বামফ্রন্ট সরকার বলে থাকে যে–ওই ঘটনায় নাকি একজনও উদ্বাস্তু মারা যায়নি। মাত্র দুজন, তাও স্থানীয় মানুষ মারা যায়। এটা বলতে পারার সব চেয়ে সুবিধা হল ঠিক কতলোক দণ্ডকারণ্য থেকে এসেছিল আর কত ফিরে গেছে কোথাও তার কোন রেকর্ড ছিল না। বিভিন্ন বইপত্র থেকে যা জানা যায় তা হল শুধু মাত্র ৩১শে জানুয়ারির গুলি চালনায় মারা যায় ১৪ জন। এরপর আর যত লোক গুলিতে মারা পড়ে জগদীশ চন্দ্র মণ্ডল তার বই, “মরিচঝাঁপি নৈঃশব্দের অন্তরালে”তে ১২৮ জনের নাম পরিচয় সংগ্রহ করে দিয়েছেন। নাম দিতে পেরেছেন বিনা চিকিৎসা ও অনাহারে মৃত ২৩৯ জনের। পুলিশ ও ক্যাডারদের দ্বারা ধর্ষিত ২৩ জন মহিলার। আমার মনে হয় এ তথ্য নির্ভুল নয়। আমি পরে দণ্ডকারণ্য গিয়েছি। মরিচঝাঁপি প্রত্যাগত মানুষের মুখে যা শুনেছি তাতে মনে হয়েছে মৃতের সংখ্যা দু হাজারের কম নয়। ধর্ষিতার সংখ্যা দুশোরও বেশি।
যখন কোন কুকুরকে মেরে ফেলতে চাও তো আগে পাগল বলে বদনাম করে দাও, এটা একটা পুরনো প্রবাদ। কুকুর হোক আর মানুষ তার নামে বদনাম ছড়িয়ে দিতে পারলে কাজটা সহজ হয়ে যায়। এই নিয়ম অনুসারে সে সময় সিপিএম পার্টির পক্ষ থেকে জোর প্রচার চালানো হয়েছিল যে দণ্ডকারণ্য প্রত্যাগত এই সব মানুষ প্রতিবেশী–বাংলাদেশের সহযোগিতায় সুন্দরবনে একটা আলাদা রাষ্ট্র বানাবার ষড়যন্ত্র করছে। অতি দুর্বল একটা দেশ–বাংলাদেশ। যে তখন তার নিজের হাজারটা সমস্যা নিয়ে নাজেহাল। সে ভারতবর্ষের মত একটা শক্তিশালী দেশের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করে নিজের বিপদ ডেকে আনবে! এ তো কোন পাগলেও করবে না। তবে এই প্রচারে পুলিশ ও পার্টি ক্যাডারদের মানুষের উপর অত্যাচারের একটা অজুহাত খাড়া করতে পেরেছিল এটা বলা চলে। যার ফলে বাংলার মানুষ বাংলায় এসে বাঙালীদের হাতে চরম নিগৃহীত হয়ে ফিরে গিয়েছিল অভিশাপ দিতে দিতে। কোন বঙ্গসন্তান প্রতিবাদে গর্জে ওঠে না। একজনের মুখে শুনেছিলাম তাদের ফিরে যাবার যাত্রা পথের মর্মন্তুদ বিবরণ। তাদের মরিচঝাঁপি থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে গরু ছাগলের মত নির্দয় ভাবে গেদে দেওয়া হয়েছিল ট্রেনের কামরায়। যার মধ্যে বহু মানুষ ছিল অসুস্থ-আহত, আত্মীয়, স্বজন থেকে বিচ্ছিন্ন। পথে এদের জন্য কোন খাবার দাবার বা চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল না। আর সবচেয়ে যেটা নিষ্ঠুর, বিভৎস, পৈশাচিক ট্রেনে যে সব শিশু মারা যাচ্ছিল ট্রেন থেকে ছুঁড়ে ফেলা হচ্ছিল বাইরে।
