আমরা শিরমণিপুর ক্যাম্পে গিয়েছিলাম ১৯৫৩ সালে। তার দু বছর আগে ১৯৫১ সালে বিধান চন্দ্র রায়ের উদ্যোগে ১৯৪৭ সালের পর থেকে যারা ক্যাম্পে এসে রয়েছে সেই সব রিফিউজিদের আন্দামানে পুনর্বাসনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল। তখন ইউ.সি.আর.সি নামে এক সংগঠন গড়ে কমিউনিষ্ট ও ফরোয়ার্ড ব্লকের নেতারা তার ঘোর বিরোধিতা করেছিল। ক্যাম্পে ক্যাম্পে সভা করে তারা রিফিউজিদের বারণ করেছিল কালাপানি না যাওয়ার জন্য। তাদের বিরোধিতার কারণেই সেদিন বন্ধ হয়ে যায় আন্দামানে উদ্বাস্তু প্রেরণ।
এরপর ১৯৫৮ সালের ১২ই সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগে গঠিত হয়-দণ্ডকারণ্য উন্নয়ন পর্ষদ। এদের মাধ্যমে মধ্যপ্রদেশ ও উড়িষ্যার জঙ্গল পাহাড়ঘেরা, কঁকর পাথরযুক্ত, জল বিহীন, অনুর্বর যোগাযোগহীন অস্বাস্থ্যকর আদিম জনজাতি অধ্যুষিত এক বিরাট অঞ্চল নিয়ে গঠিত দণ্ডকারণ্যে আবার উদ্বাস্তুদের পাঠানো শুরু হয়। তখন আবার ইউ.সি.আর.সি.র নেতৃবৃন্দ তার বিরোধিতায় নেমে পড়ে। তারা রিফিউজিদের নিয়ে সভাসমিতি মিটিং মিছিল করতে থাকে। দাবি করে বাঙালিদের বাংলার বাইরে পাঠানো চলবে না। তাদের বাংলাতেই পুনর্বাসন দিতে হবে। সেই সময় থেকে রিফিউজিদের পুনর্বাসন দাবির পক্ষে সুন্দরবন তথা মরিচঝাঁপির জনহীন দ্বীপের কথা উপস্থাপিত হয়।
১৯৫৯ সালের ১১ই আগষ্ট তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়ের কাছে ইউ.সি.আর.সি. এক দাবি সনদ পেশ করে পরিসংখ্যান দিয়ে জানায় যে সুন্দরবনের উন্নয়ন ঘটিয়ে সেখানকার ৬৫.৫ বর্গ মাইল জায়গায় ৬৮৭৫টি পরিবারকে পুনর্বাসন দেওয়া সম্ভব। এ ছাড়া যারা মৎস্যজীবী মাছের ভেরি থেকে তাদের ১২ হাজার একর এ ৩,৩০০টি পরিবারের পুনর্বাসন তথা অন্নবস্ত্রের সংস্থান করা সম্ভব। বিধান রায়ও এক বিবৃতিতে জানিয়েছিলেন যে মরিচঝাঁপি দ্বীপে সরকারের প্রায় ৫০০০ বিঘা জমি পতিত আছে। ফলে দণ্ডকারণ্যে প্রত্যাগত মানুষদের সেখানে যাওয়া এবং বসবাস করার ইচ্ছা মনের মধ্যে সুপ্ত ছিল বহুকাল আগে থেকে। তখনকার সরকার এ দাবি মেনে নেয়নি। তারা রিফিউজিদের সব রকম সাহায্য বন্ধ করে দিয়েছিল। তাই তারা বাধ্য হয়েছিল দণ্ডকারণ্যে যেতে। আশা ছিল একদিন দেশের মানুষ দেশের মাটিতে ফিরে আসবে।
মোটামুটিভাবে পশ্চিমবঙ্গ থেকে ১৯৫৯ সালে দণ্ডকারণ্যে রিফিউজি পাঠানো শুরু হয়। যা চলে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত। আর সমান তালে সেখান থেকে পলায়ন পর্ব চলতে থাকে। যারা এসে ঘর বাঁধে পশ্চিমবঙ্গের কোন খালপাড়ে বা কোন রেললাইনের ধারে।
