এক মুদি দোকানে মাসকাবারি মাল নিই। প্রথম মাসে তো দোকানদার কিছু টের পায়নি। মাল দিয়ে দিয়েছে। পরের মাসে বাকি শোধ না করায় শুরু হয়ে গেল তাগাদা। অনিতা–যাকে আমি ডাকি অনু বলে সে বিয়ের সময় তার মায়ের কাছ থেকে চারগাছা চুড়ি এক জোড়া দুল পেয়েছিল। আমি পেয়েছিলাম একটা আংটি একটা ঘড়ি, সে দিয়ে দুমাস চালানো গেল। এমন দিনে ভারত সুইটস হোমের আমার পরিচিত এক আবাসিক আমাকে একটা কাজ যোগাড় করে দিতে সক্ষম হল। উত্তর চব্বিশ পরগনার একস্থানে পশ্চিবঙ্গ সরকার বিশ্বব্যাঙ্কের আর্থিক সহযোগিতায় একটা কোলড স্টোরেজ তৈরি করছিল। আমি কাজ পেলাম সেখানে। পদটার নাম সাইড ইনচার্জ। সবাই বলে এ এমন একটা কাজ যে কাজ কিনা বেতনও লোকে পেলে লুফে নেয়। কী কাজ আমার? ট্রাক আসছে ইট বালি স্টোন চিপ নিয়ে। মালটা বুঝে নিয়ে চালান সই করে দেওয়া। সারাদিন মিস্ত্রিরা কাজ করছে তাদের কত বস্তা সিমেন্ট খরচ হল সে সব হিসেব রাখা। বিনা বেতনে কাজ করার সকল রহস্য লুকিয়ে আছে এই চালান সই আর সিমেন্ট খরচের খাতায়। আমার বেতন মাসে সাড়ে তিনশো। দিনের মজুরি বারো টাকারও কম। তাতে কী! একটা, মাত্র একটা বস্তা সিমেন্ট বেশি খরচ, স্টোন চিপসের লরি মাপে এক ইঞ্চি এদিক সেদিন একটা দুটো লেবারের বাড়তি হাজিরা যা কারও চোখে পড়ার নয়, এতেই দিন গেলে দুশোটাকা কোথাও যাবে না। কিন্তু আমি যে এক মদনা! যুধিষ্ঠিরের কুকুর আমাকে কামড়ে দিয়েছে। রক্তে সতোর ভাইরাস ঢুকে গেছে। গোটা কয়েক লেখা ছাপা হয়েছে অমনি নিজেকে এক মহান লেখক বলে ভাবা শুরু করে দিয়েছি। ছিঃ আমি না একজন স্রষ্টা, শিল্পী, সমাজ সচেতন মানুষ! যে সমার্জনী হাতে সমাজকে জঞ্জাল মুক্ত করতে বের হয়েছে। তার কী ওসব চুরি-চিটিংবাজি করা সাজে। ছিঃ!
এর উপর আছে অনু। আমাকে যদি কুকুরে কামড়ে থাকেতো ওকে বাঘে। সে নিজেকে একজন লেখকের স্ত্রী হিসাবে গর্ববোধ করে। স্কুলে মহাশ্বেতাদেবীর লেখা ঝান্সীর রাণী লক্ষ্মীবাই পড়েছে। আমি মহাশ্বেতা দেবীর স্নেহভাজন তাই তার চোখে বড়। তার সামনে কোন অন্যায় অনৈতিক কাজ করতে মনের সায় পাই না। তার চোখে ছোট হয়ে যেতে বিবেকের দংশন অনুভব করি। অনুকে সাথে নিয়ে আমি তখন খালপাড়ের ঘর তালা বন্ধ করে রেখে কাজের সাইডেই থাকি। আমাদের থাকার জন্য একখানা ঘর দেওয়া হয়েছে।
আমি সৎ থাকতে চাইলে মানুষ আমাকে সৎ থাকতে দেবে কেন? আমি লেখক বলে নয়, চাকরি পেয়েছি জেলখাটা অভ্যাস আছে বলে। যে জেলে যেতে ভয় পায় না তাকে দিয়ে অনেক কিছু করিয়ে নেওয়া চলে। এখানে অন্য কেউ নয় আমি যার অধীনে চাকরি করি সেই এ-ওয়ান গ্রেডের কন্ট্রাকটার সান্যাল বাবুই বলছেন চুরি করতে। বলেছেন আমি যত দক্ষতার সাথে ওটা করে যেতে পারব তার মুনাফা হবে। তার মুনাফা হলেই আমার চাকরির নিশ্চয়তা বাড়বে। তিনি রোজ রাত দেড়টা দুটোর সময় একখানা ম্যাটাডোর সাইডে পাঠিয়ে দেন। যাতে নিঃশব্দে আমাকে পঞ্চাশ বস্তা সিমেন্ট তুলে দিতে হয়। যা পরের দিনের খরচের খাতায় তুলে হিসেব সঠিক রাখা হবে।
