এত নেতার এত প্রতিশ্রুতি–যা উদ্বাস্তুদের উৎসাহিত করার পক্ষে যথেষ্ট। তাই ১৯৭৮ সালের মার্চ মাসে দণ্ডকারণ্যের বিভিন্ন স্থান থেকে তারা রওনা দেয় পশ্চিমবঙ্গের দিকে। কিন্তু হতভাগা মানুষগুলো কী করে এসব রাজনীতির ঘোরপ্যাঁচ বুঝবে? রাজনীতিতে যে নেতাদের মনের কথা আর মুখের কথা এক হয়না তা তারা অনেক মূল্য দিয়ে বুঝেছিল। তখন সেই জ্যোতি বসুই উল্টো সুর ধরেছে মরিচঝাঁপি দ্বীপে কোনমতেই মানুষকে থাকতে দেওয়া সম্ভব নয়, ওই দ্বীপ বাঘেদের জন্য সংরক্ষিত। তখন তিনি এ-ও বলছেন–গরিব দরদি বামফ্রন্ট সরকারকে বিপদাপন্ন করার জন্য বিরোধী শক্তি নাকি উস্কানি দিয়ে উদ্বাস্তুদের দণ্ডকারণ্য থেকে নিয়ে এসেছে। একেই রাজনৈতিক পরিভাষায় বলে পরিবর্তিত পরিস্থিতি। ভাবা যায়, যে একলক্ষ লোক ঘরবাড়ি গরুবাছুর জমি জিরেতেও নিশ্চিন্তজীবন ফেলে স্রেফ বামফ্রন্ট সরকারকে বিব্রত করার জন্য এত কষ্ট সয়ে মরিচঝাঁপির মতো দুর্গম দ্বীপে এসে উঠেছে? তখন বামফ্রন্ট, সিপিএম তথা জ্যোতি বসুর একটাই লক্ষ্য–যে কোনভাবে মরিচঝাঁপির মাটি থেকে উদ্বাস্তুদের উৎখাত করে দেওয়া। এর জন্য তারা অত্যাচারের যেকোন সীমা পার করে যেতে বদ্ধপরিকর। সত্যি মিথ্যা জানি না, কেউ কেউ বলে, যে জলাশয়গুলো উদ্বাস্তুরা বাগদা চাষ করছিল, মাছ চাষের উপযোগী করে গড়ে তুলে, সেই জলাধার নাকি জ্যোতি বসুর ঘনিষ্ঠ একজনকে লিজ দেবার প্রয়োজনে প্রশাসন অত নির্মম হয়ে উঠেছিল।
৭৭ সালের মার্চ মাসে দণ্ডকারণ্য থেকে বিশাল সংখ্যক মানুষ হাসনাবাদে এসে পৌঁছাবার
পরই নড়েচড়ে বসে জ্যোতি বসুর প্রশাসন। তখন তারা পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশের সবকটা রাস্তায়–বিশেষ করে খড়গপুর ও আসানসোল স্টেশনে মোতায়েন করা হয় বিশাল পুলিশবাহিনী। যারা প্রতিটি ট্রেন চেক করে, বৈধ টিকিট থাকা সত্ত্বেও উদ্বাস্তুদের ধরে নামিয়ে এনে জোর করে তুলে দিতে থাকে উল্টো দিকের যে কোন ট্রেনে। রিফিউজিরা তখন মরিয়া। মরিচঝাঁপি যাবার জন্য যে কোন কষ্ট স্বীকার করতে প্রস্তুত। তারা উল্টোদিকে ট্রেনে এক স্টেশন গিয়ে নেমে পড়ে। তারপর মাঠের মাঝখান দিয়ে হেঁটে পাহারা দেওয়া স্টেশন পিছনে ফেলে অন্য এক স্টেশনে এসে ট্রেনে চাপে। এই ভাবে পৌঁছায় হাসনাবাদ।
কিছু মানুষ বর্ধমান জেলার কাশীপুর রিফিউজি ক্যাম্পেও পৌঁছেছিল। যাদের পুলিশ জোর করে দণ্ডকারণ্যে ফেরত পাঠাবার চেষ্টা করলে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। তখন পুলিশ গুলি চালায় যাতে ছয়জন উদ্বাস্তু মারা যায়। উদ্বাস্তুদের কুড়ুলের আঘাতে একজন পুলিশও মারা পড়ে।
অবশেষে সব বাধা বিঘ্ন অতিক্রম করে হাসনাবাদে জমা হওয়া উদ্বাস্তুরা কুমিরমারি দ্বীপ পার হয়ে ১৯৭৮ সালের ১৮ই এপ্রিল মরিচঝাঁপি দ্বীপে গিয়ে পৌঁছায়। পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাসের ময়না দ্বীপের মত এই দ্বীপভূমিটি প্রায় কুড়ি মাইল লম্বা আর আট মাইল চওড়া। যেখানে মানুষের পদচিহ্ন পড়েছে বলে মনে হয় না, জনহীন এই দ্বীপ দেখতে দেখতে পরিণত হয় একটি জনপদে। গড়ে ওঠে পথঘাট বাজার হাট স্কুল রুটির কারখানা বিড়ির কারখানা। এবং এর সবটাই কোন রকম বাইরের কারও সহায়তা ছাড়াই মানুষের স্বকীয় উদ্যোগে। তারা সরকারের কাছে অন্য কিছু চায়না শুধু একটাই আবেদন জানায়–আমাদের এখান থেকে উৎখাত করে দিও না। একটু থাকতে দাও।
