এতগুলো মানুষের নানা রকম সমস্যা। সব একা আমার পক্ষে সামলানো মুশকিল বলে আমরা যে খালের পাড়ে থাকি তার উল্টো দিকের একটা ছেলেকে মুনশি রেখেছিলাম। সে আমার চেয়ে বয়সে ছোট কিন্তু লম্বা চওড়ায় বেশ বড়। নিগ্রোদের মতো দেখতে ওই ছেলেটা যে এই এলাকার এক গুন্ডা বিশ্বনাথের ছোটভাই সে তখন আমি জানতাম না। যখন জানলাম ভাবলাম, দাদা গুন্ডা তো ভাইয়ের কী দোষ! থাকুক যেমন আছে আমার কাছে।
“খোকাদা” তিনজন আছে সেই রকম কানা অজিতও দুজন। একজন থাকে বাঘাযতীন আর একজন এই রাজডাঙায়। রাজডাঙায় কানা অজিত বিশ্বনাথের মামা হয়। বিশ্বনাথ আগে কানা অজিতের গ্যাংয়ে ছিল। মামাভাগ্নে দুজনে মিলে এই এলাকায় যারা জমি কিনছে বাড়ি করছে সবাইকে ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করত। একবার সে বিশ্বনাথকে সাথে নিয়ে এক জমির ক্রেতাকে চমকানি দেয়-কুড়ি হাজার টাকা দিতে হবে। না হলে জমির দখল নিতে দেব না। ভদ্রলোক ভয় পান এবং একটা তারিখ দিয়ে বলেন, ওইদিনে আপনাদের টাকা দিয়ে দেওয়া হবে। তার আগে কানা অজিত অন্য একটা কেসে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে জেলে চলে যায়। সেই ফাঁকে ভদ্রলোকের কাছে থেকে বিশ্বনাথ টাকাটা তুলে একা ঝেপে দেয়। কিছুদিন পরে কানা অজীত জেল থেকে ফিরে এসে বিশ্বনাথের কাছে টাকার ভাগ চায়। কিন্তু বিশ্বনাথ দিতে পারে না। টাকা তো সে মদ-মেয়েতে উড়িয়ে দিয়েছে। ফলে দু জনে বিরোধ শুরু হয়। যা এখনও চলছে।
আমি তখন রাস্তার কাজ প্রায় শেষ করে এনেছি। হঠাৎ একদিন দেখা হয়ে যায় জেলের এক বন্ধু সুদাশের সাথে। ও কোথা থেকে কী ভাবে যেন অস্ত্র সংগ্রহ করে নিয়ে এসে সেগুলো বিক্রি করে। সেই কারণে জেলে ছিল। সে আমাকে জেলখানায় দেখেছে। তার দৃষ্টিভঙ্গিতে আমি আর যাই-ই হই “ভদ্দর লোক” কখনই নই। একটা দুটো একথা সে কথার পর দুম করে বলে সে–দোস্ত একখানা ভালো মাল এসেছে, মেড ইন চায়না। নেবে নাকি? ও কী করে জানবে যে আমি আর মা কালীর নয় মা সরস্বতীর ভক্ত হয়ে গেছি। আগে আমার কোমরে একটা চাকু গোঁজা থাকত, এখন পকেটে পেন থাকে। বলি আমি–নানা আমার আর এসব চাইনা। বিয়ে টিয়ে করে আমি সংসারি হয়ে গেছি।
আমার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল বিশ্বনাথের সেই ভাই যার নাম পোলতা। যাকে দেখে সুদাশ আমার এক সাগরেদ বলে ভেবে নিয়েছে। সে জিজ্ঞাসা করে–মালটার দাম কত? আমি চোখ টিপে সুদাশকে কিছু না বলার জন্য ইশারা করি। কিন্তু সে তা লক্ষ্য না করে বলে যায়–দুহাজার। বলে পোতো–আমার কাছে খদ্দের আছে। গড়গড় করে বলে দেয় সুদাশ-আমি কসবায় থাকি। বাড়ির ঠিকানা দিয়ে লাভ নেই বাড়িতে খুঁজলে আমাকে পাবে না। পুর্বাসা সিনেমা হলের সামনে যে চায়ের দোকান সন্ধ্যা বেলা কিছুক্ষণ সেখানে আমি বসি। খদ্দের থাকলে খবর দিও মাল নিয়ে এসে দিয়ে যাব।
