মিনিট দুয়েক পা ধরে বসে পড়েছিলাম। তখন যে কি করবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। শেষে বুঝতে পারলাম আর কিছু সময় পরে পা খানা পুরোপুরি অক্ষম হয়ে যাবে। তার আগে এই জনহীন জঙ্গল থেকে কোন ভাবে বের হয়ে ১৩০ পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে। যেখানে কাউকে সাহায্যকারী পাওয়া গেলেও যেতে পারে। এখানে তেমন কোন সম্ভাবনা নেই। তাই দ্রুত কাঠ সাজাতে আরম্ভ করি সাইকেলে। কাঠ ফেলে যাওয়া চলবে না। যদি তা করি সকাল থেকে এতক্ষণের পরিশ্রম সবটা জলে চলে যাবে। ঘরে বউ বাচ্চা সব না খেয়ে মরবে। সাইকেল ভাড়ার টাকা চেপে যাবে ঘাড়ে। তাই যত কষ্টই হোক কাঠ নিয়ে যেতেই হবে। তাহলে অন্তত আজকের দিনটা ভাত জল খেয়ে সবাই বাঁচব। কাল নিশ্চয় পা ফুলে যাবে। তখন যা হয় হবে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমার প্রিয় কবি নয়। আমি একজন শ্রমজীবী শোষিত মানুষ। যদিও আমি তার সব লেখা পড়িনি তবু যেটুকু পড়েছি তাতে এই শোষণবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হবার কোন উপাদান তাতে খুঁজে পাইনি। দুই বিঘা জমি যার মধ্যে কবিতা কম ছোট গল্পের ভাগ বেশি। সবাই বলে এটা এক মহান সৃষ্টি। আমার কিন্তু রাগ হয় কবি উপেনকে সর্বস্বান্ত করে সাধু বানিয়ে দু বিঘার পরিবর্তে নিখিল বিশ্ব ধরার আনন্দে ঘরের বাইরে পাঠিয়ে দিলেন বলে। আমার শ্রেণি ঘৃণা আমাকে বলে উপেনেরুত্ৰকটা রাম দা নিয়ে বাবুর মুখোমুখি হওয়া উচিত ছিল। আমার সেই অপ্রিয় কবির কবিতার একটা লাইন এখন আমাকে শক্তি জোগায়–তবু বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর, এখনই অন্ধ বন্ধ কোরো না পাখা। কাঠ সাজিয়ে জঙ্গলের মধ্যের এবরো খেবরে পাথুরে পথ ঠেলে কোনক্রমে সাইকেল নিয়ে পৌঁছলাম পাকা রাস্তায়। এবার সাইকেলে চড়তে হবে। কিন্তু সাইকেলের পিছনে বাঁধা কাঠের অনেক ওজোন। কিছুতেই ব্যালেন্স রেখে সিটে উঠতে পারি না। প্যাডেলে পা দিয়ে উঠতে গেলে টাল খেয়ে পড়ে যাবার ভয়।
অবশেষে সাইকেল নিয়ে এসে রাস্তার পাশে একটা গাছের গায়ে দাঁড় করিয়ে দিয়ে নিয়ে এলাম একটা বড় পাথর। সেই পাথরে পা দিয়ে উঠে বসলাম সিটের উপর। কিন্তু যেই না প্যাডেলে চাপ দিয়ে সাইকেল সামনে আগাবার চেষ্টা করেছি টাল খেয়ে কাঠ সহ সাইকেল নিয়ে উল্টে পড়ে গেলাম। আমার এখন এত ক্ষমতা নেই যে সাইকেল সোজা করি।
তাহলে এখন উপায়? উপায় একটাই, খুলে ফেললাম কাঠ বাঁধা টিউব। কাঠ সরিয়ে সোজা করে দাঁড় করালাম সাইকেল। এখন আমার পায়ের যন্ত্রণা মাথায় উঠে গেছে। কপালের দু পাশের শিরা দপ দপ করছে। বুকের মধ্যে যেন একটা শুকনো সমুদ্র কাতর প্রার্থনা জানাচ্ছে–জল একটু জল। মন দুর্বল হয়ে যাচ্ছে আমার। পিরবো না বোধ হয় আমিহেরেই যাবো। তখনই মনে পড়ল সমরেশ বসুর সেই পাড়ি গল্পটা। সিনেমায় সেখানে এক আনা মাথা পিছু মজুরিতে শুয়োরকে নদী পার করাচ্ছেনাসিরুদ্দিন শাহ আর তার গর্ভবতী স্ত্রী শাবানা আজমি। সাঁতারে ক্লান্ত, নদীর নাব্যতা দেখে ভীত শাবানা যখন বলছে–আমি নদী পার হতে পারব না, তখন নাসিরুদ্দিন বলছেপার হতেই হবে। কারণ ও পাড়েই আছে জীবন। নদী না পার হতে পারলে পয়সা পাবে না, তখন না খেয়ে মরে যাবে।
