এর মধ্যে এসে গেল স্কুলের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী। সেই সময় সুবোধদা আমাকে বললেন–”এবার আমরা স্কুল থেকে একটা পত্রিকা বের করব। সব ভার আমার উপর পড়েছে। তুই একটা লেখা দিস তো?” নাচের পা আমার বাজনা শুনলে আর স্থির থাকতে পারে না। দুলে ওঠে আর আমাকেও দুলিয়ে দেয়। সেদিন আনন্দে উত্তেজনায় বাস্তব বুদ্ধি লোপ পেয়ে গেল। বুঝতে পারলাম না মোহের বশে কী বিরাট ভুল হয়ে যাচ্ছে। আর তার জন্য কী ভীষণ মূল্য দিতে হবে। বসে গেলাম কাগজ কলম নিয়ে। আচার্য নাম দিয়ে লিখে ফেললাম একটা ছোট গল্প। যার কেন্দ্রীয় চরিত্রে আছেন একজন সৎ নিলোভ নির্মল শিক্ষাব্রতী দরিদ্র স্কুল মাষ্টার। অকৃতদার এই মাষ্টার মশাই তার ছাত্রদের পুত্রসম ভালোবাসেন। বিনা পারিশ্রমিকে তাদের টিউশন দেন। স্বপ্ন দেখেন–আমার ছাত্ররা ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার অধ্যাপক কবি সাহিত্যিক হবে। হবে জনগণমন অধিনায়ক। এগিয়ে নিয়ে যাবে দেশকে। আর ভারত একদিন জগত সভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে।
০৬. একমাস পরে পত্রিকা বের হল
প্রায় একমাস পরে পত্রিকা বের হল। তারপরই মনে হল হঠাৎই যেন আমার চারপাশ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। পরিচিত পরিমণ্ডল থেকে নিক্ষিপ্ত হচ্ছি ক্রমশ কোন নির্জন নির্বান্ধব দ্বীপে। হিংস্র নির্দয় নরভোজীরা দাঁতনখ নিয়ে ঘিরেছে আমাকে। আর কোন শিক্ষক আমার দিকে সোজা চোখে তাকাচ্ছে না। সবার চোখে কেমন যেন একটা ভয় একটা সন্দেহ। যেন কোন আত্মঘাতী জঙ্গি অনুপ্রবেশ করেছে তাদের সুরক্ষিত দুর্গের মধ্যে যে কোন মুহূর্তে সে সব কিছু বিস্ফোরণে চুরমার করে দেবে।
কদিন পরে রথীনবাবু ডাকলেন আমাকে সত্যি করে বলো তো এই গল্পটা কার লেখা?
বলি–আমি লিখেছি।
আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। বলেন তিনি এত ভালো তুমি কী করে লিখতে পার! পত্রিকায় অন্য যে সব লেখা ছাপা হয়েছে এর সামনে সেগুলোকে খুবই জোলো বলে মনে হয়। ওই সব শিক্ষিত মানুষদের চেয়ে তোমার লেখা এত ভালো হয় কী ভাবে? ঠিক করে বলো তো ব্যাপারটা কী?
বলি–অন্য লেখার সাথে আমি কোন তুলনায় যাবো না। তবে এটা আমারই লেখা। এই প্রথম নয়–এর আগেও আমার কুড়ি বাইশটা লেখা ছাপা হয়েছে। মহাশ্বেতা দেবীর বর্তিকাতেও আমার লেখা ছিল।
গলায় ক্ষোভ ফুটিয়ে বলেন রথীন বাবু–সে তুমি যেখানে যা করছিলে সেখানেই তা করতে। এখানকার পত্রিকায় লেখার দুর্বুদ্ধি হল কেন! এখনও তোমার চাকরিটা পার্মানেন্ট হয়নি। এই সময় মাষ্টার মশাইরা যাতে অপমানিত বোধ করেন এমন কাজ করাটা তোমার পক্ষে মঙ্গলজনক হবে না। একটু থেমে আবার বলেন উনি সুধীর বাবুর ধারণা, এর মধ্যে একটা চক্রান্ত আছে। সুবোধ বাবু তাদের লোকের চোখে হেয় করবার জন্য তোমাকে দিয়ে এ সব করিয়েছে। যার জন্য তোমার নামের পাশে ব্রেকেটে জমাদার লিখে দিয়েছে। এর সোজা মানে–দেখো একটা জমাদার কেমন লিখেছে আর মাষ্টাররা বা কি লিখেছে। আমার দিকে কিছুক্ষণ অপলক তাকিয়ে ফের বলেন উনি তুমি ধরা পড়ে গেছো।
-কী?
