আমরা পৌঁছেছিবিকালে। তখন নিরুবাড়িতে ছিল না।পি.ভি. ৫৬-এ তাস খেলতে গিয়েছিল। নিরুর ছেলে গিয়ে তাকে খবর দিল। খবর পেয়েও সে তাস ফেলে সন্ধ্যার আগে বাড়িতে এল না, এবং যখন সে এল তার ও তার বউয়ের হাসিহীন কালো মুখ দেখে মনে কুডাক ডেকে উঠল। তখনই বুঝে গেলাম–জীবনের অনেক ভুলের মত আর একটা মস্তবড় ভুল করে বসে আছি। এখানে এভাবে সপরিবারে এসে পড়াটা একদম সঠিক কাজ হয়নি। আমার সেই মা–মায়ের নিরাসক্ত ব্যবহারে বুঝে গেলাম–এক দীর্ঘ অদর্শন তার মনের মধ্যেও দেওয়াল তুলে দিয়েছে। সেখানে আজ আর আমার জন্য কোন স্নেহ মমতা অবশিষ্ট নেই। সে তার ছোটছেলে এবং তার সন্তান সন্ততির স্বার্থ সুখ ছাড়া আর অন্য কিছু চায় না। মা মহাভারতের গল্প জানে। যদি সম্পত্তির ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে ভাইয়ে ভাইয়ে বিরোধ বাধে মহা অনর্থ হকে। মায়ের এখন সেই ভয়ে বুক কঁপছে।
সব বুঝতে পারছি, কিন্তু আমি তখন কী করব? অচেনা দেশ অচেনা পরিবেশ। যেখানে আমার বন্ধু রলে কেউ নেই। এখানে এসে যেন এক কুয়োর মধ্যে সপরিবারে পড়ে গেছি। ফের যে কলকাতায় ফিরে আসব তার গাড়ি ভাড়াই নেই। এসে যে বউ বাচ্চা নিয়ে থাকব তার কোন ঘর নেই। নরেন্দ্রপুরে যে ঘরে ছিলাম, আমি চলে আসার পর সেখানে অন্য কাউকে কাজে রেখে ঘরটা তাকেই দিয়ে দিয়েছে নিশ্চয়। তাহলে এখন উপায়?
একান্ত বাধ্য হয়ে দু তিন মাস থাকতে হল ভাইয়ের বাড়ি। আমরা আমাদের অসহায়তার বিষয়টা জানি, তাই যথাসাধ্য ওদের মন জুগিয়ে চলবার চেষ্টা করি। অনু ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠে গোয়াল সাফ করে, ঘরদোর ঝাট দেয় লেপাপোছা করে, জল বয়ে আনে, রান্না করে খেতে দেয়। বাড়িতে এখন এগার বারো জন লোক। তাদের জন্য রান্না হয় মোট তিনবার। সকালে সামান্য কিছু সেদ্ধ ভাত। যা খেয়ে আমরা যে যার কাজে বের হয়ে পড়ি। আমি মাঠে গরু ছেড়ে দিয়ে জঙ্গল থেকে খুটি বাঁশ কেটে আনি। যে বাড়ি এতকাল ঘেরা বেড়া ছাড়া ছিল এখন তার চারদিকে, যা প্রায় এক একর জায়গা, তাকে ঘিরে বেড়া দিই। এখন বাড়ির সবাই সব কাজ আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়ে হাতপা ছড়িয়ে বসে পড়েছে। চাইছে খাটুনির চোটে আমরা যেন চলে যাই। নিরুর বউ আর টিউবয়েলে গিয়ে চান করতে পারে না। তার পেটে বাচ্চা। সে জন্য তার চানের জল আধ কিলো মিটার দূর থেকে অনুকে বয়ে এনে দিতে হয়। আর সে এক পৈশাচিক আনন্দে দুতিন বালতি জল হড় হড় করে গায়ে ঢালে। এত কিছুর পরেও সে বেচারা পেট ভরে খেতে পায় না। আমি তো আগে খাই ফলে টের পাই না ওর খাবার আছে কি নেই। নিরুর বউ এবং আমার পূজনীয়া মা খেয়ে ছড়িয়ে ভাত নষ্ট করে ওকে উপোসে রাখে। এর ওপর