পুরো যাদবপুর কজা করে নিলেও স্টেশনটা বাদ ছিল। সিপিএম নেতা শিবু রায় চৌধুরী আর সেই কংগ্রেসি মাস্তান দুজনে বন্ধু। সন্ধ্যেবেলায় একসাথে বসে মদটদ খায়। চক্ষু লজ্জার কারণে ওটা তার জন্য ছাড় দিয়ে রেখেছিল। এখন সে ইউনিয়ন তার কজা থেকে বের হয়ে গেছে, আর চক্ষুলজ্জার কোন বালাই নেই তাই একদিন সি.পি.এম. পার্টির দু তিনজন যুবনেতা আমার কাছে এল। বলল–এই ইউনিয়ন চলবে না। সবাইকে সিটু অনুমোদিত অল বেঙ্গল রিকশা ইউনিয়নে যোগ দিতে হবে।
আমি জানি, আগের রিকশায় চড়া লোক দ্বারা সঞ্চালিত ইউনিয়ন কেমন ছিল। এটা সব রিকশাঅলাই জানে। এবারও যারা এসেছে সব রিকশায় চড়া দলের লোক। এ ইউনিয়ন যে কেমন হবে তা আমাদের বোঝা আছে। তাই রাজি হতে পারি না। বলি–আমরা কোন দলের সাথে যাবো না। ফলে তারা আমার উপর খুবই রুষ্ট হয়। বলে যায় যাস কী যাস না দেখবো!
দেখতে গেলে এই শহরতলিতে সবচেয়ে বিপন্ন বেওয়ারিস অসুরক্ষিত হস্তসুখ দানযোগ্য দুর্বল প্রাণীটির নাম রিকশাঅলা। তাকে যে কোন সময় যে কোন সুবিধা জনক স্থানে নিয়ে যাওয়া যায়। মেরে নাক ফাটিয়ে দেওয়া যায়। হাজার লোক থাকলেও কেউ কিছু বলবে না। কোন বাবু রিকশাঅলাকে পেটাচ্ছে আর কেউ এসে বাধা দিয়েছে এমন উদাহরণ একটাও নেই। যারা আমার সবকাজের সহায়ক শুধু এই কটাকে সাইজ করে দিলে বাকি যে কটা বুড়ো আধবুড়ো মরা আধমরা থাকে তাদের উঠতে বললে উঠবে বসতে বললে বসবে। তাই তারা পরের দিন থেকে নানান ছলছুতোয় তাদের উপর অত্যাচার শুরু করে দিল। কথায় তো বলে দুষ্টের কখনও ছলের অভাব হয় না। কজন রিকশাঅলা দুপুর বেলা তাস খেলছিল যার মধ্যে কালো গোপালও ছিল। জুয়া খেলছে বলে তাকে পিটিয়ে দিল। জলিলকে মারল মদ খেয়ে আজেবাজে কথা বলেছে এইছুতোয়। গণেশকে মারল ভাড়া বেশি নিয়েছে বলে। আর সব শেষে এক দিন আমাকেও বাঁশপেটা করে দিল আমার বউ বাচ্চার সামনে। আমার অপরাধ তো একটা নয়–অনেক। সেই উনসত্তর সাল থেকে দশ-বারো বছর শুধু অপরাধই অপরাধ। সময়টা একটু বদলে গেছে, নাহলে ওরা আমাকে শেয়াল শকুনের খাদ্য বানিয়ে দিতে পারলে খুশি হতো। তা যখন করা যাচ্ছে না এই সময়, তাই কঠোর আদেশ দেওয়া হল আমাকে–আর যেন তোকে যাদবপুর স্টেশনের ত্রিসীমানায় না দেখি। আর রিকশার হ্যান্ডেল ষ্টুবি না। তোদের মতো ক্রিমিনালদের জন্য যারা সত্যিকারের ভালো লোক সেই সব রিকশাঅলার বদনাম হয়ে যায়। যদি রিকশা চালাস ধাপার মাঠে নিয়ে গিয়ে পুতে দেব।
আবার বেকার হয়ে গেলাম আমি। চলে গেল রিকশা চালানো, চলে গেল আমার প্রিয় যাদবপুর স্টেশন। এরপর আর কোনদিন এখানে ফিরে আসা হয়নি। প্রবহমান সময় আমাকে ঠেলতে ঠেলতে সরিয়ে নিয়ে গেল দূর থেকে দুরে।
এবার আমাকে যাদবপুর থেকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করে দিলেন আমার শাশুড়ি মাতা। ওনার একজন লোকের সাথে চেনাজানা ছিল, যার মাধ্যমে আমার জন্য যোগাড় করে দিলেন নরেন্দ্রপুরের এক কারখানায় নাইট গার্ভের কাজ। মাইনে মাসে সাড়ে তিনশো। তবে তারা কারখানার মধ্যেই আমাদের থাকার জন্য একটা ছোট্ট ঘর দিলো যে কারণে ঘর ভাড়াটা বেঁচে গেল।