–তুমি রীতিমত পড়াশোনা জানা ছেলে। আমার ধারণায় কমপক্ষে মাধ্যমিক এবং অবশ্যই বামপন্থী রাজনীতির সাথে যুক্ত। তোমার লেখা পড়লেই পরিষ্কার সেটা বুঝতে কারও অসুবিধা হবার কথা নয়।
দিন কয়েক পরে ডাক এল হেডমাষ্টারের কাছ থেকে। সবদিন বিনম্রতা সহকারে দাঁড়িয়ে থাকি আজ বসতে চেয়ার দিলেন–দাঁড়িয়ে কেন বসো বসো। আরে তুমি তো বিরাট গুণী মানুষ হে। তুমি কি অসাধারণ গল্প লিখতে পারো। সত্যি বলতে কি আমি তো গল্পটা পড়ে একেবারে থ হয়ে গেছি। গল্পের ওই জায়গাটা পড়বার সময় আমার গায়ে তো কটা দিচ্ছিল। যখন মৃত্যু শয্যায় শুয়ে মাষ্টার মশাই ছাত্রদের বলছেন–তোমরা শিক্ষিত হও।সচেতন হও। শিক্ষা আনে চেতনা, চেতনা ঘটায় বিপ্লব। তোমাদের জীবনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসুক। তোমরা পরিবর্তিত হলেই সমাজে পরিবর্তন আসবে।
চোখের চশমা মুছে, হাতের পেনটা টেবিলে ঠুকে আবার বলেন তিনি–আমার একটা ভীষণ অহংকার ছিল যে আমি মানুষ চিনতে কখনও ভুল করি না। সে অহংকার আজ আমার চূর্ণ হয়ে গেছে। যেদিন তুমি প্রথম আমার কাছে এলে, সত্যি বলছি তোমাকে দেখে আমি একদম চিনতে পারিনি। তোমার চেহারা পোষাক এসব দেখে আমি একজন সত্যিকারের জমাদার ভেবেছিলাম। আমার চোখকে যে ফঁকি দিতে পারে স্বীকার করে নিতেই হবে সে অসাধারণ। এক গেলাস জল খেয়ে আবার বলেন তিনি–আমার বাবাও ছিলেন একজন বিপ্লবী। মাষ্টারদার সাথে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনে তিনি অংশ নিয়েছিলেন। উনি জালালাবাদ পাহাড় থেকে পালিয়ে এসে হুগলি নদীতে মাঝির ছদ্মবেশে লুকিয়ে ছিলেন। কেউ ওনাকে চিনতে পারেনি। শুনেছি একবার নাকি ওনার নৌকায় সেই দারোগা সওয়ার হয়েছিল যে বাবাকেই খুঁজে বেড়াচ্ছে। গলা একটু ভার ভার করে কথার মালা গেথে চলেন তিনি, আমি জানি আদর্শের প্রতি গভীর অনুরাগ থাকলে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য সে সব কিছু করতে পারে। তোমাকে দেখে বলতে হচ্ছে–যে দল তোমাদের মত একনিষ্ট কর্মী তৈরি করতে পেরেছে তাদের অগ্রগতি কেউ রোধ করতে পারবে না। আমাদের দলের ছেলেগুলোকে দেখো–পায়খানা পরিষ্কার তো বহুদূরের কথা, পোষ্টার মারতেও লজ্জা পায়। এই একটা দিকে আমরা তোমাদের কাছে হেরে যাচ্ছি।
