সুদাশ আমার ঘরে পৌঁছে গেছে, সত্যি সত্যি তখন পোতো বিশ্বনাথ আশেপাশে পজিশন নিয়ে দাঁড়াতে পারেনি। তারা তো ঘড়ি দেখছে। সুদাশ বলেছে সাতটা সাড়ে সাতটায় আসবে। বাঙালীর টাইম! আটটার আগে কিছুতে আসবে না। সাতটা বাজতে দশ মিনিট আগে কোমরে ছুরিচাকু গুলো খুঁজে নিলেই চলবে।
আমি যে খাল পাড়ে থাকি পোতোদের ঘর ঠিক উল্টো দিকে। আমার ঘরে কে আসে কে যায় ওরা দেখতে পায়। কিন্তু এখানে আসতে হলে আসতে হবে অনেকটা ঘুরে একটা পোল পার হয়ে। যাতে মিনিট দশেক সময় লেগেই যায়। পোতা আজ একটু আগে ভাগে ঘুম থেকে উঠে খালপাড়ে দাঁড়িয়ে ব্রাশ করছিল আর লক্ষ্য রাখছিল আমার ঘরের দিকে। হঠাৎ তার চোখে পড়ে সুদাশ এসে গেছে। সুদাশ চালাক ছেলে, সে বালিগঞ্জ-কসবা থেকে সোজা পথে এখানে যেভাবে আসা যায় সে ভাবে আসেনি। এসেছে ঘুরপথে, যে পথে কেউ আসা যাওয়া করে না। আমি তার মুখে এখানে আসার কারণ শুনে যা বোঝবার তা বুঝে ফেলেছি। আমার সঙ্গে কোন আলোচনা না করে, সোজা সুদাশের সাথে দেখা করে, আমার নাম বলে ওকে মালসহ ডেকে নিয়ে আসা-এর পিছনে রহস্য আর চক্রান্তের গন্ধ পাই। তাই ওকে আর বসতে বলি না, চা খেতে বলি না, সৌজন্য দেখাইনা। বলি–পরে সব বলব। এখন যত তাড়াতাড়ি পারিস এখান থেকে পালিয়ে যা। ব্যাপার সুবিধার নয়। সে সেয়ানা ছেলে। আর দাঁড়ায় না। খালপাড়ের উত্তর মুখে পথ ধরে উধাও হয়ে যায়। নাটকটা শুরু হল এরপর যখন পোতা আর তার দাদা দুজনে আমার বাসার সামনে এসে দাঁড়াল। জানতে চায় পোতো-দাদা তোমার সেই বন্ধুটা কই? আমি অবাক হয়ে বলি কোন বন্ধু?
–যে মেড ইন চায়না বেচবে বলেছিল।
সে তো আসেনি। আমি ন্যাকা গলায় বলি–কেন আসবে ফালতু।
–একদম ঢপ দেবে না। যখন পোতো আমার কাছে কাজ করত এখন সেই আগের মত গলায় পালিশ আর নেই। তখন সে ছিল আমার কর্মচারী। এখন সে এলাকার নামী দাদার ভাই। আর আমি অন্য এলাকা থেকে তাদের এলাকায় বাস করা এক নিরীহ প্রজাতির জীব। বলে সে আমি নিজের চোখে তাকে তোমার এখানে আসতে দেখেছি। আমি সেই একই কথা আবার বলি–আমার এখানে কেন আসবে?
–আমি তাকে আসতে বলেছিলাম।
–কেন?
–ওই মালটা আমরা কিনবো।
–তোরা মাল কিনবি তা আমার বাসায় কেন আসবে! তোদের বাসায় যাবে!
