বলেন সুবোধ দা–তোকে তিন মাস ক্যাজুয়াল থাকতে হবে। তখন মাইনে একটু কম পাবি। একবার পার্মানেন্ট হয়ে গেলে মাইনে হবে সাড়ে সাতশো। সি.এল.মেডিকেল লিভ, পি.এফ, বোনাস, প্রাচুইটি, পেনশন সব পাবি। ধীরে ধীরে তিনি সেইশত বছরের প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গুপ্ত ইতিহাস ব্যাখ্যা করেন। এখানে বিশাল বিশাল বিল্ডিং আছে। শিক্ষক অশিক্ষক প্রচুর কর্মচারী আছে। প্রচুর ছাত্র আছে। সব আছে, যা যা একটা মহা বিদ্যালয়ে থাকা দরকার। শুধু নেই শিক্ষার পরিবেশ। স্কুলের শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীরা সব পরস্পর বিরোধী দুটি রাজনৈতিক দলের সদস্য সমর্থক। যে দল দুটোর মধ্যে নীতি এবং সিদ্ধান্তের সঠিক বেঠিক নির্ণয় হয় পাড়ায় পাড়ায় বোমা পাইপগানের মাধ্যমে। রোজই খবরের কাগজের পাতা জুড়ে থাকে দু দলের হতাহতের খবর। বাইরের সেই লড়াই এই সারস্বত অঙ্গনকে কুস্তির আখাড়া বানিয়ে ছেড়েছে। এখন পড়াশোনা গেছে মায়ের ভোগে। কোক পানি দেবে পাঁচ ঘণ্টা ধরে চলে তারই প্যাঁচ পয়জার।
বলেন সুবোধদা–স্কুলে সর্বমোট এখন বত্রিশ জন স্টাফ। ষোলজন আমাদের পনের জন ওদের দলের। একজন না আমাদের না ওদের। সে যেদিকে লাভ দেখে সেদিকে ঝুঁকে যায়। সে আমাদের দিকে না এলে বিশেষ সমস্যা হয় না, সমস্যা হয় ওদের দিকে চলে গেলে। দু দিকের লোক সংখ্যা তখন সমান সমান। তোকে অনেক দিন ধরে চিনি। বিশ্বাস করি, তুই আর যা করিস ভোটাভুটির সময় কোনদিনই ওদের দিকে যেতে পারবি না। তোর সমর্থন বামপন্থীদের পক্ষেই থাকবে। তোকে চাকরিটা পাইয়ে দিতে পারলে সেটা হবে আমাদের পক্ষে সবচেয়ে বড় লাভ। তখন আমরা সতের জন হয়ে যাবে। এরপর স্কুলের যে কোন বিষয়ে গরিষ্ঠতার প্রমাণ দিতে আর আমাদের কোন অসুবিধা হবে না।
দু তিনদিন পরে উনি আমাকে অন্য একজন মাষ্টার যিনি নাকি একটি সুবিধাভোগী চরিত্রের লোক সেই রথীন বাবুর সঙ্গে হেডমাষ্টারের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। সুবোধদা নিজে নিয়ে গেলে হেডমাষ্টার আমাকে বুঝে যাবে বামপন্থী বলে তখন আর নিয়োগ না-ও করতে পারে। সতর্কতার কারণ সেটাই। একবার উঁচ হয়ে ঢুকে যেতে পারলে পরে স্বরূপ ধরা যাবে। বলে দিলেন সুবোধ দা–ঢুকে পড়বার পর তোর প্রথম কাজ হচ্ছে হেড মাষ্টারকে সন্তুষ্ট রেখে চলা। যদি দরকার মনে করিস আমাদের বিরুদ্ধেও একটা দুটো কথা বলে দিবি। এটা হচ্ছে একটা কৌশল। মনে রাখিস, তোর ভবিষ্যৎ হেড মাষ্টারের হাতে। নিয়মানুসারে পরিচালন সমিতির কাছে সে-ই তোর নাম প্রস্তাব করতে পারে। অন্য কারও সে অধিকার নেই। যেই সে তোর নাম প্রস্তাব করে দেবে, পরিচালন সমিতি অনুমোদন দিয়ে দেবে। পরিচালন সমিতির সেক্রেটারি আমাদের লোক। তোর বিষয়ে যা যা বলার আমি তাকে সব বলে ঠিক করে রাখব।