নরেন্দ্রপুরে আমি বছর দুই ছিলাম। এখানে আমার দ্বিতীয় সন্তান জন্মগ্রহণ করে। যার নাম রাখা হয় মানিক। আর প্রথম সন্তানের নাম তো রাখা হয়েছিল আমার প্রিয় সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবীর নামে। এবার আর এক প্রিয় পদ্মানদীর মাঝি উপন্যাসের লেখকের নামে মিলিয়ে রাখলাম ছেলের নাম।
এই সময় আমার অনেকগুলো লেখা বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। জীবনে প্রথম লেখার জন্য টাকা পাই। মনোরমা পত্রিকায় প্রকাশিত আমার নেশা গল্পটির জন্য সাড়ে চারশো টাকা (যা তখন আমার একমাসের মাইনের চেয়েও বেশি)-“পারিশ্রমিক পাওয়া যায়। ১৯৮৮ সালের মার্চ মাসের ২৮ তারিখে আনন্দবাজার পত্রিকার কলকাতার কড়চায় আমার কথা লেখা হয়। লিখেছিলেন নিখিল সরকার–“আমরা প্রশ্ন করেছিলাম ওকে কেন লেখেন? জবাব ছিল আমার কিছু কথা আছে যা মানুষকে জানানো দরকার আর সে সব কথা জানাতে পারি আমিই।……”
১৯৮৯ সালের এক সকালে আমার বড় অবাক হবার পালা। কেমন করে কে জানে আমার ছোট ভাই নিরু এই এত বছর পরে দণ্ডকারণ্য থেকে কলকাতায় এসে খড়ের গাদায় সূঁচ খোঁজার মত খুঁজে আমার নরেন্দ্রপুরের ঠিকানায় পৌঁছে গেল। ও এসেছিল কলকাতায় তার দোকানের জন্য কিছু মালপত্র কিনতে। তখন তার মনে হয় একবার দাদাকে খুঁজে দেখা যাক যদি পাওয়া যায়। সে প্রথম আসে সুলেখা কালি কোম্পানির কাছে। সেখান থেকে খবর পায় আমি যাদবপুর স্টেশনে রিকশা চালাই। স্টেশনের রিকশাঅলারা জানায় এখানে নয়, আমি নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনের কাছে থাকি। কেউ একজন এও বলে দেয়-মিশন পার হয়ে ডানদিকে যে বিস্কুট, লোহা, আর কাঠের কারখানা ওখানেই আমার ডেরা।
আর কেউ দিক বা না দিক আমি অন্তত মরিচঝাঁপির নির্মম নরসংহার বলাকার কান্ডের মহানায়ক জ্যোতি বসুকে একটা ধন্যবাদ দেব। উনি যা করেছিলেন সঠিক কাজই করেছিলেন। কারণ যে যত গভীরভাবে ঘুমোয় তাকে তত জোরে ধাক্কা মেরে জাগাতে হয়, দণ্ডকারণ্যবাসী উদ্বাস্তুরা পরম বিশ্বাসে গভীর ঘুমে তলিয়ে স্বপ্ন দেখছিল যে পশ্চিমবঙ্গে তাদের প্রতি দরদি মনের একজন মানুষ আছে, একটা দল আছে। যদি তারা কোনদিন ক্ষমতা পায় আবার তারা স্বদেশে ফিরে যেতে পারবে। জ্যোতি বসুর পুলিশ আর পার্টিক্যাডারদের পাশবিক হত্যা আর ধর্ষণ তাদের সে স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছে। তারা এখন বুঝতে পারছে তাদের প্রতি দায় বা দরদ কোনটাই এদের কোনদিন ছিল না। কোন উচ্চবর্ণের নেতা বা দলের তা থাকে না। তারা যখন যা করে সে গলায় জড়ানো বা গলা টেপা-সবটাই নিজেদের স্বার্থে। এই বোধোদয় পরবর্তী সময়ে তাদের প্রভূত উপকারে লেগেছে। নতুন করে ভাবতে এবং বাঁচতে শিখিয়েছে।
