আমার তখন ধারণা হয় যে ওই পিতা এবং পুত্রকে নিশ্চয় তার উকিল আইনের এসব গূঢ় তত্ত্ব বুঝিয়ে বলেছে। আর তাদের পক্ষের কেউ গিয়ে নাটা মল্লিকের সাথে দরদাম করে নিয়েছে। এক দু বছর অসুস্থতার মজুরি। নাটা মল্লিক কোন টাকা ছুঁলে শরীর জ্বলে এমন রামপাঠা” তো নয়, সে এক জল্লাদ যে টাকার জন্য মানুষ মারে। যদি মানুষ না মেরেই দুগুণ চারগুণ বেশি টাকা পেয়ে যায়, হাসপাতালের বেডে গিয়ে শুয়ে পড়তে তার অসুবিধা কোথায়?
আর আমাদের দেশের বেশিরভাগ ডাক্তার, যারা মানুষের কিডনি ধোঁকা দিয়ে বের করে নিয়ে বেঁচে দেয়, সে যদি বেশ কিছু টাকার লোভে নাটাকে এটা সেটা পরীক্ষার পর বলে দেয় হার্ট খুব খারাপ, বিশ্রাম এবং চিকিৎসা দরকার, তাতে অবাক হবার কিছু নেই।
পশ্চিমবঙ্গের একমাত্র ফঁসুড়ে নাটা মল্লিক, সে যদি ফাঁসি না দিতে পারে, কঁসির আসামির ফাঁসি হবে কী করে? মানুষ মারা তো কোন সোজা কাজ নয়। এমনিতে ওই বাপ ছেলের বছর খানেক কি বছর দেড়েক জেল বাস হয়ে গেছে। আর একটু সময় টালবাহানায় কাটিয়ে দিতে পারলেই ফাঁসি রদ হয়ে যাবে। একবার যদি যাবজ্জীবন সাজা হয়ে যায় যা মোটামুটি ভাবে বিশ বছর, তাকেও কমিয়ে আনবার অনেক উপায় আছে। এক তো চার রবি দুই শনি–এমনিতে মাসে ছয়দিন ছুটি। তার মানে চব্বিশ দিনে মাস। তার উপর বন্দীর ভালো আচরণের জন্য বড় জমাদার একদিন, জেলার চারদিন, জেল সুপার সাতদিন সাজা কমাতে পারে। একে বলে রেমিশন। আবার যদি কোনদিন কারামন্ত্রী জেল ভ্রমণে আসেন, একমাস করে রেমিশন, স্বাধীনতা দিবস, গান্ধীজির জন্মদিন সহ সরকারি যে সব ছুটি, এসবও আছে।
তবে সবচেয়ে যাতে বেশি সাজা কমে সেটা হল-রক্তদান করে। প্রথমবার রক্তদান করলে কুড়িদিন, তারপরের বার বাইশদিন তারপরে আবার দিলে চব্বিশদিন এভাবে প্রতিবার দুদিন করে ছুটি বেড়ে যাবে। এখানে একটা মজা আছে–জেলে কিছু বন্দী থাকে যাদের জেলের বাইরে তেমন অর্থবান আত্মীয়-স্বজন কেউ নেই। এদের জেলখানায় খুব কষ্ট। তারা বিড়ি মুড়ি চিড়ে গুড় লুঙ্গি এই সব কেনার জন্য রক্ত বিক্রি করে। তখন সেই গরিব জেলবন্দীর সাথে পয়সাঅলা কোন বন্দী চুক্তি করে। তুমি আমার নামে আমার কেস টিকিটে রক্ত দেবে। যা তোমার দরকার সেই মাল আমি এনে দেব। এই ভাবে রামের নামে শ্যাম রক্ত দেয়। রামের সাজা কমে আর শ্যাম পেয়ে যায় কিছু বাড়তি টাকা। কিছু জেলের ডাক্তারও পেয়ে থাকে। আর রামবাবুর প্রতি দুমাস বারোদিন পরে পরে একবার করে রক্তদান কার্যক্রম চলতে থাকে। সাজা কমতে থাকে।