বিশেষ কোন অসুবিধা হয়নি। রথীনবাবু আমাকে হেডমাষ্টারের সামনে নিয়ে যাবার পর আমি কাজটা পেয়ে গেলাম। এ তো এমন কিছু আহামরি কাজ নয়। তা ছাড়া ওনাদের তখন একজন জমাদারের খুবই দরকার ছিল। জমাদার বিহনে স্কুলের চৌহদ্দির মধ্যে জমা হয়ে আছে স্তূপাকার জঞ্জাল। পায়খানা প্রস্রাবখানার অবস্থা ভয়াবহ যেন নরক তুল্য, পুঁতিগন্ধময়। কলতলায় জল জমে জমে শ্যাওলায় সবুজ। যে কোন সময়ে যে কেউ পা পিছলে দুর্ঘটনায় পড়তে পারে। এমন বিপন্ন সময়ে আমাকে ফিরিয়ে দেবার প্রশ্নই ওঠে না। পরের দিন থেকে আমি ঝাটা বালতি অ্যাসিড ফিনাইল নিয়ে নেমে পড়লাম সেই সৃষ্টির উন্মেষক্ষণ থেকে স্তূপাকার হয়ে ওঠা মল, বিষ্ঠা পায়খানা, ভেদ দাস্ত গু, বাহ্যে, নিহারা, উবদ্ধ, টাট্টি, নাদ, নাদি, শমল, শকৃৎ, উচ্চার–আদির টিবি পাহাড় পর্বতের মাঝখানে। যে সব ঢিবি পাহাড় আবার কালের করাল থাবায় কিছু ধ্বসে গলে পচে হেজে মজে নদী নালা ডোবা পুকুরে পরিণত। সেই জলে নালা ডোবায় জন্ম নিয়েছে লক্ষ কোটি সাদা সাদা প্রাণ। প্রাণময় পৃথিবীর ক্ষুদ্র সন্তান। যারা দলে দলে জননী জন্মভূমি পরিত্যাগ করে পরিব্রাজকের মত রওনা দিয়েছে বিশ্ব পরিক্রমায়।কলঘর, জল নিকাশিনালা পেরিয়ে পৌঁছে গেছে সিঁড়ির তলে, বারান্দায়, ক্লাশরুমে, অফিসে। সময়টা বর্ষাকাল বলে তাদের বিচরণ অবাধ এবং অনুকুল। ছাত্র এবং শিক্ষকদের জুতোয় পরিবহন হচ্ছে এইসব বিষ্টাকীট। এই পুঁতিগন্ধময় পুন্নাম নরককে পরিচ্ছন্ন–শিশুদের বাসযোগ্য করে গড়ে তোলার মহান দায়িত্ব আজ সমর্পিত হয়েছে আমার কাঁধে। এর জন্য প্রতিমাসে এখন আমার মাইনে মিলবে-দুশো টাকা, পার্মানেন্ট হলে গেলে সাড়ে সাতশো।
মনকে বোঝাই, মনরে, কোন কাজ নেয় যে সৈনিক রণাঙ্গনে বসে রাইফেল চালায় আর ঘরে বসে যে তার জন্য পুই চচ্চড়ি রাধে কেউ কারও চেয়ে কম বা ছোট নয়। ক্লাশরুমে যে মাষ্টার বেত চালায়, আর যে জমাদার পায়খানায় ঝাটা চালায়–সমাজে সবাই সমান।সবাইমহান। সবার সম্মিলিত প্রয়াসেই মানুষেরা মানুষ থেকে শিক্ষিত হয়। গটগট করে বিদ্বান লোকের মত কথা বলে। কাজেই কোন কাজই ফ্যালনা নয়। কাজকে ভালোবাসতে শেখো। চালাও ঝাটা। তুমি তো মহাত্মা গান্ধির জীবনী পড়েছ। উনিও তো পায়খানা পরিষ্কার করতেন। তবে?
দিন গোনা শুরু হয়ে গেল আমার। তিনমাস, মানে নব্বই দিন। তারপরই ভাগ্য ফিরে যাবে আমার।মিলবে খেয়ে পড়ে বাঁচবার মত বেতন। আটঘন্টা কাজের পরে ষোলঘন্টা মিলবে নিশ্চিন্তে লেখার অবসর।নাকে গামছা বেঁধে হাতে আঁটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ি মল মূত্রের মহা সমুদ্রে। হামা দিই, হাটি, সাঁতারকাটি। এইভাবে তিনমাস পেরিয়ে ছয়মাস তারপর নয় মাস শেষে বছর ঘুরে গেল। প্রতি মাসে পরিচালন সমিতির বৈঠক বসে, বহু কথা হয়। শুধু হয়না আমার কথা। প্রতি বৈঠকের আগে হেডস্যার আমাকে বলেন–এবার তোমার ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলব এবং প্রতিবারই ভুলে যান। আমার ব্যাপারটা তো তুচ্ছ একটা ব্যাপার, বড় লোকদের কী করে মনে থাকে?
