উনি থামবার পর কাঁপা কাঁপা গলায় বলি–আপনি স্যার যা ভাবছেন আমি তা নই। কোন রাজনৈতিক দলের সাথে আমার কোন সংশ্রব নেই। নিতান্তই গরিব মানুষ, পেটের দায়ে এই কাজ করতে এসেছি। আমার অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই। স্যার বহুদিন হয়ে গেল, এত কম মাইনেয় আর সংসার চালাতে পারছি না। এবার দয়া করে আমার একটা ব্যবস্থা করে দিন স্যার।
হাসলেন উনি বস্তুতঃ উনি এই প্রথমবার হাসলেন। এমন বুক হিম করে দেওয়া বিদ্রুপের হাসির সামনে আগে আর কখনও পড়িনি। হেসে হেসে বলেন তিনি একটা সত্যি কথা শুনবে? শুনলে তোমার কিন্তু ভালো লাগবেনা। তবুবলছি, আমি তোমার মত একজন প্রতিভাবান মানুষকে ঝাটা হাতে দেখতে চাই না। ওই হাতে কলম দেখতে চাই। কামানের নলের মত অগ্নি উক্ষিরণকারী কলম। হাঃ হাঃ। তাই এমন কিছু করতে মনের সায় পাচ্ছি না যাতে মহান একটা প্রতিভা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়। কত শক্তিশালী লেখনি তোমার যদি তুমি শুধু লেখা নিয়েই থাকো, আমি বলছি–একদিকে যেমন বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ হবে, অন্যদিকে বাংলার বামপন্থীরা গর্ব করার জন্য খুঁজে পাবে এক বাঙালী গোর্কিকে। আমি তোমার মধ্যে সেই সম্ভাবনা সুপ্তাকারে দেখতে পাচ্ছি। সামান্য মাইনের একটা চাকরির প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে তোমার ও বাংলা সাহিত্যের এত বড় ক্ষতি আমার দ্বারা হবে না। সেটা অন্যায় হবে পাপ হবে। আমার এই নির্ণয় আজ তোমার কাছে অমানবিক বলে মনে হতে পারে। কিন্তু একদিন তুমিই বলবে যে আমার এই সিদ্ধান্ত কত নির্ভুল কতটা সঠিক ছিল। তুমি বরং একটা কাজ করো, সুবোধ বাবু স্বদেশবাবু এদের বলো–ওদের তো অনেক পত্র পত্রিকা তার কোন একটায় লেখালেখির কাজ দিয়ে দিক।
কখন হেডস্যারের প্রবচন থেমে গেছে বুঝতে পারিনি। তখন কান মাথা সব আঁ আঁ করছিল আমার। নিদারুণ এক আশঙ্কা–এক স্বপ্নভঙ্গের বেদনা আমার সমগ্র সত্তা বর্তমান ভবিষ্যৎ সব যেন গিলে নিয়েছিল। শোকে দুঃখে তখন যেন মরে গেছি আমি। মরে পচে হেজে গেছি। আমার সারা শরীর বেয়ে দৌড়াচ্ছে নানা সাইজের বিষ্টাকীট। যেমন দৌড়য় লাশ গাদায় ফেলে দেওয়া বেওয়ারিস লাশের শরীরময়। কখন যে চেতনাহীন অবশ অসাড় শরীরটা টেনে কলঘরের পাশের প্রায়ান্ধকার সিঁড়ির নিচে এনে ফেলেছি–জানি না। বসে পড়েছি সিঁড়ির থুতুকফ ধুলো পানের পিকের উপর। মল মূত্রের তীব্র গন্ধ নাকে এসে লাগছে। বহু সময় এভাবে বসে থাকবার পর শুনতে পাই স্কুলের ছুটির ঘন্টা।তখন পায়ে পায়ে দাঁড়াই পথের উপর। আমারও ছুটি হয়ে গেছে।
বহুপথ হেঁটে বহু মানুষ দেখে বহু অভিজ্ঞতায় অভিজ্ঞ হয়ে আবার ফিরে এলাম আমার সেই পুরনো ঠিকানা–যাদবপুর রেল স্টেশনে। স্টেশনের রিকশা লাইনে, আবার রিকশাঅলা হয়ে। তখন মনে হল ঘুড়ি যতই আকাশময় উড়ুক যত ফড়ফড় করুক আর যতই উঁচুতে উঠুক, শেষকালে লাটাইয়ের গোড়ায় ফিরেই আসতে হবে। এটাই তার নিয়তি। আমার জীবনটাও ওই ঘুড়িরইমতোনাকী এক অদৃশ্য সুতো আমাকে বেধে রেখেছে একঅবমাননা অভাব আর অস্বাভাবিক ঘটনা প্রবাহের সাথে। যা থেকে মুক্তি নেই। সরল স্বাভাবিক ছন্দবদ্ধ যে জীবন তা আমার নাগালে কোনদিন আসবে না।
কী আর করা যাবে, যখন গরু গাধা ঘোড়ার মত ভারবাহী পশুতুল্য জীবন যাপন করতেই হবে–রিকশা চালিয়ে বাঁচতে এবং মরতে হবে। দিনের অধিকাংশ সময় যেখানে কাটাতে হবে সেই কর্মভূমিটাকে এবং যে মানুষগুলোর সঙ্গে থাকতে হবে, মরে গেলে যাদের কাঁধে চেপে শ্মশান পর্যন্ত যেতে হবে সেই আমার স্বজন, সবাই মিলে যাতে আর একটু কম কষ্টে থাকা যায় এবার সেই উদ্যোগটা নেওয়া যাক। স্থির করি আমি রিকশা ইউনিয়ন করবো। একেবারে একটা নতুন ধরনের ইউনিয়ন।
