তখনকার সময়ে ওই অঞ্চলে এ রকম জনবসতি ছিল না। চারদিকে মাঠ, মাছের ঘেরী, হোগলা বন। বিদ্যুৎ ছিল না, তাই সন্ধ্যের পর ঘিরে নিত ঘন অন্ধকার। বাধ্য হয়ে মা মেয়েকে পরামর্শ দেয় সারাদিন বাসায় থাকবি, আর সন্ধ্যে নামার আগে চলে আসবি যাদবপুরে। একটু এদিক সেদিক ঘুরবি। আমি আসার সময় তোকে সাথে করে নিয়ে আসব। ভুলেও যেন অন্ধকার হলে একা ঘরে থাকিস না।
সেই থেকে মেয়ে তাই করে। স্টেশনে, বাস মোড়ে কটা বন্ধু হয়েছে, তাদের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে সময় কাটায়, আর আটটা বেজে গেলে এসে এই মোড়ে দাঁড়ায়। মা মাঝে মাঝে রুগীদের জন্য ডাব নিতে বিল্টুদার দোকানে আসে।সে বলে গেছে তাকে, আমার মেয়েটাকে একটু দেখবেন। বিল্টুদার ইচ্ছা করে মেয়েকে ডেকে দোকানে বসায়। পারে না। মদ বিক্রি হয় যে।
ওর মায়ের ডিউটি বারো ঘন্টা। সকাল আটটা থেকে রাত আটটা। নাইটে অন্য একজন থাকে। কিন্তু আজ মা আটটায় ভিউটি শেষ করে আসতে পারেনি, একটি ডেলিভারি পেশেন্ট যথা সময়ে সন্তান প্রসব না করার জন্যে। ওদিকে তার যে সহকর্মী সেও আজ আসেনি। এই অবস্থায় তাকে আটকে থাকতে হয়।
তখন সেই মেয়ে কী করে? সারাদিন শিব চতুর্দশীর উপবাস করেছে। ক্ষুৎপিপাসায় কাতর, ক্লান্ত অবসন্ন শরীর নিয়ে কীর্তন প্যান্ডেলে মায়ের ফেরার আশায় বসে বসে রাত বেড়ে গেলে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিল সেই ধুলো ওড়া চটের উপর। সে তো জানে না,শহর কলকাতার রাত কোন মেয়ের পক্ষে এখন নিরাপদ নয়। এই রাতের শরীরে লুকনো আছে হিংস্র দাঁত নখ। যা দিয়ে নিষ্ঠুর ভাবে ফালাফালা করে ফ্যালে নারীর কোমল শরীর। তার বর্তমান আর ভবিষ্যৎ। সমাজে স্বসম্মানে বেঁচে থাকবার মানবী অহংকার।
এই রাত আঁধারে একটা মেয়ে যে সদ্য কুঁড়ি থেকে ফুল হয়ে পাপড়ি মেলতে শুরু করেছে, সে একেবারে একা, অরক্ষিত পড়ে আছে পথের পাশে। সেই খবরটা পৌঁছে গেছেনারী শিকারিদের ঠিকানায়। এরা এক রাজনৈতিক দলের প্রশ্রয়পুষ্টকর্মী। দলের প্রয়োজনে বোমাচাকু নিয়ে দৌড়য়। আর প্রতিপক্ষ দলের হাতে মারা পড়লে শহীদ হয়। রাত নামার সাথে সাথে এরা বদলে যায়। পেটে মদ পড়লেই খুঁজে বেড়ায় নধর নারী মাংস।
এখন এই রাতে নারী শিকারি যে দলটা এসে এইট বি বাসস্ট্যান্ডের পূর্ব দক্ষিণ কোণের অন্ধকারে গাড়ি রেখে দাঁড়িয়ে সুযোগ খুঁজছে তারা দলে ছয়জন। বোঝা যাচ্ছে ট্যাক্সি চালকও এদের দলের একজন সদস্য। সবাই ক্ষুধার্ত নেকড়ের মতো ওত পেতে আছে। একটা সুযোগ পেলেই মেয়েটাকে ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে গাড়ি করে কোন নিরুদ্দেশে চলে যাবে তা কে জানে। বিল্টুদা ওদের চেনে। তাই বেশ কিছুক্ষণ ধরে ওদের গতিবিধির উপর নজর রেখে বুঝতে