এরপর চিঠি লেটার বক্সে ফেলে কখন ডাক আসে সেই অপেক্ষায় বসে থাকি। আমার যে জীবনচর্চা তাতে কোথাও কোনদিন কোন বুদ্ধিবৃত্তি চালাকি চাতুরির প্রকাশ-বিকাশ ছিল না। সব অতি মোটা দাগের। সেদিও আমার সেই বোকামো করা হয়ে গেছে। এই চিঠির বাকসো শুধুমাত্র জেলবন্দীদের জন্য, অফিসারদের জন্য নয়। এই বাক্সে যদি কেউ জেলারবাবুর নামে চিঠি ফেলে যায় বুঝতে হবে সে শত্রুজেজাবাবু অপমান করঙ্গোয়। আর না হয় ঘনিষ্ট কোন বন্ধু সে রসিকতা করেছে। আর তা নাহলে বোকা বুন্ধু হাঁদারাম। আমি কী, তা আমি চিঠি ফেলে বলে দিয়েছি।
চিঠি একজন নিয়ে পৌঁছে দিয়েছে ডেপুটি জেলারের টেবিলে। তিনি চিঠি দেখে একে একে বন্দীদের ডাকতে পাঠাবেন। হঠাৎ তিনি জেলার বাবুর নাম আসামির চিঠির মধ্যে দেখে চমকে উঠলেন। নিচু গলায় সহকর্মীদের সাথে একটু রসিকতাও করলেন সম্ভবতঃ। তারপর এক সেপাই পাঠিয়ে সোজা আমাকে ডেকে নিয়ে গেলেন অফিসে। সেখানে জমাদার, কয়েকজন সেপাই, এক দুজন শিক্ষিত—দীর্ঘদিনের বন্দী, অফিস কর্মী বসে আছে। সবারই চোখ হাসছে কিন্তু মুখ গম্ভীর।
আমি তখনো জানি না আমাকে নিয়ে একটা রসিকতা হবে।
বলেন ডেপুটি জেলার–এই চিঠি তোমার?
বলি–হ্যাঁ স্যার।
–কী কাজকর্ম করা হয়?
–আজ্ঞে তেমন কিছু না। যখন যা পাই তখন তা করি।
–কোন মানুষকে কোনদিন মেরেছো?
–আজ্ঞে এ সব কথা কেন!
–আমি বলতে চাইছি তোমার কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে কী না।
–বিনীত গলায় মাথা নিচু করে জানাই–আছে।
–গুড। বলেন তিনি “যে কোনো কাজে সেইসব লোকই অগ্রাধিকার পায় যাদের এক্সপিরিয়েন্স থাকে। তা কী ভাবে মেরেছো? না না কোন ভয় নেই। যাদের দেখছো সব ওই কাজ একটা দুটো করেই এখানে এসেছে।”ওনার স্বরে একটা যেন অবিশ্বাসের আভাস টের পাই। তিনি ঠিক আমার কথা সত্য বলে মানতে পারছেন না।
বলি–আমি তো বলছি আমার অভ্যেস আছে, আমাকে সুযোগ দিয়ে দেখুন, ঠিক পারব। ওদের মারতে আমার হাত পা বুক কাঁপবে না। সত্যি বলছি।
একটু থেমে সবার দিকে চোখ ঘুরিয়ে আবার বলেন তিনি-আমি মেরেছি আমি পারব এসব কোন কথা নয়, তোমাকে পরিষ্কার করে বলতে হবে ফাঁসি দিয়ে কাউকে মেরেছো কী, না! মারলে কবে কোথায় কাকে।
বলি–না স্যার ফাঁসি দিয়ে কাউকে মারিনি। শুধু একজনকে গলায় গামছা পেঁচিয়ে টেনেছিলাম। আর একটু হলে মরে যেত।
–ওটা পুরো করতে হবে। ফুল হ্যাং। পারবে? হাত পাকিয়ে এসো, তখন বিবেচনা করা হবে তোমার আবেদন বিষয়ে।
আর কোন কথা নেই। সব কথা শেষ। যখন আমি জেল গেট থেকে বাইরে বের হচ্ছি পিছনে টের পাই তুমুল হাসির রোল। ওরা হাসছে আমাকে নিয়ে। আমি একটা হাসির খোরাক হয়ে গেছি সবার কাছে।
এখন আমার কাছে কোন পয়সা নেই। যে দু টাকা ছিল চিঠি লিখতে চলে গেছে। তাই হাঁটা দিই সামনের দিকে। প্রেসিডেন্সি জেল থেকে যাদবপুর মাইল দশেক পথ।
কালীঘাট ব্রিজ থেকে নেমে সবে বাঁদিকে বেঁকেছি দেখা হয়ে গেল শ্যামা কালোনির সুবোধ চক্রবর্তীর সাথে। উনি শিক্ষক সেটা জানতাম, জানতাম না ওনার স্কুলটা এখানে। তিনি অনেকদিন পরে আমাকে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন-কেমন আছিস? আর যে দেখি না? বই টইও আর দিসটিস না! লেখালেখিটা আছে, না গেছে?