এর আগে অনেকবাৰ্বি ইউনি হয়েছে। ইউনিয়নের কর্মকর্তা যারা হয়েছেন কেউ রিকশা চালান না। রিকশা চড়েন। যে ইউনিয়নের সদস্য হবার ফলে রিকশা চালকদের তিনটি বিশেষ কাজ করা ছিল বাধ্যতামূলক। একমাসে মাসে নির্ধারিত চাঁদাটি ঠিকমত দেওয়া। দুই-বিশেষ বিশেষ দিনে মিছিল করে গিয়ে মিটিংয়ে ভিড় বাড়ানো। তিন-ভোটের সময়ে উক্ত ইউনিয়ন নেতার নির্দেশ অনুসারে বিশেষ বিশেষ ভোটারকে বাড়ি থেকে রিকশায় করে ভোট কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া ও ভোটদানের পরে তাকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া এবং অবশ্যই এর জন্য কোন ভাড়া দাবি না করা।
যাদবপুর স্টেশনে দীর্ঘদিন ধরে যে রিকশা ইউনিয়নটি রয়েছে এর নেতা জনৈক কংগ্রেসি মাস্তান। কংগ্রেস হলেও কী এক কারণে কে জানে এলাকার সিপিএম নেতাদের সাথে তার বড় মধুর সম্পর্ক। প্রতিমাসে দুটাকা করে ইউনিয়ন চাঁদা তো সে আদায় করে নেয়, কেউ জানে না সে টাকা কোথায় কি ভাবে খরচ হয়। রিকশা চালকেরা সাধারণত খুবই গরিব। তাদের কন্যাদায়, মা বাপের শ্রাদ্ধ, পরিবারের কারও অসুখ বিসুখ বা রিকশা চালকের নিজের অসুখ কিংবা দুর্ঘটনা, এসব ক্ষেত্রে তাকে সহজ শর্তে কিছু ঋণদান অবশ্যই ইউনিয়নের দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। কিন্তু কোন ইউনিয়নই এখন পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেনি।
আমার ধারণায় একটা কারখানায় যদি ইউনিয়ন হয় আর তার নেতৃত্ব কর্তৃত্ব যদিশ্রমিকদের হাতে না থেকে মালিকদের হাতে থাকে তাতে মালিকদেরই মঙ্গল হবে শ্রমিকদের হবে না। সেই হিসাবে যদি রিকশা ইউনিয়ন যারা রিকশা চালায় তারা না বানিয়ে যারা রিকশায় চড়ে তারা বানায় তাতে রিকশাঅলাদের হিত হবার নয়। রিকশা চালক ভাইদের সাথে এ নিয়ে কথা বললাম। বোঝালাম নিজেদের ভালোমন্দের সিদ্ধান্ত আমাদের নিজেদেরই নিতে হবে। আমরা আমাদের ইউনিয়ন নিজেরা বানাবো। এখন যার হাতে ইউনিয়ন সে এক পুরনো মাস্তান, সবাই ভয়ে ভয়ে বলল–সে যদি রেগে যায়! বললাম-বুড়ো বাঘের চেয়ে জোয়ান ষাড় বেশি বলবান। আমরা আমাদের পরিশ্রমের পয়সা অন্যকে দেব না। এতে যদি কারও রাগ হয়–দেখা যাবে। অবশেষে একদিন পুরানো সাইনবোর্ড খুলে ফেলে লাগানো হল নতুন ইউনিয়নের নতুন সাইন বোর্ড রিকশা শ্রমিক সমিতি। সভাপতি হরেন ঘোষ সম্পাদক মদন দে কোষাধ্যক্ষ অভিমুন্য দাস আর গণেশ, দুই গোপাল ও আমি রইলাম সদস্য। কিছুদিন আগে সিপিএম পার্টির সালকিয়া প্লেনাম অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে। যাতে কতগুলো নতুন নতুন প্রস্তাব পাশ হয়েছে। আগে এরা বলত ধর্ম হচ্ছে আফিং যা মানুষের চেতনাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। এবার প্রস্তাব নেওয়া হল যে সিপিএম পার্টির কর্মীরাও দুর্গাপূজা কালীপূজায় সক্রিয় অংশ নেবে। মানে চঁদা তুলবে আর কি। এবং আর একটা প্রস্তাবও নেওয়া হয়েছিল যে অসংগঠিত শিল্পে যে সব মজুর আছে তাদেরও সংগঠিত করা হবে। যাতখন তারা বেশ ভালোভাবে শুরুও করে দিয়েছিল। যত হকার, ছোট ছোট দোকানদার, বড় বড় দোকানের কর্মচারী, রেল স্টেশনের মুটে, বাবুবাড়ির কাজের মাসি, দিন মজুরি করা মজুর মোদ্দা কথা সর্বত্র, প্রতিটা ক্ষেত্রে প্রতিটা পেশার মানুষকে অক্টোপাশের আটবাহু দিয়ে আঁকড়ে ধরার মত ধরে ফেলা জোর কদমে চলছিল। এবার তাদের নজর পড়ল রিকশা চালকদের দিকে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থানে রিকশা চালকদের নিয়ে বিভিন্ন নেতা ইউনিয়ন গড়েছেন। তবে এত ব্যাপক আয়োজন এর আগে আর হয়নি। সঠিক হিসাব জানা নেই তবে এটা ঠিক সে সময় যাদবপুর অঞ্চলে হাজার খানেক রিকশা নিশ্চয় চলত। সব লাল ছাতার নিচে নিয়ে আসার চেষ্টা চলছে। তাদের কঠোর নির্দেশ যে আমাদের ইউনিয়নে আসবে না, এখানে রিকশাই চালাতে দেব না। ফলে তারা প্রায় সফল হয়ে গেছে।
