ওরা বোকা নয়, মেয়েটার পাশে আমার দৃঢ় নিশ্চল বসে থাকায় বুঝে যায়–বাধা আসবে। যত সহজ ভেবেছিল কাজটা অত সহজ নয়। তাই কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে শেষে চলে যায়। হয়ত টালিগঞ্জ বা কালীঘাট। যেখানে সল্পমূল্যে মেয়ে মিলে যায়। কিন্তু আমি তখনও বসে থাকি।
এক সময় মেয়েটার ঘুম ভাঙে। উঠে বসে শরীর থেকে ধুলো ঝাড়ে। তারপর ক্লান্ত পায়ে হাঁটা দেয় রেলস্টেশনের দিকে। এখন সকাল হয়ে গেছে। এবার সে বাসায় ফিরে যাবে। তখন কী আমার বুক থেকে একটা সর্বহারা দীর্ঘশ্বাস ঝরে পড়েছিল। কিন্তু কেন?
আমার কাজ শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু কাজ বাকি ছিল বিল্টুদার। তাই সে পথের দিকে চোখ পেতে বসে থাকে। কখন অনিতার মা এই পথে যায়। দেখা হবার পর সে গতরাতে যা যা ঘটেছে আর যা যা ঘটবার সম্ভাবনা ছিল সব খুলে বলে। এ-ও বলে এ রাত তো গেছে, কিন্তু কাল বা পরশু যদি আবার এমন হয়, ওকে কে বাঁচাবে? মেয়েকে আর এখানে রাতে রেখো না।
অনিতার মা তখন কপাল চাপড়ে কাঁদে–কী যে করি মেয়েটাকে নিয়ে। জলে কুমির ডাঙায় বাঘ, আমি যাবো কোথায়! সে কান্না তিনি যেখানে কাজ করেন সেই ডাক্তারের কাছে গিয়েও কাঁদেন। তখন ডাক্তার তার এক প্রভাবশালী পেশেন্টকে ফোন করেন মেয়েটার জন্য একটা ব্যবস্থা করে দেবার উদ্দেশ্যে। তিনি উদ্যোগ নিয়ে অনিতাকেনদীয়ার শিমুরালির অনাথ আশ্রম–ভাগীরথ শিল্পাশ্রমে থাকা খাওয়া পড়াশোনার ব্যবস্থা করে দেন। তবে অনিতা খেলাধুলায় যতটা ভালো, পড়াশোনায় ততটা নয়।
ইচ্ছা করলে অনিতার মা অনিতাকে এখানে আরও কিছু বছর রেখে দিতে পারত। কিন্তু তার ইচ্ছা মেয়েকে বিয়ে দেবে। সে সুখে সংসার করছে দেখে তারপর মরবে। বয়েস তত হয়েছে, কবে কী হয়ে যায়। তা ছাড়া তার আর একটা ভয়, শহিদ স্মৃতি কলোনির আমার নামের সেই বদমাশটাকে নিয়ে। সে এখন বিয়ে করে দু ছেলের বাপ। তবু অনিতাকে বিরক্ত করে। মেয়েটা দুর্গাপুজো বা গরমের ছুটিতে মায়ের কাছে গিয়ে দুদিন থাকতে পারে না। খুব জ্বালাতন করে। কবে নাকি সে শিমুরালির আশ্রমে গিয়ে হাজির হয়েছিল। বউদির আমাকে অনিতার বর হিসাবে এই জন্য পছন্দ–আমি তাকে ওই বদমাশের আগ্রাসন থেকে রক্ষা করতে পারব। এরপর আর কী! অনিতা দত্ত নামের কন্যার পানিগ্রহণ করে জনৈক মদন দত্ত। বিয়েতে ওইটুকু মিথ্যায় কোন দোষ নেই। যখন উভয় উভয়ের পছন্দ। বিয়ে করার পর বউ নিয়ে গড়িয়া স্টেশনের কাছে এক খাল পাড়ে কুড়ি টাকা ভাড়ার এক ঘরে আস্তানা নিলাম। আমি এখন সংসারী মানুষ, সামাজিক সম্মানের হকদার। এবার আমার ঘর ভাড়া পেতে কোন অসুবিধা নেই। তবে ঘর সংসার পাততে গেলে শুধু বই নয়, আরও অনেক কিছুই লাগে। কিছুই তো নেই আমার। শ্বাশুড়ি ঠাকরুন হাড়িকুঁড়ি বিছানা মাদুর দিয়ে আমাদের নতুন সংসার পাততে সাহায্য করলেন। পাতিয়ে বসলাম আমার নিজের সংসার নিজের বউ” নিয়ে।