যিনি আমাকে চাকরি দিয়েছেন একদিন বলি তাকে, এ আপনি কোথায় নিয়ে ফাঁসিয়ে দিলেন, চুরি করতে হচ্ছে আমাকে। বলেন তিনি–তুই কোথায় চুরি করছিস? তুই তো ডিউটি করছিস? ধর তুই যদি পুলিশ কী মিলিটারির চাকরি করতি, তোকে যদি তোর অফিসার কাউকে দেখিয়ে হুকুম দিত, গুলি কর, করতে হোত না? কোন মেয়েকে দেখিয়ে যদি বলত নকশাল রেপ কর–করতিস না? চাকরি বাঁচাবার জন্য লোকে খুন রেপ কত কইনা করে। কী করবি বল! যদি না পারিস ছেড়ে দে চাকরি।
কিছুদিন এভাবে সিমেন্ট পাচার হবার পর টের পেলাম ব্যাপারটা যতই গভীর রাতে সংঘটিত হোক না কেন, পাড়ার ক্লাব এমনকি পুলিশ সেটা জেনে গেছে। যে কোনদিন তারা বমাল গাড়িটা ধরে ফেলতে পারে। তখন কী হবে?
যিনি আমাকে কাজে লাগিয়েছেন বলেন তিনি—ধরুক তো কী?
পুলিশ তো আমাকেই ধরবে। ওরা কী স্বীকার করবে যে তাদের হুকুমে এসব করছি? তারা তো বলবে, আমাদের হুকুমে করছে তার প্রমাণ কী?
আরে বোকা কন্ট্রাকটর তো জানে তুই নির্দোষ! সে তোকে যেমন সাবে আবার ছাড়িয়েও আনবে। তুই তো জেল খেটেছিস। যদি দুদশদিন হাজতে থাকতে হয় থাকবি। তোর বউকে ওরা দেখবে।
এত বলার পরেও আমার ভয় যায় না। যদি ওরা ছাড়িয়ে না আনে? যদি আমার পাঠক, সম্পাদক, প্রকাশক, লেখক বন্ধুদের কানে কথাটা যায়? অনু এখন গর্ভবতী। যখন সে আমার সন্তানকে কোলে করে জেলখানায় আমাকে দেখতে যাবে, তখন যদি সে তার মায়ের কাছে জানতে চায়, সবার বাবা ঘরে আর তার বাবা জেলে কেন? কী জবাব দেবে তার? তাই চাকরিটা ছেড়ে দিলাম আমি।না খাওয়া সহ্য হবে, এত লোকের ছিঃছিঃ সহ্য হবেনা। ফিরে এলাম আমার খালপাড়ের কুঁড়েঘরে।
তখন ইস্টার্ন বাইপাশ তৈরির কাজ চলছে। রুবি হাসপাতাল এবং তৎসংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে চলছে ব্যাপক উন্নয়নের কাজ। উচ্ছেদ হচ্ছে গরিবের আবাস গড়ে উঠছেমধ্যবিত্তের উপনগরী। গড়ে উঠছে মদ্যপানের জন্য বার, দেহ ব্যবসার জন্য বড় বড় হোটেল, আরও কত কী!
রাজডাঙায় ফিরে এসে খুঁজে পেতে এক ঠিকাদারের কাছে মুনশির কাজ পেলাম। দিন দশটাকা মজুরিতে প্রায় মাস দুয়েক করলাম সে কাজ। শিখে নিলাম কেমন করে কাজ করাতে হয়। তারপর তারই কাছ থেকে সাবকন্ট্রাক্ট নিয়ে নিলাম পঞ্চান্ন গ্রামের একটা রাস্তা তৈরির। প্রায় দুমাইল লম্বা দশফুট চওড়া এই রাস্তা পাশের পুকুর ডোবা থেকে মাটি কেটে এনে আড়াই ফুট উঁচু করে ফেলতে হবে। আমি যখন উত্তর চব্বিশ পরগনায় গিয়েছিলাম ওখানে ঘটক পুকুর থেকে যে মাটিকাটার দলটি এসেছিল তাদের ঠিকানা লিখে রেখেছিলাম। “জীবনের ধন কিছুই যাবে না ফেলা,” এবার সেটা কাজে লেগে গেল। চল্লিশ জনের একটা দল এনে লাগিয়ে দিলাম মাটি কাটায়।