পারছিল–বাঁচানো যাবে না। মেয়েটার আজ চরম সর্বনাশ হবে। যে মানুষ নিজে সৎ নয় সে অন্যের অপকর্মের বিরোধ করতে পারে না। বিলুদা চোলাই মদ বেঁচে। সে যদি ওদের বারণ করে-বাধা দেয়, কাল ওরা বিন্টুদার দোকানে পুলিশ লেলিয়ে দেবে। বন্ধ হয়ে যাবে ব্যবসা। তখন না খেয়ে মরতে হবে। তাই গভীর সমস্যায় পড়ে গিয়েছিল সে। মেয়েটার অতীত ইতিহাস জানে বলে তার কষ্ট হচ্ছিল।
এটা কোন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কাল নয়, যখন কোন আইন কানুনের বালাই থাকে না। এটা নয় সেই জল আর জঙ্গল দিয়ে ঘেরা অবরুদ্ধ মরিচঝাঁপিদ্বীপ। যেখানে যা ইচ্ছা তা করার স্বাধীনতা দিয়ে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল একদল নরপিশাচকে। এটা সভ্য শিক্ষিত সংস্কৃতিবান মানুষের আবাস কলকাতা মহানগর। এখানে সেই তারা যাদের বাপ ঠাকুরদা একদিন মেয়ে বোন মায়ের সম্মান রক্ষার জন্য পূর্ব পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসেছিল। সময়ের কী নিষ্ঠুর পরিহাস-এখন সেই বাস্তুহারা বাচ্চারা আর এক বাস্তুহারা মেয়ের মান সম্মান মাটিতে মিশিয়ে দিতে উদ্যত।
তখন বিল্টুদা কি ভগবানকে ডাকছিলেন? কাতর প্রার্থনা জানাচ্ছিলেন—হে ভগবান মেয়েটাকে বাঁচাও। ভগবান কী তার ডাক শুনেছিল?
আমি শুনেছি, বিধির যে বিধান, মানুষ তো তুচ্ছ স্বয়ং বিধিও নাকি তা বদলাতে পারেন না। যদি কেউ বদলাতে পারে, সে পারে একমাত্র শয়তান। যদি মানুষের হাতে তা বদলে দেবার ক্ষমতা থাকত, নিঃসন্দেহে মানব সমাজের পক্ষে শুভ হতো। যে হেতু তা শয়তান বদলায়–দেশকালের পক্ষে আরও বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
আমি একদা মানুষ ছিলাম। মানুষ হয়েই থাকতে চেয়েছিলাম। মানুষই আমাকে মানুষ থাকতে দেয়নি। তাই শরণাপন্ন হয়েছিলাম শয়তানের। বিল্টুদা জানে আমি এক শয়তান সাধক। আর জানে-লোহা দিয়ে লোহা কাটতে হয়। তাই বড় কাতর গলায় বলে–আমাগো দ্যাশের মাইয়া, অরে বাঁচা।
যে ছেলেগুলো এখানে এসেছে তাদের প্রায় সব কটাকে আমি চিনি। ওরাও আমাকে চেনে। তবে চেনে এক রিকশাঅলা হিসাবে। তাই আমার গায়ে যে বড় মোটা কালো রঙের চাদর তা দিয়ে ডাকাতের মত মাথা মুখ ঢেকে ফেলি। সন্ধ্যে বেলায় খানিকটা মদ খেয়েছিলাম, এখন ঢকঢক করে খেয়ে ফেলি বিন্দুদার এক পাইট চোলাই। মদ সেই মহাঔষধি যে ভীরুকে করে সাহসী, আর সাহসীকে দুঃসাহসী। আর বিল্টদার ডাবকাটা দা খানা লুকিয়ে নিই চাদরের তলায়। তারপর গিয়ে বসে পড়ি ভূ-লুষ্ঠিতা মেয়ের মাথার কাছে। এখন এই রাতে আমি তার স্বঘোষিত অঙ্গরক্ষক। যে তাকে স্পর্শ করবে, যে হাতে স্পর্শ করবে আমি সেই হাতে কোপ মারবো। আমি এক যুদ্ধভূমি ফেরত সেনা। আমি জানি এ সব লড়াইয়ে যে প্রথম আঘাত করে জয় তারই।