একদিন ট্রেন থেকে বালিগঞ্জ স্টেশনের পিছন দিকে নেমে টিকিট চেকারের নাগাল এড়িয়ে ঘুরপথে হিন্দুস্থান পার্কে ভারত টিভি কোম্পানীতে যাচ্ছি, পথে দেখা হয়ে গেল পারাল কোর্টের রসময় বালার সাথে। সে আমার পরিবারের সবাইকে চেনে। তার মুখে পেলাম মর্মান্তিক দুঃ সংবাদ–আমার বাবা ও মেজভাই চিত্ত মারা গেছে। চিত্তর মৃত্যুর কারণ মস্তিষ্ক জ্বর। বাবার মৃত্যুর কারণ বুকের ভেঙে যাওয়া হাড়, তদুপরি পুত্রের মৃত্যুশোক। বাবার বুকের হাড় ফেটে গিয়েছিল বন্দুকের কুঁদোর আঘাতে। কারণ তিনিও ১৯৭৮ সালে মরিচঝাঁপিতে এসেছিলেন। যখন তাদের পুনরায় জোর জবরদস্তি করে দণ্ডকারণ্যে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়, মন তো সেখানে টিকছিল না। তাই অবস্থা একটু শান্ত হলে মেজভাই চিত্ত পরিবারের সবাইকে সেখানে রেখে একা দ্বিতীয়বার পশ্চিমবঙ্গে আসবার চেষ্টা করে। যদি আমার দেখা পায়, যদি কোন কাজকর্ম করতে পারে, সেই আশায়। রায়পুর স্টেশনে এসে তার হঠাৎ জ্বর আসে। রায়পুরের মানাক্যাম্পে তার বিধবা শাশুড়ি থাকে। জ্বর নিয়ে সে কোনভাবে শ্বাশুড়ির কাছে পৌঁছাতে পেরেছিল।কিন্তু তেমন ভালো চিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকায় স্ত্রী আর দুই নাবালক পুত্র রেখে মারা যায়।
বাবার পুরনো একটা পেটের ব্যথা–সে তো ছিলই। তার উপর ভাঙা বুকে দু দুটো পুত্র শোক। বড়টা বেঁচে আছে কিনা কোন খবর নেই, মেজটা মরে গেল। আর তার চেয়ে বড় শোক জন্মভূমি থেকে দূরদেশে বনের মধ্যে পড়ে থাকা। এত দুঃখ কষ্ট সয়ে একটা মানুষ বাঁচবে কী করে! এরপরেও তার আরও একটা শোক ছিল–সেটা হচ্ছে প্রিয় পার্টি “উনিষ্ট”-এর প্রিয় নেতা জ্যোতি বসুর বেইমানি। যা তারা করেছে মরিচঝাঁপি দ্বীপে-দণ্ডকারণ্য প্রত্যাগত দরিদ্র মানুষগুলোর উপরে।
মরিচঝাঁপি। আজ থেকে প্রায় তিরিশ বত্রিশ বছর আগে স্বাধীন এই বঙ্গভূমিতে জালিয়ানবাগতুল্য এক নৃশংস নরসংহার আর ধর্ষণ, অগ্নি সংযোগ, লুঠপাটের যে ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল নদী বেষ্টিত সুন্দরবনের সেই ছোট্ট দ্বীপে, রাষ্ট্রীয় বর্বরতার এমন নজির পৃথিবীর ইতিহাসে খুব বেশি নেই।
এই দ্বীপটিতে ১৯৭৮ সালের মার্চ মাসে দণ্ডকারণ্যের বিভিন্নস্থানে থেকে প্রায় একলক্ষ মানুষ এসে পৌঁছেছিল এখানে একটু বসবাসের আশায়। তারা রাজ্য বা কেন্দ্র কোন সরকারের কাছে কোনরূপ কোন আর্থিক সহায়তা দাবি করেনি। শুধু চেয়েছিল একটু দয়া–বাবু গো, আমরা এই বাংলার মানুষ। বাংলার জলমাটি আমাদের বড় আপন। প্রাণধারণের পক্ষে অনুকুল।দণ্ডকারণ্যের পাহাড় পাথর মুররাম মাটি–সেখানকার বন জঙ্গল, মানুষের ভাষা সংস্কৃতি, সব আমাদের অচেনা। সেখানকার শাসন প্রশাসন আমাদের প্রতি চরম উদাসীন। সে জায়গা আমাদের বসবাস-জীবন ধারণের পক্ষে অনুপযুক্ত। তাই এই বাংলার এক কোণে এই জনহীন দ্বীপে আমাদের একটু থাকতে দাও। তারা এই আবেদন করেছিল তাদেরই কাছে–যারা নিজেরাই একদিন বলেছিল–দণ্ডকারণ্য বাঙালী রিফিউজিদের বসবাসের উপযুক্ত তাদের দণ্ডকারণ্য পাঠানো চলবে না। এই বাংলাতেই পুনবার্সন দিতে হবে। তারাই বলেছিল-সুন্দরবনে প্রচুর পতিত জমি রয়েছে। যার মধ্যে মরিচঝাঁপি দ্বীপেরও উল্লেখ ছিল।