আমিও তখন বুঝে যাই কাঠ আমাকে নিয়ে যেতেই হবে। এর কোন বিকল্পই নেই।
আবার একখানা একখানা করে কাঠগুলো সাইকেলের পিছনে সাজাই। টিউব দিয়ে বাধি আবার। পাথরে পা দিয়ে উঠি সিটে। শক্ত করে হ্যান্ডেল চেপে ধরে প্যাডেলে চাপ দিই। এবার আর আছাড় খাই না। সাইকেল সামনে গড়ায়। মিনিট পনেরোর মধ্যে পৌঁছে যাই ১৩০ নাম্বার ভিলেজের সামনে। পাকা রাস্তা ছেড়েবাঁদিকের কাঁচা রাস্তায় মিনিট দুয়েক গেলে রিফিউজি মানুষদের ঘর বাড়ি। এখানে এসে চেপে রাখা পিপাসাটা প্রবল হয়ে ওঠে। কিন্তু ভয় করছে। বাঁদিকের বালি রাস্তায় বাঁক নিতে গেলে আবার যদি পড়ে যাই। পাকা রাস্তায় সাইকেল রেখে গিয়ে জল খেয়ে ফিরে এসে আর যদি উঠতে না পারি সিটে। সেই ভয়ে আর নামা হয় না। জলের আশা ছেড়ে এগিয়ে চলি সামনে। সামনে এখনো অনেকটা পথ।
আরো পনেরো কুড়ি মিনিট পড়ে পৌঁছাই সেই প্রাণ পাখি উড়ে যাওয়া খাড়া পাহাড়ের সামনে। সেখানে না নেমে কোন উপায় নেই। উল্টে যেতে যেতে কোনো মতে নামলাম সাইকেল থেকে। এবার যে পাহাড়ে খালি সাইকেল ঠেলে তুলতে বুকে হাঁপ ধরে যায়, আমাকে ষাট সত্তর কিলো কাঠ বোঝাই সাইকেল তুলতে হবে। তুলতেই হবে। কারণ পাহাড়ের ও পাড়েই আছে জীবন। এখন এর কোন বিকল্প আর নেই।
কোথা থেকে সেদিন কি এক শক্তি কী ভীষণ মনোবল এল আমার তা আমি জানি না। এর পিছনে কি সেই দাড়িআলা বুড়ো কবি না পাড়ি গল্পের লেখকের অবদান ছিল তা আমার অজানা। অকেজো এক পা, পেটে দুর্ভিক্ষের খিদে, মাথার উপর জুন মাসের রাগী সূর্য, পায়ের নিচে রুটি সেকাঁচাটুর মতো গরম পিচ পথ, পিচগুলো এখন গরমে বুজবুজ করে ফুটছে যার উপর সাইকেলের চাকা পড়লে কামড়ে ধরে চাকা গড়াতে দেয় না, এই সব রকম অসহযোগী সময়ে এক যুদ্ধ জয়ের আশায় এগিয়ে চললাম রণক্ষেত্রের দিকে। জীবন এক যাত্রা, জীবন এক যুদ্ধ। জীবন মরণকে প্রতিহত করে বেঁচে থাকার আর এক নাম।
প্রতি পাঁচ ফুট সাইকেল ঠেলে উপরে তুলতে মনে হচ্ছে বুক বুঝি ফেটে চৌচির হয়ে যাবে। পাঁচ ফুট এগিয়ে যেই একটু দম নিতে যাই সাইকেল গড়িয়ে দু তিন ফুট পিছনে চলে যায়। এই ভাবে কিছুটা এগিয়ে কিছুটা পিছিয়ে শেষ পর্যন্ত সাফল্য এল। নিচে থেকে পথের সব চেয়ে উঁচুতে পৌঁছতে মনে হয় এক থেকে দেড় ঘন্টা সময় লেগে গেল। তখন ঘড়ির কাটা মনে হয় একটার কাটা পার করে গেছে। পাহাড়ের উপর পৌঁছে মনে হল জীবন ফিরে পেলাম। খানিকক্ষণ জিরিয়ে নিয়ে আবার উঠে পড়লাম সাইকেলের সিটে, এবার প্যাডেলে পা দিয়েই উঠতে পারলাম। এখন আমি ভারী সাইকেলের ব্যালেন্স বুঝে গেছি। এবার আর কোন পরিশ্রমের ব্যাপার ছিল না সাইকেলের হ্যান্ডেল ধরে বসে থাকা ছাড়া। আপনা আপনি সাইকেল গড়িয়ে চলল প্রায় দেড় মাইল। বিনা কষ্টে পৌঁছে গেলাম গোপালের হোটেলে। ওরা আমার বিধ্বস্ত চেহারা দেখে ঘটে যাওয়া বিপর্যয় শুনে নিজেরাই হাতে হাতে কাঠ নামিয়ে নিল। আর দিল দশটা টাকা। দশ টাকা। আমাদের চার জনার একদিন বেঁচে থাকার অবলম্বন।
