সে যা হোক, থাকার সমস্যা তো মিটল এখন রোজগারের কি হবে? ওখানে তো ঠিকাদার হয়েছিলাম, এখানে কী হবো? আবার সেই রিকশাঅলা?
একদিন–সেদিনটা ছিল যাদবপুরবাসির কাছে একটা স্বাদ-গন্ধ-বর্ণ বৈচিত্র্যহীন একেবারে নিস্তরঙ্গ দিন। সেদিন কোথাও তেমন কোন কলরব কোলাহল তর্ক বিতর্ক উত্তপ্ত আলোচনা এসব কিছুই ছিল না। বিন্টুদার সেই চা দোকানে খদ্দের আসছিল চা খেয়ে চলে যাচ্ছিল। অন্যদিনের মতো চায়ের পেয়ালায় তুফান ছিল না।
বিল্টুদা এক অতি দরিদ্র দোকানদার। সেই পাঁচ দশ বছর আগে দোকান যেমন ছিল আজও তাই আছে। দোকানের মধ্যে সেই ময়লাতে পাতা নড়বড়ে একখানা চৌকি। যার একটা পায়া পূর্ণ করা হয়েছে থান ইট সাজিয়ে। যার উপর কিছু বয়েম-চায়ের গেলাস সাজানো। একপাশে একটা কয়লার উনুন, আর বিন্টুদার একটা বসার চেয়ার। সব কিছু সেই আগের মতোই। তবে ইদানীং বিল্টুদা তার দোকানে কটা দৈনিক পত্রিকাও রাখে। তার ছেলে পত্রিকার হকার হয়েছে। এখান থেকে সে সাইকেলে পত্রিকা নিয়ে বাড়ি বাড়ি দিতে যায়।
সেদিন আমি একটার পর একটা পত্রিকার পাতা উল্টাচ্ছিলাম। হঠাৎ আমার চোখ আটকে গেল একটা সংবাদে নাটা মল্লিক অসুস্থ। এই লোকটাকে আমি চিনি। এর এক মেয়ের বিয়ে হয়েছে যাদবপুর টিবি হাসপাতালে। সেখানে সে আসে। এ কোন কবি শিল্পী সাহিত্যিক নেতা অভিনেতা কিছুই নয়, একজন জল্লাদ। এর অসুস্থতার খবর একটা প্রথম শ্রেণির সংবাদপত্রে এত গুরুত্ব দিয়ে কেন ছেপেছে, কৌতূহলে সংবাদটার উপর ঝুঁকে পড়ি। লিখছে বিশেষ সংবাদদাতা কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গের একমাত্র ফঁসুড়ে নাটা মল্লিক সম্প্রতি গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাঁর হৃদযন্ত্রে সমস্যা দেখা দিয়েছে। ডাক্তারদের অভিমত এমতাবস্থায় তার পূর্ণ বিশ্রামের প্রয়োজন। এই কারণে আলিপুর কারা কর্তৃপক্ষ ভয়ানক অসুবিধার মধ্যে পড়েছেন। মৃত্যু দণ্ডাজ্ঞা প্রাপ্ত দুই বন্দীকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রাপ্য সাজাদানের ব্যাপারে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
আমি ওই দুই বন্দীকে চিনি জানি। এই শহর কলকাতার মধ্যে বিশাল ধনবান পিতা এবং পুত্র। এরা একটি বিশাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মালিক। বাপ আবার সাহিত্যিক। সে তার লেখার জন্য রবীন্দ্র পুরস্কারও পেয়ে বসে আছে। এই স্বনামধন্য পিতা এবং পুত্র একটি অতি ঘৃণীত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করার অপরাধে কোর্টের বিচারে মৃত্যুদণ্ডের সাজা পেয়েছে। যে হত্যাকাণ্ড নিয়ে সে সময় সারা দেশ তোলপাড় হয়েছিল। সবাই ছিঃ ছিঃ করেছিল।