আছে ঝগড়া। মা আর নিরুর বউ তো আছেই, মাঝে মাঝে আমার এক বোন যার বিয়ে হয়ে গেছে, তাকে ঝগড়া করার জন্য ডেকে আনা হয়। আমি যখন জঙ্গলে বা মাঠের কাজে ব্যস্ত থাকি তিন দিক থেকে অনুকে ঘিরে শুরু হয় ওদের আক্রমণ। একদিন তো এমন হল সারাটা দিন কিছু খেতে দেওয়া হল না। আমি যেন কি কাজে গিয়েছিলাম। সন্ধ্যাবেলা ফিরে দেখলাম আমার পথ চেয়ে পথের পাশে এক গাছ তলায় ছেলে মেয়ে নিয়ে বসে বসে কাঁদছে অনাহারী অনু।
তখুনি আমরা চলে এলাম আমার বাবার সেই পুরনো ঘর পিভি ৫৬তে। সে ঘরের তখন ভগ্ন দশা। চালের খড় পচে ভোলা হয়ে গেছে। বৃষ্টি নামলে এ ঘরে থাকা মুশকিল। এখানে আমার মেজ ভাই চিত্তের বিধবা স্ত্রী থাকে দুটো নাবালক বাচ্চা নিয়ে। নিয়ম মত তার শ্বশুরের জমির একটা ভাগ পাওয়ার কথা। নিরু তাকে সে ভাগও দেয়নি। বেচারা মানুষের বাড়ি বাড়ি ধান কুটে জমিতে খেটে বাচ্চা দুটো নিয়ে বেঁচে আছে।
এখানে বলে রাখি, আমি পরে নিরুর কাছ থেকে তাদের জমির ন্যায্যভাগ আদায় করে দিতে পেরেছিলাম এবং আমার যে ভাগ তা আদায় করে চিত্তর দুই নাবালক ছেলে চন্দন তিলকের নামে লিখে দিয়েছিলাম। তখন নিরু নিশ্চয় বুঝেছিল আমাকে কলকাতা থেকে ডেকে নিয়ে যাওয়া কত বড় ভুল হয়েছে। একে বোধ হয় বলে খাল কেটে কুমির আনা।
যাই হোক, সেই রাতে চন্দনের মাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে বলেছিলাম, ভাত রান্না করো, আমরা না খেয়ে আছি।
সে রাত তো সেই ভাবে গেল কিন্তু তার পরের দিনগুলো কি করে যাবে? এখানে তো এমন কেউ নেই যে এক কিলো চাল দিয়ে আমাদের সাহায্য করে। ভাইদা শংকর নামে একটা লোক ছিল সে বলল চলে যাও জঙ্গলে। কেটে ফেড়ে নিয়ে আসো এক সাইকেল কাঠ। বেচো কোনো হোটেলে। কিনে আনো চাল ডাল। খেয়ে বাঁচো বউ বাচ্চা নিয়ে।
কথাটা মনে ধরল আমার। এখানে যারা মজুর খাটায় রোজের পয়সা রোজ দিতে পারে না। সপ্তাহ শেষে হাটবারে ধান পাট তিল সরষে হাঁস মোরগ কিছু একটা বেচে মজুরি শোধ করে। অত দেরি হলে আমার চলবে না। দুপুরেই চাল কিনে ভাত রান্না করতে হবে যে।
এখানে যে কাঠ বিক্রি করে তার কোন সম্মান বলে কিছু থাকে না। সবাই ডিফল্টার বলে। কলকাতা শহরে যারা কাগজ কুড়ায় এখানে যারা কাঠ বেচে দুজন সমান। আমার তখন সম্মান নয় খাদ্য দরকার। দুটো বাচ্চা, বউ। এদের বাঁচানো দরকার।
পি.ভি. ৫৬ নাম্বার থেকে কাপসী বাজার মাইল তিনেক দূরে। বাজারের শেষ মাথায় গোপালের হোটেল। ধরলাম গিয়ে তাকে। দাদা সবাই যে পরিমাণ কাঠ দেয় আমি তার চেয়ে কিছু বেশি দেবো। সবাইকে তুমি যে দাম দাও আমাকে না হয় তার চেয়ে এক টাকা কম দিও। তবু আমার কাছ থেকে কাঠ নাও। আমি বড় বিপদে পড়েছি। কথা হল সে আমাকে প্রতি সাইকেল কাঠের দাম দশ টাকা দেবে।