এটা তো এক অতি সাধারণ মানবিক দাবি।কিন্তু সে দাবির অর্থ তো সে বোঝে যার মানবিকতা থাকে। জ্যোতি বসুর সরকার সে দাবির প্রতি কর্ণপাত করল না। লেলিয়ে দিল পুলিশ বাহিনী আর পার্টি ক্যাডারদের। ১৯৭৮ সালের ১৯শে আগষ্ট সকালবেলায় পুলিশের দুটো বাহিনী ৪০/৪২ টা লঞ্চ দিয়ে মরিচ কাঁপ দ্বীপকে চারদিক থেকে ঘিরে নিল। জারি করল ১৪৪ ধারা। দ্বীপের বাইরে থেকে কোন মানুষকে এখানে আসতে দেওয়া হল না। যেতে দেওয়া হল না কাউকে দ্বীপের বাইরে। এমন কী সংবাদ মাধ্যমের প্রতিনিধি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, সহানুভূতিশীল বুদ্ধিজীবী-লেখক সাহিত্যিক সবাইকে বাধা দেওয়া হল। মরিচঝাঁপিদ্বীপে তখন কোন পানীয় জলের ব্যবস্থা ছিল না। চাল ডাল শাক সজি ওষুধপত্র ও সব সংগ্রহ করা হতো কুমিরমারি দ্বীপ থেকে। পুলিশ সে সব নিয়ে যাওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে অবরুদ্ধ দ্বীপ মরিচঝাঁপির মানুষকে ক্ষুধা তৃষ্ণা বিনা চিকিৎসায় মেরে ফেলার এক জঘন্য অপপ্রয়াস শুরু করে। যারা বাধা না মেনে খাদ্য ও পানীয়ের সন্ধানে পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে অন্যদ্বীপে যাবার চেষ্টা করে, পুলিশ লঞ্চ দিয়ে ধাক্কা মেরে তাদের নৌকাগুলো সব ডুবিয়ে দেয়। এই ডুবিয়ে দেওয়া এবং পুলিশ কর্তৃক ছিনতাই করে নেওয়া নৌকার সংখ্যা প্রায় দুশো। লোকে বলে সুন্দরবনের নদীতে জল কম, হাঙর কুমির বেশি, এভাবে ডুবিয়ে দেওয়া নৌকার কত উদ্বাস্তুকে কুমির হাঙরে খেয়ে নিয়েছে তা কে জানে!
মানুষের দ্বারা সৃষ্ট এই ভয়ংকর দুর্বিপাকে উদ্বাস্তুরা যখন ক্ষুধার তাড়নায় দিশেহারা হয়ে জঙ্গলের লতাপাতা ঘাস খাচ্ছে, তৃষ্ণা নিবারণের জন্য পান করছে নদীর নোনা জল, বিনা চিকিৎসায় মরছে কুকুর বেড়ালের মত ক্রমশ মৃতের সংখ্যা তখন ১৩৬ হয়ে গেছে, তবু যখন মানুষ কিছুতে নত হচ্ছে না, ফিরে যেতে রাজি হচ্ছে না দণ্ডকারণ্যে, তখন ১৯৭৯ সালের ৩১শে জানুয়ারি পুলিশ এগিয়ে এল দ্বীপের দিকে। নদীর পাড় জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা-শ্লোগান দেওয়া মানুষের দিকে বিনা প্ররোচনায় ছুঁড়ে দিল ২৪/২৫টা কাঁদানে গ্যাসের শেল। ফলে মানুষ ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। বিনা বাধায় পুলিশ নেমে পড়ল দ্বীপভূমির মাটিতে। তারপর তারা শুরু করল শতাব্দীর সবচেয়ে কুর বর্বর অমানুষিক আক্রমণ একদল অনাহারী দুর্বল নিরস্ত্র মানুষের উপর। শুরু হল হত্যা ধর্ষণ লুঠপাট আর অগ্নি সংযোগের এক ভয়াবহ অধ্যায়। শোনা যায় তখন মানুষকে গুলি করে লঞ্চ ভরে নিয়ে গিয়ে কিছু ফেলা হয় গভীর সমুদ্রে আর কিছু ফেলা হয় বাঘের খাদ্য হিসাবে বিভিন্ন জঙ্গলে। সুন্দর বনের বাঘ আগে নরখাদক ছিল না। এই প্রথম তারা মানুষের মাংসের স্বাদ পায়, তারপর থেকে তারা নরখাদক হয়ে যায়। ৩১শে জানুয়ারি থেকে ৮ই মে, প্রায় চার মাস ধরে লোক চক্ষুর আড়ালে এক অবরুদ্ধ দ্বীপে বিভৎস তাণ্ডব চালিয়ে ভেঙে ফেলার চেষ্টা হয় উদ্বাস্তুদের মনোবল। শেষে বাধ্য করা হয় তাদের ফিরে যেতে। আর ঘুমিয়ে থাকে পশ্চিমবঙ্গের জাগ্রত বিবেক।