আমার বাবা যে দণ্ডকারণ্য থেকে হাসনাবাদ এসেছেন তা আমি জানতাম না। আমার ভাই চিত্ত নাকি এসে কোথায় কোথায় একদিন খুঁজে গিয়েছিল। আমাকে পায়নি, না পাবারই কথা। “চলতা যোগী রমতা নদী” সে কী কোথাও স্থির থাকে? আমি পরে যে গিয়ে মরিচঝাঁপিতে খুঁজবো, সে উপায় নেই। তখন মরিচঝাঁপি অবরুদ্ধ। আমার বাবা হাসনাবাদে মাত্র অল্প কয়েকদিনই ছিলেন, তারপরই মরিচঝাঁপিতে যান। ভেবেছিলেন একটু গুছিয়ে বসতে পারলে তখন আবার আমাকে খুঁজতে ভাইকে পাঠাবেন। সে আর পারেননি পুলিশি হামলায়। যে রাতে আমার বাবার বুকের হাড়ে চিড় ধরে পুলিশের লক্ষ্য বাবা ছিলেন না, ছিল আমার মেজভাই চিত্ত। ভাইকে বাঁচাতে গিয়েই বাবা জখম হয়ে পড়েন। কিন্তু সেই হতভাগ্য বাপ শেষ পর্যন্ত পুত্রকেও বাঁচাতে পারলেন না নিজেও বাঁচলেন না।
রসময় বালা দণ্ডকারণ্য থেকে মরিচঝাঁপি গিয়েছিল। সেখান থেকে ফের দণ্ডকারণ্য যায়। কদিন পরে আবার সেখান থেকে পালায়। এখন থাকে ঠাকুরনগর রেলস্টেশনের কাছে লাইনের পাড়ে। পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে গামছা বিক্রি করে। তার মুখে বাবা ভাইয়ের কথা জানতে পারি।
আমার বাবা ভাই, দুজন সবচেয়ে নিকট আত্মীয় মারা গেছে সেই শোকে আমি মুহ্যমান। এই সময় আমার একবার দণ্ডকারণ্য গিয়ে মা আর ভাইবোন দুজনকে দেখে আসা দরকার। যখন এই রকম ভাবছি, আগাম কোন পূর্বাভাস না দিয়ে হঠাৎ করে চাকরি চলে গেল আমার। কোম্পানি কলকাতা থেকে ব্যবসা গুটিয়ে চলে গেল। বিয়ে করেছি দু মাসও হয়নি। এই সময়ে এমন বিপর্যয়।
সেই সময় আর একটি বিপর্যয় ঘটেছিল নেহেরু পরিবারে। নিহত হয়েছিলেন ইন্দিরাগান্ধি নিজের দেহরক্ষীর গুলিতে। যে কারণে হাজার হাজার শিখ পরিবার বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল ইন্দিরা অনুগামীদের হাতে। কী ভীষণ অবিবেচক সংক্রামক দুঃসময়! কিন্তু আমি তখন কী করি?
আমি তখন গড়িয়ার ঘর ছেড়ে হালতু-রাজডাঙা খালপাড়ে নিজে একখানা ঘর বানিয়েছি। এতে আমার মাসে মাসে ভাড়া গোনার চিন্তাটা গেছে। আর নিজের ঘরে স্বাধীনভাবে থাকার যে সুখ সেটাও পাচ্ছি। তখন আর রিকশা চালাইনা! চাকরিতে মাসে যা মাইনে পাই তা দিয়ে কষ্টেসৃষ্টে সংসার চালিয়ে নিই। ডিউটির পরে হাতে যে সময় থাকে–লেখালেখি করে কেটে যায়। তখন বেশ কটা পত্রিকায় নিয়মিত আমার লেখা প্রকাশ হচ্ছে। মনে আশা জাগছে, আর কিছুদিন এভাবে চালাতে পারলে যে দুরবস্থার মধ্যে সাহিত্যচর্চা করি তা নিশ্চয় কোন সহৃদয় পত্রিকা-প্রকাশক সংস্থার কানে পৌঁছে যাবে। আর তারপরই আমি একটা লেখালেখির কাজ পেয়ে যাব। যাতে এমন বেতন পাব যে খেয়ে পড়ে বাঁচা যায়। সমরেশ বসু, সুবোধ ঘোষ এরা তো সাধারণ থেকে অসাধারণ হয়েছিলেন। একদিন আমিও তা হতে পারব। শুধু একটু সময়ের অপেক্ষা। এই সময় এমন অঘটন।