বেশ কয়েক বছর ধরে এই মামলা চলে। সাক্ষী সাবুদদের জেরা করে সে সব তথ্য বের হয় তাতে জানা যায় এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে আছে বাংলা সিনেমা জগতের এক লাস্যময়ী শরীর সর্বস্ব নায়িকা। সেই নায়িকার শরীরী প্রেমে পাগল হয়ে পুত্র তার স্ত্রীকে নিষ্ঠুর ভাবে হত্যা করে প্রেমের প্রতিবন্ধকতা থেকে মুক্তি পেতে চায়। বাপ সহযোগিতা করে লাশ লুকানো এবং প্রমাণ লোপাটের।
লোকগুলোর সাজা হয়েছে জর্জকোটে। এরপর তারা হাই কোর্ট এবং তার পরে সুপ্রীম কোর্টে আপিল করবে। যতক্ষণ তারা “ন্যায় বিচার”, অর্থাৎ ছাড়া না পাচ্ছে–এটাই তাদের কাছে ন্যায়, ততক্ষণ তারা একটার পর একটা কোর্টের দরজার কড়া নাড়বে। টাকার কুমির এরা, বড় বড় ব্যারিস্টার দেবে, আরো কতভাবে টাকা খরচ করে রক্ষা পাবার চেষ্টা করবে আইনের থাবা থেকে। এবং শেষমেষ তারা সফলও হবে। এই দেশে কোন বড়লোক কখনো কোন অপরাধে জেলে থাকে না। সাজা ঘাটে না। টাকাই তাদের বেকসুর প্রমাণিত করে দেয়। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ–শঙ্কর গুহ নিয়োগী হত্যা মামলা। সেই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের খুনিরা সাজা পেল না।
তবে আমার তখন এতদূরের ব্যাপার স্যাপারহাইকোর্ট-সুপ্রীম কোর্ট এত কথা মাথায় ছিল। আমি জেলে ছিলাম। জেলখানার অফিসারদের খুব ভালোভাবে চিনি। তাই তৎক্ষণাৎ যা মনে এসেছিল তা হল–ওই দুই কুখ্যাত খুনি কারা কর্তৃপক্ষকে হাত করে ফেলেছে। পি.জি. হাসপাতালের ডাক্তার আর ফঁসুড়েনাটা মল্লিককেও কিনে নিয়েছে। সবাই মিলে তাই ওদের ফাঁসি যাওয়া থেকে বাঁচাবার একটা ষড়যন্ত্র সাজাচ্ছে। যার প্রথম ধাপ নাটার অসুস্থতা।
আমি জেলখানায় থাকতে শুনেছিলাম যে যদি কারো ফাঁসির হুকুম হয় সাজা ঘোষণার দু বছরের মধ্যে জেলকর্তৃপক্ষকে দণ্ড কার্যকর করে ফেলতে হবে। যদি কোন কারণে তা না করতে পারে, তাহলে মানবিক কারণে বন্দীর ফাসি মকুব হয়ে যাবে। যে মানুষের প্রতিটা দিন রাত মৃত্যু ভয় বুকে নিয়ে কাটাতে হয়েছে, তার যে কঠিন সাজা ভুগতে হয়েছে, এরপর এদেশের আইন আর তার প্রাণ কেড়ে নেবে না। ফাঁসির সাজা মকুব করে যাবজ্জীবন সাজা দেবে।
অবশ্য এটা ঠিক যে এই “মানবিক’আইনও সবার প্রতি সমান সদয় হয় না। এর জন্যও ধনবান হবার দরকার আছে। আইনকে “মানবিক” ন্যায় পরায়ণ আর “সুবিচার” বানাবার প্রতিটা ধাপে ধাপে প্রচুর টাকার খেলা চলে। যে তা না পারে চৌদ্দ বছর জেল, যা একটা যাবজ্জীবন সাজার সমতুল, এর মধ্যে আট বছর মাথার উপর ফাঁসির দড়ি ঝুলে থাকা, তারপরও কেউ কেউ ধনঞ্জয় হয়ে যাবে। সব অপরাধের চেয়ে যেটা তার সবচেয়ে বড় অপরাধ হয়ে দেখা দেবে সেটা হল দারিদ্র্য, অঢেল অর্থ খরচের অক্ষমতা।