আমার তখন মনে হয়–নাটা হাসপাতালে গেছে আর কারা কর্তৃপক্ষ একটা প্রেস বিজ্ঞপ্তি জারি করে দায়মুক্ত হয়ে বস্তে আছেআইন ফঁক ফোকর খুঁজে একটা কোন ষড়যন্ত্র চলছে শয়তানগুলোকে বাঁচিয়ে দেবার জন্য। এটা হতে দেওয়া যাবে না। ফঁসুড়ে নেই, এই অজুহাতে বদমাশগুলোকে ছেড়ে দেওয়া অন্যায় হবে। আর কেউ যদি না দেয় ও দুটোকে আমি ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেব।
আমি এক সময় নকশালদের সঙ্গে ছিলাম। “নকশাল” ছিলাম না। নকশাল হওয়া অত সহজ না যে, যে কেউ তা হয়ে যাবে। মানুষকে যে গভীর ভাবে ভালোবেসে নিজের জীবন দিতে পারে সে-ই নকশাল। যে শুধু মানুষ মারার নেশায় মানুষ মারে সে আর যাই হোক, নকশাল নয়। এটা একটা বিপ্লবীর সমার্থক শব্দ। তবে সেই সময় একটা কথা শুনেছিলাম যে কমিউনিষ্ট শ্রেণি শত্রুর রক্তে হাত রাঙায়নি সে কমিউনিষ্টই নয়।
এখন আমার নিজস্ব বিশ্লেষণ বলছে, ওই বাপ আর ছেলে অবশ্যই শ্রেণি শত্রু। অন্ততঃ পক্ষে এদের মেরে পুরো না হোক কিছুটা কমিউনিষ্ট নিশ্চয় হতে পারি এবং ওই দিশায় এক পা এগিয়ে থাকা যায়।
তাই আমি সেই দুপুরে হাঁটা দিলাম জেলগেটের দিকে। যখন সেই আলিপুর প্রেসিডেন্সি জেলের গেটে গিয়ে পৌঁছালাম তখন জেলবন্দী মানুষের আত্মীয় বন্ধুরা সব সাক্ষাৎকার–যাকে জেলের ভাষায় বলে ইন্টারভিউ-তা করতে আসা শুরু করেছে। গেটের সামনে একটা বড় লেটার বক্স, যে যার সাথে দেখা করতে ইচ্ছুক, নাম, বাপের নাম, ঠিকানা লিখে সেই বাক্সে ফেলছে।
ওখানে একজন লোক বসে আছে। যে পয়সা পেলে চিঠি লিখে দেয়। যারা নিরক্ষর একে দিয়ে চিঠি লেখায়। আমি এখন আর নিরক্ষর নই, লিখতে পারি। কিন্তু আমার কাছে কাগজ কলম নেই। তাই তাকে বলি আমাকে কাগজ কলম দাও, আমি লিখে নেব।
বলে সে–“আমি লিখি কী তুমি লেখ দু টাকা লাগবে”। কোন উপায় নেই তাই পকেটের শেষ সম্বল দুটাকা দিয়ে কাগজ কলম নিয়ে সাহিত্যের ভাষায় জেলার বাবুর নামে একটা লম্বা চিঠি লিখে ফেলি। ঠিক কী লিখেছিলাম এখন আর মনে নেই তবে এইটুকু মনে আছে–
মাননীয় জেলারবাবু
আজ সংবাদপত্র মারফত অবগত হলাম যে, জেলখানার দুই কুখ্যাত অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করবার জন্য কোন জল্লাদ পাওয়া যাচ্ছেনা। আমি মনে করি এই ধরনের ঘৃণ্য অপরাধীর একদিনও পৃথিবীতে বেঁচে থাকবার কোন অধিকার নেই। যে বাতাসে এদের নিঃশ্বাস পড়বে সে বাতাস বিষাক্ত হয়ে যাবে। যে মাটিকে এরা স্পর্শ করবে সে মাটি আর ফসল দেবে না রুক্ষ শুষ্ক বন্ধ্যা হয়ে যাবে।
তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দণ্ড কার্যকর করা হোক। আমি এই কাজে সহযোগিতা করতে সম্মত আছি। আমি সানন্দে ফাঁসিটি সম্পাদন করে দেব। আমাকে ওই কাজে নিয়োগ করলে, বাধিত থাকব….।