আমিও তো আগুনখেলালো ছিলাম। যদি আমি এখনও আগের আমি থাকতাম, যদি এলাকাটা রাজডাঙা না হয়ে যাদবপুর স্টেশন এলাকা হতো, ওরা কী আমার সামনে দাঁড়াতে পারত? এতক্ষণে ফাটা নাক নিয়ে বসে পড়ত না? এখন আমার মাথাটাও গরম হয়ে যায়। বলি তোরা কিনবি না কাড়বি সে তোরা জানিস। এর মধ্যে আমাকে জড়ালি কেন? আমি ওসবের মধ্যে থাকতে রাজি নই, তাই আমি তাকে চলে যেতে বলেছি। ও তো কসবায় থাকে, যা সন্ধ্যায় গিয়ে মালটা কিনে নিয়ে আয়।
এখনকার কথা নয় এসব কথা। তখন দুহাজার টাকা অনেক টাকা। তার চেয়ে বড় কথা মেড় ইন চায়না। যা কোমরে রাখলে নিজেকে উচ্চশ্রেণির গুণ্ডা বলে বুকের ছাতি ফুলে ওঠে। এবার বিশ্বনাথের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে যায়। এমন সহজ শিকার হাতের নাগালে এসে ফসকে যাবে সেটা সে আশা করেনি। এবং এটা হয়েছে একমাত্র আমার অসহযোগিতার জন্যে। গরগর করে বলে সে-কাজটা তুমি ভালো করোনি। এর ফল পাবে। আমাদের সাথে গদ্দারি করে কী ভাবে তুমি এখানে থাকো আমি দেখছি। যদি ভালো চাও ওকে কোথায় লুকিয়ে রেখেছো বার করে নিয়ে এসো।
বিশ্বনাথের এদিন সময় খারাপ ছিল। যখন সে আমার উপর হম্বিতম্বি দেখাচ্ছিল সেটা দূর থেকে দেখছিল দুজন ছেলে। যারা কোন এক সময় বিশ্বনাথের হাতে মার খেয়েছিল। সেই রাগে বদলা নেবার বাসনায় এখন কানা অজিতের দলে গিয়ে ভিড়েছে। তবে এরা এখন পর্যন্ত কোন মাস্তান গুন্ডা নয়। সে হবে বিশ্বনাথকে মেরে। বলে দিয়েছে কানা অজিত–আমি আছি, ওকে মেরে হাত পা ভেঙে আমার কাছে নিয়ে আয়। ছেলে দুটোকে এদিকে আসতে দেখে পোতো আর বিশ্বনাথ সরে পড়ে। ওরা আমার কাছে জানতে চায়–কী ব্যাপার দাদা, ওরা এত তড়পাচ্ছিল কেন? পোত বিশ্বনাথ আমার উপর খেপে গেছে। ওরা যদি আমার উপর কিছু একটা করে তখন আমার লোকাল সাপোর্ট লাগবে। সেই কারণে ওদের কাছে সব খুলে বলি–দেখো ভাই, সুদাশ একটা ডেঞ্জারাস ছেলে। যদি আমার ঘরে তার কোন ক্ষতি হয় সে ভাববে এতে আমিও যুক্ত আছি। তখন সে কি আমাকে ছাড়বে? তোরা রিভালবার কিনবি কী কেড়ে নিবি অন্য জায়গায় গিয়ে কর না! কে বারণ করছে। শুধু আমাকে রেহাই দে। আমি একটা নিরীহ মানুষ। বউ বাচ্চা নিয়ে থাকি খেটে পিটে খাই। আমাকে বিপদে ফেলার কী দরকার!
আমার কথা শুনে তাদের চোখ বড় বড় হয়ে গেল! বিশ্বনাথ তাহলে অরজিনাল কিনছে! অংকটা অনেকটা এই রকম–লাদেনের হাতে পারমাণবিক বোমা মানে আমেরিকার বিপদ। তারপর তারা গিয়ে কানা অজিতের কানে কথাটা দেয়–খুব সাবধান। বিশ্বনাথ তলে তলে তৈরি হচ্ছে–অরজিনাল কিনছে। ওটা একবার হাতে এসে গেলে তোমার প্রাণ সংশয়। সেদিনইবিকালে কানা অজিত এল আমার কাছে। আর একবার আমাকে বলতে হল সম্পূর্ণ বিবরণ। মন দিয়ে সব শুনলো সে। রোগা, কালো পাঁচফুট উচ্চতার কানা অজিতের যে চোখটা ভালো সেই চোখটায় ফুটে উঠল সাপের মত শীতল দৃষ্টি। আমি ওই চোখ চিনি। এই কাহিনীর মধ্যে যে সব কথা কাহিনী আমি সচেতন ভাবে বর্জন করে গেছি, অকথিত সেই কাহিনীর পরতে পরতে এমন দৃষ্টি বেশ কজনার চোখে আমি দেখেছি। কেউ কেউ হয়ত আমার চোখেও দেখে থাকবে। তাই এখন আমার ভয় ভয় করে। বিশ্বনাথের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা হয়।
