যখন মানুষ প্রথম জেলখানায় যায়–বাইরের জন্যে মন কাঁদে। মুক্তি পাবার জন্য ছটফট করে। যখন বুঝে যায় মুক্তি পাবার কোন আশা আর নেই, সারা জীবন এখানেই কাটাতে হবে তখন তার উতলাভাব ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসে। সে তখন জেলবাসটা কতটা সহনীয় করে নেওয়া যায় সেই চেষ্টায় মত্ত হয়। কেউ মাটির মুর্তি গড়ে, কেউ ছবি আঁকে, কেউ ফুলের বাগান করে।
উদ্বাস্তুরা যখন বুঝে গেল তারা বাংলার কেউ নয়, বাঙালীর কেউ নয়। তাদের জীবন মরণ লেখা হয়ে গেছে দণ্ডকারণ্যের কাঁকর পাথর মাটির বুকের গোপন আখরে, তখন তারা যে কটা দিন বাঁচি যতটা ভালোভাবে বাঁচা যায় সেই চেষ্টায় যত্নশীল হয়ে উঠল। বাড়ির আশেপাশে পুততে শুরু করল আম কাঁঠাল সহ নানাবিধ ফলের গাছ। কেউ খুড়ে ফেলল জলের কুয়ো। সেই কুয়োর জলে ফলাতে লাগল ফুলকপি বাধাকপি বেগুন মুলো। কেউ উঁচু নীচু জমি কঠিন শ্রমে সমতল করে খরিফ এবং রবি দুটো ফসল উৎপন্ন করে নিতে লাগল বছরে। ছেলেমেয়েকে পড়াশোনা শিখিয়ে যাতে চাকরি বাকরি পায় সেই চেষ্টা শুরু করল কেউ কেউ। একদল নেমে গেল ছোটখাটো ব্যবসায়–যার স্থানীয় নাম ধান্দা। যার মধ্যে ব্যবসা কম-ধান্দা বেশি।
নিরুও ধান্দা করে। সাইকেলে চাপিয়ে খইনি তেল সাবান নিয়ে আদিবাসী পাড়ায় গিয়ে বিক্রি করে। ধান্দা মোটামুটি জমে গেছে। এবার এসেছে কলকাতা থেকে চুড়ি দুল চুলের ফিতে এই সব মনোহারি মাল নিয়ে যাবে বলে। এতে দারুণ লাভ।
মানুষ তো আসলে সব কিছুর পরেও মানুষ। তার লোভ আছে ক্রোধ আছে আবেগ আছে। সে তো জানে না কখন তার মনের উপর কোনটা বেশি প্রভাব বিস্তার করে বসবে। আর তখনকার সেই মানসিক দুর্বলতার মুহূর্তে এমন একটা কাজকরে ফেলবে যে সেই ভুলের জন্য সারাটা জীবন তাকে পস্তাতে হবে। আমার ছোট ভাই নিরু এমনিতে দয়ামায়া শূন্য এক কঠোর প্রকৃতির মানুষ। তবে সেদিন দীর্ঘ ষোল সতের বছর পরে দাদাকে দেখে আবেগাক্রান্ত হয়ে পড়ে সে, আর বলে বসে–দাদা এখানে যখন এই অবস্থা, তখন শুধু শুধু এখানে কেন পড়ে আছে। বাড়ি চলো। সরকারের কাছ থেকে যে জমি জায়গা পেয়েছি একা আমি তা চাষ করে উঠতে পারি না। অর্ধেকের বেশি অনাবাদি পড়ে থাকে। বাবা মরে গেছে মেজদা মরে গেছে। চলো দুই ভাই মিলে মিশে একসাথে থাকব। চাষাবাদ করে খাব। নির্বোধটার তখন মনে ছিল না যে তার দুটো ছেলে আছে। তারা একদিন বড় হবে, বিয়ে থা করবে। এখন জমি চাষ করা যায় না, খাটবার লোক নেই, তখন জমি কম পড়ে যাবে।