এতদিন দেখা না হবার কারণ বলি তাকে। বলি–বিয়ে করেছি, একটা মেয়ে হয়েছে। আর আমার কোন কাজকর্ম নেই।”কালি কলম মন, লেখে তিন জন”মনটা এখন বিক্ষিপ্ত। এই অবস্থায় লেখাপড়া কি করে হবে! শেষে তাকে এ-ও বলি, যদি একটা বাধা ধরা কোন কাজ পাই, দানাপানির সমস্যা যদি মেটে তবে আবার লেখালেখি হবে। না হলে আর পারা যাবে না।
বলেন তিনি কি কাজ করবি বলতো! আজকাল কাজকর্ম পাওয়া খুবই…..। তার কথা শেষ করার আগে বলি আমি আমার কোন বাছ বিচার নেই। ধরাবাধা যে কাজ পাবো তাই করব। সে যদি মেথর জমাদারের কাজও হয় তাই সই। শুধু দুবেলা খেতে পারলেই হল। ওই চিন্তা দুর হলেই নিশ্চিন্তে বসে লিখতে পারব। আর আমি যদি লিখতে পারি, কোন নিন্দা ঘৃণা নোংরা ঘাটার কষ্টও আমাকে কষ্ট দিতে পারবে না। এখন আমার সবচেয়ে বড় কষ্ট যে লিখতে পারছি না।
কিছুক্ষণ ভেবে শেষে বলেন তিনি–আমি তোকে একটা চাকরি দিতে পারি। যদি সত্যি সত্যি তুই করতে রাজি থাকিস।…. সরকারি!
–চাকরি! কী চাকরি?
–যা তুই বললি! আমার দিকে তাকিয়ে গলার স্বরে খানিকটা কুণ্ঠা মিশিয়ে বলেন তিনি–তুই বললি আমি বললাম। আমার স্কুলে ওই পোষ্টে একজন লোক লাগবে। যদি করিস লাগিয়ে দিতে পারি।
এটা সেই সময় যখন মেথর জমাদারের শোভন নাম–সাফাই কর্মী হয়নি। তখনও কলিকাতা কর্পোরেশনের সাফাই কর্মী হবার জন্যে দলে দলে বামুন কায়েত বদ্যিদের বেকার ছেলেগুলো লাইন দিয়ে দাঁড়ায়নি। তখনও মেথর ঝাড়ুদার সমাজের চোখে পূর্ণ মানুষ নয়। যাদবপুর টিবি হাসপাতালের বড় গেটের সামনে কালির চা দোকানে ঢোকবার অনুমতি পায়নি। বাইরে বসে ভঁড়ে চা খায়। আমি জানি কি অপমানিত সে জীবন! তবু বলি–করব ওই কাজ।
–আর একবার ভেবে দ্যাখ। বলেন সুবোধ চক্রবর্তী।
ভাববার মত সময় আমার হাতে নেই। একটা করে দিন যাচ্ছে আর অভাবের হামুখ একটু একটু প্রশস্ত হচ্ছে। এর থেকে নিষ্কৃতি চাই। আর নির্ভাবনায় বসে লিখে যেতে চাই। যদি কোনদিন কোন উল্লেখযোগ্য রচনা তৈরি করতে পারি তখন কেউ মনে রাখবে না আমি কী ছিলাম।
