তখন চিবিয়ে চিবিয়ে আমাকে বলে কানা অজিত–তাহলে এখনও বিশ্বনাথ ওটা হাতে পায়নি।
বলি–না, পায়নি।
–টাকা নিয়ে গেলে পেয়ে যাবে!
–তা পেতে পারে। ওরা তো সুদাশের ঠেক জানে। গিয়ে নিয়ে আসতে কোন অসুবিধা নেই। এটা তো সুদাশের ব্যবসা।
–আমি যে তোমার কাছে এসেছিলাম কাউকে বোলো না। বলে কানা অজিত সেদিন চলে গেল। আর পরের দিন সন্ধ্যায় গুলি করে, চপার দিয়ে কুপিয়ে বিশ্বনাথকে তারই চোলাই ঠেকের সামনে খুন করে দিল। তখন সবে সন্ধ্যা নেমেছে। রাজডাঙা ব্রিজের উপর বসেছিলাম আমি আর বাপি নামের একটা ছেলে। এই বাপি পরবর্তী কালে নোনাডাঙ্গা আন্দোলনের এক বিশিষ্ট নেতা হয়ে উঠেছিল। কানা অজিত আমাদের সামনে দিয়ে হেঁটে বিশ্বনাথের মদের ঠেকে গেল, তাকে মেরে ফিরে এল আর চলে গেল আমাদের সামনে দিয়ে। মাত্র চব্বিশ ঘন্টা আগে আমাকে দেখে নেবে বলে ধমকে ছিল। চব্বিশ ঘন্টা পরে তাকেই দেখে নিল তার মামা।
বিশ্বনাথ তো মারা গেল, কিন্তু একা গেল না। তার পিছনে শুরু হয়ে গেল মৃত্যুর এক মিছিল। রামলাল বাজারের এপাশে লাল গেটে থাকত স্বপন নামে এক মাস্তান। তখন রুবি-গোলপার্ক অঞ্চলে প্রচুর জমি জায়গা বেচাকেনা হচ্ছে। চলছে ঠিকেদারি প্রোমোটারি সাপ্লাইয়ের রমরমা ব্যবসা। এ অঞ্চল যার অধিকারে থাকবে তারই পকেট ভারি হবে। এতকাল কানা অজিতের কারণে স্বপন এখানে নাক গলাবার সুযোগ পায়নি। এখন তার হাতে সুযোগ এল। কানা অজিত তখন পুলিশের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। পোত তারা দাদার বদলা নেবার জন্য ফুঁসছে। স্বপন পোতোকে ডেকে অর্থ অস্ত্র জনশক্তি দিল–মার শালা কানা অজিতকে। পোতো কানা অজিতের তো নাগাল পেল না। পেয়ে গেল বিশ্বনাথ মার্ডারে যুক্ত তার এক শাগরেদকে। গলার নলি কেটে তাকে বস্তায় ভরে ড্রেনে ফেলে দিল। এরপর কানা অজিত দলবল নিয়ে মেরে দিল পোতের দলের একজনকে।
এক সকালে ঘরে ঘুমাচ্ছি। সারারাতে অসহ্য গরমে চোখের পাতা এক করতে পারিনি হাত পাখা নাড়তে নাড়তে রাত কাবার। ভোরের দিকে চোখটা সবে লেগে এসেছে, হঠাৎ দরজায় জোর ধাক্কা। খোল দরজা। দরজা খুলে সারা শরীর কেঁপে গেল আমার। পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে দরজায়। তারা ঘরে ঢুকে আমাকে দেখল। আমার বউ বাচ্চা, চৌকির তলা সব দেখল। তারপর মাঝবয়সী এক অফিসার গর্জন করল তোদের রোজ এইভাবে বিরক্ত করব। একরাতও ঘুমাতে দেব না। যতক্ষণ না তোরা রিকশাঅলা মদনকে ধরিয়ে দিবি।
প্রথমে ভেবেছিলাম ওরা বোধ হয় আমাকেই খুঁজছে। পরে ভুল ভাঙল। আমি তো যাদবপুরের রিকশাওলা মদন। ওরা খুঁজছে কসবার রিকশাঅলা মদনকে। তখন আমার ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল।