নিরুহোতখনকার মত কথাকটি বলে দিয়ে দুদিন আমার বাসায় থেকে তৃতীয় দিন চলে গেল, এদিকে আমার সংসারে লেগে গেল অশান্তির আগুন। আমার স্ত্রী অনুর বা কী দোষ। তার তো তখন ডুবন্ত মানুষের মত অবস্থা, খড় কুটো যা পায় আঁকড়ে ধরে তীরে উঠতে চায়। নিরুর কথায় তার মনের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে আমরা কুল পাবো-বাঁচবো। তাই সে জিদ করতে থাকে, ঝগড়া করতে থাকে, কান্না জুড়ে দেয়–”দেশে চলো।”
অনু এভাবে এখানে থাকতে ভীষণ ভয় পাচ্ছে। তার চোখের সামনে ভাসছে রাজডাঙার ছয় ছয়টা মৃতদেহ। যেদিন সে রেশন তুলতে হালতুতে গিয়েছিল তারই চোখের সামনে কানা অজিতকে খুন করা হয়। তারই চোখের সামনে তার স্বামীকে রিকশা থেকে নামিয়ে বেধরক মারা হয়। অনাথ আশ্রমের শান্ত নিরুদ্বেগ জীবন কাটিয়ে এসে এসব ভয়াবহতা সহ্য করতে পারছে না। তার আশঙ্কা হচ্ছে আমার শত্রুরা যে কোনদিন তাকে বিধবা বানিয়ে দিতে পারে। তাই তার কান্না কাতরতা দেশে চলো।
এই সময় আমি একদিন চেতলা স্কুলের শিক্ষক-কবি-দাদা সমীর রায়ের সাথে দেখা করে বলেছিলাম-ভাবছি, আমি মধ্যপ্রদেশের বস্তার জেলায় চলে যাব। কলকাতায় আর আসব না। বাকি জীবনটা ওখানেই কাটিয়ে দেব। বন্ধু বান্ধব সবার কাছে বিল্টুদায় ওয়া হয়ে গেছে। শুধু আপনি বাকি ছিলেন।
তখন বলেন উনি–সিদ্ধান্ত যখন নিয়ে ফেলেছে, নিশ্চয় সবদিক খতিয়ে দেখেই নিয়েছে। তবে বস্তারে যখন যাচ্ছো তুমি ওনার সাথে দেখা কোরো। বস্তার থেকে দল্লী খুব বেশি দুর নয়।
কার কথা বলেছিলেন কবি সমীর রামা কে তিনি? উনি ছত্তিশগড়ের শ্রমজীবী জনগণের হৃদয়-সাম্রাজ্যের রাজা শংকর গুহ নিয়োগী। আপামর জনগণের আদর আর ভালোবাসার নিয়োগী ভাইয়া।
এই নাম আমার আগে থেকে জানাছিল। সঠিক মনে নেই সম্ভবত পরিবর্তন পত্রিকার কোন পুরনো সংখ্যা ছেচনের ছেঁড়া কাগজের স্তূপ থেকে বের করে পড়ে জানতে পেরেছিলাম ওনার বিষয়ে। তবে সাক্ষাৎ কোন পরিচয় তো ছিল না তাই জানা ছিল না মানুষটা ব্যবহারিক জীবনে ঠিক কেমন আর জনতার কতটা প্রিয়। মনে এবার আশা জাগলো, বস্তারে গিয়ে অন্তত একবার ওনার সাথে নিশ্চয় দেখা করব।
অবশেষে মাস দুয়েক পরে একদিন প্রয়োজনীয় যা কিছু বেধে ছেদে পৌঁছে গেলাম পারালকোটে। নিরু তখন আর আমাদের পুরনো বাড়ি–পি.ভি৫৬ তে থাকে না। থাকে হারানগড় নামে এক আদিবাসী গ্রামের কাছে নতুন বসত বাড়ি বানিয়ে। এখানে আমাদের বেশ খানিকটা চাষের জমি আছে। একটু ফাঁকা ফাঁকা জায়গা বলে এখানে গরু মোষ হাস মুরগি এসব পালন পোষণের বিশেষ সুবিধা। এখানে নিরুর একটা মুদিখানার দোকানও করেছে। হারানগড়ের সব লোক যে দোকান থেকে দরকারি জিনিসপত্র কিনে নিয়ে যায়।
