যেদিন থেকে কাপসী বাজারের পত্তন–সে প্রায় তিরিশ পঁয়ত্রিশ বছর, সেদিন থেকে হোটেল-চা দোকান চলছে। তা ছাড়া আশে পাশের দশ বিশটা গ্রামও আছে। সবারই জ্বালানি কাঠ লাগে। ফলে নিকটস্থ কোন জঙ্গলে শুকনো কাঠ পাওয়া খুব কঠিন। আমায় যেতে হবে কম পক্ষে দশ বারো মাইল দূরে। ১৩০ নাম্বার ভিলেজ পিছনে ফেলে আরো তিন চার মাইল আগের ঘন গভীর জঙ্গলে। যেখানে ভাল্লুক আমাকে আক্রমণ করতে পারে। বস্তার জেলার কুসংস্কার আচ্ছন্ন গোণ্ড আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষরা আমাকে তাদের নররক্ত প্রিয় দেবতা আঙ্গা দেবকে তুষ্ট করার জন্য ধরে নিয়ে গিয়ে বলি দিয়ে দিতে পারে। একটা সময় পৃথিবীর সব দেশেই নরবলির প্রথা ছিল। ছিল আমাদের এই ভারতবর্ষের প্রায় সর্বত্র। আমাদের ধর্ম পুস্তক যজুর্বেদ যার আর একনাম বাজনেয়ি সংহিতা এবং ঐতরেয় ব্রাহ্মণ গ্রন্থেও নরবলির উল্লেখ আছে।কালিকা পুরানম্-য়ে নরবলির সমর্থনে শ্লোক লেখা হয়েছে–
“নরেন বলিনা দেবী তৃপ্তিং সহস্র বৎসরাপি।
বিধিদত্তেন চাপপ্লাতি তৃপ্তিং লক্ষং ত্রিভির্নরে।”
অর্থাৎ বিধি অনুসারে যদি একটি নরকে বলিদান দেওয়া হয়, দেবী এক হাজার বছর, আর তিনটি নরবলি দানে এক লক্ষ বৎসর তৃপ্ত হয়ে থাকেন।
খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, চৈতন্য মহাপ্রভুর আবির্ভাবের সম সাময়িক কালেও বঙ্গদেশে যে ব্যাপক নরবলির প্রচলন ছিল, বহু পুঁথি পুস্তকে তার প্রমাণ পাওয়া যায়।
শোনা যায় এদেশে ইংরেজশাসন প্রতিষ্ঠিত হবার পরেও আমাদের কালীঘাটের কালীমন্দিরে এবং চিৎপুরের দেবী চিত্তেশ্বরীর মন্দিরে নরবলি দেওয়া হতো।
সেই প্রাচীনকাল থেকে গোল্ড মাড়িয়া মুড়িয়া হল প্রভৃতি আদিম জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত এই বস্তার জেলার বিভিন্ন স্থানে নরবলি প্রথা চলে আসছে। এই জেলার এক নরবলি প্রিয় নরপতির নাম ছিল-ভৈঁরো দেও। ১৮৭৬ সালে তিনি এখানকার রাজা ছিলেন। সেই সময় বস্তার জেলার জগদ্দলপুরের বিখ্যাত দেবী দন্তেশ্বরীর মন্দিরে প্রচুর নরবলি দেওয়া হতো। রাজার লোকেরা পাশের উড়িষ্যা রাজ্য থেকে চুরি করে বা জোর করে মানুষ ধরে নিয়ে আসত।
আগের মতো ঘন জঙ্গল এখন আর নেই। প্রশাসনও সর্তক দৃষ্টি রাখে। ফলে দন্তেশ্বরী মন্দিরে আর নরবলি হয়না। তবে যে সব জায়গায় জঙ্গল এখনও ঘন-গভীর-দুর্গম আদিবাসীদের আর এক দেবতা বা দেবী–আঙ্গার মন্দিরে এখনও মাঝে মধ্যে একটা দুটো বলি হয়েও যায়। যাকে শাসন-প্রশাসন কোনভাবেই রদ করতে পেরে উঠছে না।
