুষিত এই পারাল কোটের কিছু ঠিকাদার, বড় ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, জঙ্গলের কাঠ চোর কিছু দুবৃত্ত গোছের লোক, এরা আছে কংগ্রেসের সাথে। এবং সেই সাথে এটাও সত্য যে-সরল সোজা আদিবাসী সমাজ তারাও কংগ্রেসকে ভোট দেয়। বাদবাকি সব সাধারন বাঙালী যারা দেশভাগের জন্য কংগ্রেসকে দায়ী মনে করে, সব আছে বিজেপির সঙ্গে। সিপিএম-এর সঙ্গে এখানে কোন লোক নেই। দণ্ডকারণ্য বাসী বাঙালীদের মনে মরিচঝাঁপির দাগ তখনো বড় দগদগে। সেই হত্যা ধর্ষণ লুটপাট অগ্নি সংযোগ তারা ভুলতে পারেনি এখনো। যারা কংগ্রেস বা বিজেপিতে কল্কে পায়নি এমন আট দশ জন এখানে সিপিএম করে “নেতা গিরি” চালায়। সম্প্রতি বাংলা থেকে পালিয়ে আসা মধু মালাকার নামে একজন এদের সঙ্গে এসে ভেড়ায় এদের শক্তিবৃদ্ধি ঘটেছে। লোক সংখ্যায় যদিও কম, এরা গলাবাজিতে সবার আগে। হুজ্জতি করার সুযোগ পেলে আর ছাড়ে না।
এখানকার সব সরকারি কর্মচারী ঘুষখোর দুর্নীতিগ্রস্থ। এদের দুহাতে উপার্জন। এরা বাঁ হাতের কামাই থেকে কিছু ভাগ রাজনৈতিক দলগুলোকে চাঁদা হিসেবে দিয়ে থাকে। এ ভাবে হাতে রাখে আর কি। এখন সিপিএমও একটা ছোট ভাগ পাচ্ছে।