সেটা ১৯৭৫ সালের ২৫শে জানুয়ারি। ভিলাই শিল্পাঞ্চলে সভা করতে গিয়েছিলেন সি.পি.এম নেতা জ্যোতি বসু। তিনি তখন মানাক্যাম্প থেকে উদ্বাস্তুদের কয়েকজন নেতাকেভিলাইয়ে ডাকিয়ে এনে বলেন–আমরা যদি কোনদিন ক্ষমতায় আসতে পারি, উদ্বাস্তুদের পশ্চিম বাংলায় পুনর্বাসনের দাবি অবশ্যই পূরণ করব। চরণদাস প্রতিজ্ঞা করেছিল সে কোনদিন রাজা হবে না, সোনার থালায় খাবে না, হাতিতে চড়বে না, রানীকে বিয়ে করবে না। এ প্রতিজ্ঞা করা তখন তার পক্ষে সহজ ছিল। কারণ এমন সৌভাগ্য যে কোন দিন হতে পারে চোর চরণদাসের তা দূরতম কল্পনাতেও ছিল না। যেমন ছিল না জ্যোতি বসুরও। সে কী করে জানবে যে মাত্র দু বছর পরে গদি নাগালে এসে যাবে। আর তখন আজকের দেওয়া প্রতিশ্রুতি সেদিন গলার কাঁটা হয়ে বিধবে।
ওই বছরই মানা ক্যাম্পে মে মাসে অনুষ্ঠিত হয় এক সর্বভারতীয় উদ্বাস্তু সম্মেলন। যাতে যোগ দিয়েছিলেন রাম চ্যাটার্জী, কৃপা সিন্ধু সাহা ও সারা ভারত ফরোয়ার্ড ব্লকের সম্পাদক জম্বুরাও ধৌতে। তারাও সেদিন এই সভায় উদ্বাস্তুদের সুন্দরবনে পুনর্বসনের দাবি সমর্থন করে বক্তব্য রাখেন। এমনিতে তো জ্যোতি বসুরা প্রথম থেকে রিফিউজিদের দণ্ডকারণ্যে পাঠাবার বিরোধিতা করে আন্দোলন চালিয়ে ছিলেন, তখনকার সেই দাবীর প্রতি এখনও এদের সমর্থন আছে এটা জেনে রিফিউজিদের মনে নিভু নিভু আশার বাতিটা নতুন করে জ্বলে ওঠা অন্যায় কিছু ছিল না।
এরপর বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসে। তখন ১৯৭৭ সালের ১২ই জুলাই দণ্ডকারণ্যের উদ্বাস্তুদের পক্ষ থেকে এক প্রতিনিধি দল জ্যোতি বসুর সঙ্গে দেখা করে এক স্মারকলিপি দিয়ে তাদের দুরবস্থার কথা জানিয়ে যান। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বামফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রী রাম চ্যাটার্জী বিধান সভার সদস্য রবি শংকর পাণ্ডে ও কিরন্ময় নন্দ ৭৭ সালের ২৮ শে নভেম্বর পুনরায় দণ্ডকারণ্যে যান। তারা চারদিন ধরে বিভিন্নস্থান পরিদর্শনের পর এক সভা করেন। সেখানে রাম চ্যাটার্জী বলেন আমরা তদন্ত করে দেখে বুঝলাম সরকার আপনাদের পুনর্বাসনের নামে নির্বাসন দিয়েছে। আমরা একথা জ্যোতি বসুকে জানাব। এবং এই সমস্যার সমাধান করতেই হবে। ১৯৭৭ সালের ১৭ই ডিসেম্বর আবার দণ্ডকারণ্য থেকে আর একটা প্রতিনিধি দল আসে। তখন জ্যোতি বসু তাদের বলেন-পশ্চিমবঙ্গের ফুটপাতেও বহু মানুষ বাস করে। আপনারা না হয় তাদের মতবাস করবেন। আমাদের পুলিশ আপনাদের লাঠিপেটা বা গুলি করবে না। পুনরায় রাম চ্যাটার্জী এবং বামফ্রন্ট কমিটির চেয়ারম্যান অশোক ঘোষ ১৯৭৮ সালে ১৬ই জানুয়ারি দণ্ডকারণ্যে যান। তিনদিন ওখানে থাকেন। বিভিন্ন স্থানে সভাও করেন। সেই সভায় অশোক ঘোষ বলেন–আপনারা যদি পশ্চিমবঙ্গে ফিরে যান, তাহলে পশ্চিমবঙ্গের পাঁচকোটি মানুষ দশ কোটি হাত তুলে আপনাদের বরণ করে নেবে।