আমি বিয়ে করেছি, আমার একটি মেয়ে হয়েছে শুনে বলে সুদাশ–আমি তোমার বাসায় যাব। বউদি আর মেয়েকে না দেখে ফিরব না। আমি তাকে তখন আর না বলতে পারি না। নিয়ে আসি বাসায়। কিছুক্ষণ গল্প করে এক কাপ চা খেয়ে সে বিল্টুদায় নিলে আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। এ সব লোকের সাথে আমার মিলতে মিশতে আর ইচ্ছা করে না। তবে রূঢ় ব্যবহার করে এদের রাগিয়ে দিতেও পারা যায় না। তাই মনের ভাব মনে গোপন রেখে মুখে হাসি ফুটিয়ে বলি আবার আসিস। অনু এসব মানুষ দুচোখে দেখতে পারে না। সে আমার দিকে কটমট করে তাকায়। এবং সে বা আমি না চাইলেও প্রায় দিন দশ বারো পরে, এক ভোর বেলায়–তখনও সূর্য ওঠেনি–সুদাশ এসে হাজির হল আমার বাসায়। ঘুম ভাঙিয়ে আমাকে ডেকে তুলে বলল-মাল নিয়ে এসেছি। শুনে তো আমার সারা গায়ে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর–মাল!
আমি জানতাম না আমাকে অন্ধকারে রেখে একটি গোপন ষড়যন্ত্র রচনা করা হয়েছে। সেদিন আমার বাসায় চা খেয়ে ফিরে গিয়ে পোড়োতার দাদা বিশ্বনাথকে সমস্ত বিষয়টা খুলে বলে। তখন দুভাই ঠিক করে মালটা ওরা কেড়ে নেবে। এ সব অস্ত্র কারও পৈতৃক হয় না। যখন যার হাতে থাকে তখন তার হুকুমে চলে। দেখি মালটা? সুদাশ সেটা দেখার জন্য বিশ্বনাথের হাতে দিলে ঘুরিয়ে যদি সুদাশের বুকে ঠেকিয়ে ধরে বলে–পালা। না হলে গুলি করব। এটা তার এলাকা। এখান থেকে না পালিয়ে গিয়ে আর কোন উপায় আছে? অন্যকোন এলাকা হলে সুদাশ এভাবে যেত কিনা সন্দেহ আছে। তবে এখানে আমি আছি সেই কারণে এমন নির্ভয়ে চলে এসেছে। আমাকে টোপ হিসাবে ব্যবহার করেছে পোতো বিশ্বনাথ। ওরা পূর্বাসা সিনেমা হলের সামনে সেই চায়ের দোকানে গিয়ে সুদাশকে বলেছে–মদনদা পাঠিয়েছে খবর দিয়ে। একটা খদ্দের আছে। কাল সকালে মালটা নিয়ে চলো। মদনদার ঘরে লেনদেন হয়ে যাবে।
যাদবপুর স্টেশনের গনেশ গোপাল আমাকে যে রূপে চেনে পোতো বিশ্বনাথ তো চেনে না। রাজডাঙায় আমি একজন ছাপোষা সংসারী মানুষ। এখানে এমন কোন পরিচয় আমি গড়িনি, যাতে উঠতি গুন্ডা বদমাশরা একটু সামঝে চলে। ওরা দুভাই ভেবে নিয়েছে আমার ঘর থেকে ওটা ছিনতাই করে নিলে আমি কি আর তাদের ঠেকাতে পারব! পারব না! এখানে আমি একা। আমার বউ বাচ্চা আছে ফলে এক দুর্বল মানুষ।
সুদাশ সেয়ানা ছেলে। সে পোতোকে কথা দিয়ে ছিল সকাল সাতটা সাড়ে সাতটায় আসবে। এসে গেছে দেড় ঘন্টা আগে। যদি পোত পথে বা আমার বাসায় কোন দুনাম্বারি করার মতলব এটেও থাকে এখনও প্রস্তুত হয়ে উঠতে পারেনি তারা। এটাই সুদাশের অংক। তাই ভোরবেলার আধো অন্ধকারে পৌঁছে গেছে বিশ্বস্ত মদনদার আস্তানায়। এবার যা পারে সে করুক। আমার কোন চিন্তা নেই।