আইন হয়েছে বন্যপ্রাণী শিকার করা চলবে না। দ্রুণ হত্যা কঠোর দণ্ডনীয় অপরাধ। সাজার ভয় দেখিয়ে এ সব কী বন্ধ করা গেছে? নরবলিও ঘোর অপরাধ। এই অপরাধে যাবজ্জীবন জেল অথবা ফাঁসি হতে পারে। তবু কুসংস্কার আচ্ছন্ন বস্তার জেলার আদিবাসীরা সুযোগ পেলে নরবলি দিয়েই যাচ্ছে মাঝে মাঝে।
এছাড়া সাপ কিংবা বিছা কাটতে পারে। তখন আমার আর এ সব ভাববার অবকাশ ছিল না। বাবার সময়কার একখানা ভোতা কুড়ুল ছিল। সেখানায় ধার দিয়ে আর একখানা সাইকেল ভাড়া নিয়ে একা চলে গিয়েছিলাম জঙ্গলে।
এ জঙ্গলে সহজে কেউ আসেনা এখলে প্রচুর শুকনো ১০ নাম্বার ভিলেজের কাছে একটা খাড়া পাহাড়ের উপর দিয়ে রাস্তাটা কাপসী গেছে। সেটা এত খাড়া যে খালি সাইকেলই ঠেলে উপরে তুলতে প্রাণ বের হয়ে যেতে চায়। প্রায় আধ মাইল লম্বা এই বাধার কারণে সম্ভবতঃ কাঠ সংগ্রহ করা লোকেরা এ দিকটা পরিহার করে চলে।
আমি অন্য দিকের জঙ্গল চিনি না। চিনবো হাতে অত এখন সময় নেই। খিদে তাড়া করে আসছে। খুব বেশি হলে আট ঘন্টা, তারপর পেড়ে ফেলবে। তার আগে কিছু একটা করা চাই। তাই এই জঙ্গলটা বেছেছি।
এটা জুন মাস। বছরের সবচেয়ে উত্তপ্ত সময়। বেলা এগারোটার পরে আর কেউ ঘরের বাইরে থাকে না। তখন বাতাসে লু চলে। সেই গরম হাওয়া গায়ে লাগলে চামড়া পুড়ে ফোস্কা পড়ে যায়। সানস্ট্রোকেও বহু মানুষ মারা পড়ে। কাঠ কেটে বয়ে নিয়ে ফিরে আসতে হবে তার আগে। না হলে সূর্য তখন মাটিতে যে আগুন ঢালবে, পাথুরে মাটি সে আগুন দ্বিগুণ করে ফেরাবে।
সেই ঘন গভীর ভয় ধরানো জঙ্গলে গিয়ে ভোতা কুড়ুল দিয়ে যা হোক করে কাঠ তো কাটলাম। সেই কাঠ সাইকেলের ক্যারিয়ারে সাজিয়ে সাইকেলের একটা টিউব দিয়ে এবার বেঁধে ফেলতে হবে। বেলা তখন দশটার মতো হয়ে গেছে। রোদ শরীরে ছোবল দিতে শুরু করেছে আর পেটে শুরু হয়েছে খিদের চিনচিনে কামড়, সাথে প্রবল জল পিপাসা। এ সব অঞ্চলের মানুষ কেউ জল ছাড়া পথে নামে না। সবার সাইকেলে বাধা থাকে জল ভরা ব্যাগ যার নাম–ছাগোল। মাথায় বাধা থাকে গামছা। আর একটু বাবু গোছের লোক হলে চোখে কালো চশমা। আমি একেবারে অজ্ঞ এ সব বিষয়ে, তাই না জল না গামছা জঙ্গলে চলে এসেছি। এখানে কোথাও জলের নাম গন্ধ নেই।
কি আর করার। তাড়াতাড়ি কাঠ গোছাতে শুরু করি সাইকেলে আশা, জঙ্গল পার হয়ে ১৩০ নাম্বার ভিলেজে গিয়ে জল খাবো। আর তখনই বাঁ পায়ের পাতায় কাঁকড়া বিছে ফুটিয়ে দিল হুল। কাঠের বাকলের মধ্যে থাকা কালো রঙের ছোট্ট বিছে আমার নজরে পড়েনি। পা তুলে দিয়েছি পিঠে। পায়ে তো চপ্পল ছিল না ফলে হুল বিধোতে তার কোন বেগ পেতে হয় নি। তখন মনে হল একটা গরম শিক যেন চড়চড় করে পায়ের পাতায় ঢুকে গেল। পুরো পা যেন যন্ত্রণায় অবশ হয়ে যেতে আরম্ভ করল আমার। আর মাঝে মাঝে তার মধ্যে যেন বিদ্যুতের ঝলক আর ঝটকা।