সে যাই হোক, এর দিন সাতেক পরে আমি মার্ডার হয়ে গেলাম। কারা যেন আমার গলায় গামছায় ফাঁস দিয়ে মেরে বাইপাশে ফেলে এল। সে খবর পেয়ে যাদবপুর স্টেশন থেকে গণেশ গোপাল আমার বাসায় এল, সদ্য বিধবা আমার স্ত্রীকে সমবেদনা জানাবে বলে। এসে আমাকে ঘরে বসে তেজপাতা দেওয়া গুড়ের চা খেতে দেখে তারা তো ভীষণ অবাক কীরে দাদা তুই মারা যাসনি? তবে যে হোসেনপুরের নন্দু বলল রিকশাঅলা মদনকে মেরে বাইপাশে ফেলে দিয়েছে। তখন তাদের বলি–ও মদন কসবার।
মরা মানুষের কোন ভয় থাকে না। যত ভয় জীবিতের। আমার মনে তখন এক অন্য ভয় উঁকিঝুঁকি দিতে শুরু করেবঙ্গোমাথা ফাতারকিক নেই। সব যেন পাগলা কুকুরতুল্য হয়ে গেছে। পাগলা কুকুরের আয়ু মাত্র দশদিন। কিন্তু সেই দশ দিনের মধ্যে যাকে কামড়ায় সে-ও মরে যায়। যদি কোন সময় পোতোর হঠাৎ করে মনে পড়ে যায় এই সব খুনোখুনির আসল কারণ তো আমি। যদি আমি কানা অজিতের কানে রিভালবার বিষয়ক সংবাদটা না দিতাম বিশ্বনাথ মরত না। যদি কেউ পোতোকে সেটা বলে দেয়? তখন যদি পোতো মনে করে পাঁচ মাসে পাঁচটা যখন গেছে, আর একটা যাক! তখন আমার কী হবে? ওরা যদি বলে কয়ে আক্রমণ করে তখন একটা সামলে নেবার সুযোগ পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু তা তো করবে না। যদি হামলা করে তা হবে অতর্কিত এবং অসতর্ক সময়ে। নাহঃ, এ বিপদের ঝুঁকি নেওয়া ঠিক হবে না। এতে আমার পাবার কিছু নেই, তাহলে অজিতের দলে নাম লেখাতাম। তবে হারাবার অনেক কিছু আছে। আমার ঘর সংসার সব ভেসে যাবে। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম–এখান থেকে চলে যাব।
চলে যাব ভেবেছিলাম সকালে। আর দুপুরেই একটা ভ্যান রিকশা ডেকে সব মাল তুলে রওনা দিলাম যাদবপুরের দিকে এক নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে। রাত আসছে। এক অদৃশ্য আততায়ী ঘুরে বেড়াচ্ছে রাজডাঙায়। কে জানে সে এইরাতে আমার উপর হামলে পড়বে কী না! তার চেয়ে নিজের এলাকায় চলো। যেখানে বন্ধু চেনা শত্রু চেনা।
আমি ওখান থেকে চলে আসবার প্রায় একমাস পরে দশমীর দুর্গাপূজার দিন, দুপুরে কানা অজিত মার্ডার হয়ে যায়। এক চা দোকান থেকে তাকে ধরে পিটিয়ে মেরে পা ধরে সারা রাস্তাময় টেনেটেনে নিয়ে গিয়ে তার বাড়ির সামনে ফেলে দিয়ে আসে তার শত্রুপক্ষ। মোট ছয়টি মৃত্যুর মধ্য দিয়ে পরিসমাপ্তি ঘটে সেই ঘটনার।
যে ভ্যানে মালপত্র তুলেছি তাকে বলা আছে, আমার জন্য যা সময় নষ্ট হবে তার দাম আমি দিয়ে দেব। ভ্যান এনে দাঁড় করালাম সন্তোষপুর জোড়া ব্রিজের কাছে। এখানে তখন এত দালান কোঠা ছিল না। ছিল অগুনতি ঝুপড়ি। জোড়া ব্রিজের কাছে একটা রিকশা লাইন আছে। যার মধ্যে দুচার জন আমার চেনা। বললাম তাদের এখানে কোন বাড়িতে কী ঘর ভাড়া পাওয়া যাবে? সন্ধান জানা আছে? জানতাম পাওয়া যাবে। এক চেনা রিকশাঅলার নিজের বাড়িতে একখানা ঘর পেয়ে গেলাম মাসিক একশো টাকা ভাড়ায়। অন্য সময় হলে ভাড়া কম হোত। এখন ভ্যানের উপর মাল নিয়ে ঘর খুঁজছি ভাড়া তো একটু বেশি লাগবেই। তবু ভালো যে পাওয়া গেল, না হলে রেল স্টেশনে থাকতে হতো।
