–মেয়ে দেখবে না?
–বললাম তো, তুমি দেখেছো ওতেই হবে।
–পাকা কথা দিয়ে দেবো?
–দিয়ে দাও।
আশা করছি, আমি তখনও আশা করছি, বউদিযতই চেষ্টা করুক বিয়েটা শেষ পর্যন্ত কেঁচেই যাবে। মেয়ের মা নাকি বাঘাযতীন স্টেশনের কাছে শহীদ স্মৃতি কলোনিতে থাকে। সেখান থেকে যাদবপুর আর কতদূর! মাত্র এক স্টেশন। তাছাড়া ওই কলোনির সব লোক আগে যাদবপুর রেল কলোনিতে ছিল। তারা অনেকে আমাকে চেনে। কাউকে আমার নাম বললে সে মা মেয়ের কানে এত বিষ ঢেলে দেবে যে তারা এক পা এগিয়ে তিন পা পিছিয়ে যাবে।
আমি মেয়ে দেখতে যাব না। মেয়ে দেখব একেবারে বিয়ের পিড়িতে বসে, একথা বলবার পর বলে বউদি–ঠিক আছে, তাই হবে। তবে চাক্ষুস যদি না দেখতে চাও একবার অন্ততঃ ফটোতে দেখে নাও কথা শেষ করে বউদি একখানা পোষ্টকার্ড সাইজের গ্রুপ ফটো আমার চোখের সামনে মেলে ধরে। এতে পাঁচটা মেয়ের ছবি। স্কুলের কোন এক অনুষ্ঠানে ছবিটা তোলা হয়েছে–”চিনে নাও কোন জন, দেখি কেমন পারো।” সে ফটো হাতে নিয়ে আমি যেন বিছের হুল খাই। মাঝখানে বসা এ কে! একটা আর্তনাদের মত গলা চিরে বের হল আমার বিস্ময়, মাঝখানে বসা এই মেয়ে নয় তো?
–হাসে বউদি-চোখ আছে তোমার, ঠিক চিনেছে। এই সেই মেয়ে যাকে তোমার গলায় বেধে দেবো। বলো পছন্দ হয়েছে তো?
বলি–একে আমি চিনি। আগেও দেখেছি।
জোর দিয়ে বলে বউদি-হতেই পারে না। অনিতা নদীয়ায় থাকে। তুমি দেখবে কী করে! গেছো কোনদিন শিমুরালি?
বলি–নদীয়ায় থাকুক আর নাগপুরে এ মেয়ে আমার চেনা। দিন ঠিক করো, যাব মেয়ে দেখতে।
.
সেটা সেই সময়ের কথা যখন হরেন ঘোষ সংক্রান্ত মারামারিটা হয়ে গিয়েছিল, কার্তিকের ব্যাপারটা হয়নি। সেই সময় একরাতে হোটেলে খেয়ে যাদবপুর সুপার মার্কেটের ছাদে ঘুমাতে চলেছি আমি। তখনও সুপার মার্কেট সম্পূর্ণ নির্মাণ হয়নি। তার ছাদ ছিল আমার একটা নিরাপদ আশ্রয়। তখন তো স্থান বদলে বদলে রাত কাটাতে হোত।
সে সময় এইট বি বাস স্ট্যান্ডের সামনের দিকে–রাজা সুবোধ মল্লিক রোডের পাশে একটু উঁচু দেওয়াল দেওয়া ছিল। সেই দেওয়াল ঘেষে ছিল বিল্টুদার ভাঙাচোরা চায়ের দোকান। এ দোকানকে শুধু চা দোকান না বলে পানীয়ের দোকান বলা ভালো। চা চোলাই মদ ডাব সব সে দোকানে পাওয়া যেত। চোলাই বিক্রির জন্যই বিল্টুদা রাত দেড়টা দুটো পর্যন্ত দোকান খুলে বসে থাকত।
আমি যখন তার দোকানের সামনে দিয়ে পার হচ্ছি আমাকে দেখে সেদিন সেই রাত্রিতে তার গলায় ফেটে পড়ল চাপা এক করুণ আর্তি–ডেকে উঠল–মদন, মদন রে, এটু এদিক আয়। আর কাছে গেলে-পূর্ববঙ্গের ঢাকা জেলার ছিন্ন মূল মানুষ বিল্টুদা যেন কেঁদে ফেলেছিল–মদন রে, অর মতোন আমারও একখান মাইয়া আছে। বুকটা ফাইটা যায়। যদি পারোস মাইয়াডারে বাঁচা। অর কেউ নাই।
সেদিনটা ছিল শিব চতুর্দশীর অল্প অল্প শীত মাখা শুনশান একটা রাত। সন্ধ্যে বেলার সেই চুড়ির খনখন,হাসির কলকল, পাটভাঙা শাড়ির খসখস, বাতাসে ওড়া সুগন্ধীচুলের মাতাল হাতছানি, সে সবের আর কিছুই ছিল না এসময়ে। সেই রাতের সেই সময় সমস্ত মানুষ বদ্ধ ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে ঢলে পড়েছিল গভীর ঘুমের কোলে। নিঝুম হয়ে গিয়েছিল চারধার। রাজপথ ছিল কিছু জাবর কাটা গরু ছাল ওঠা নেড়ি কুকুর আর টলোমলো পায়ের মাতালদের দখলে। বাস মোড়ে, যেখানে এখন রাজীব গান্ধির মূর্তি, সেখানে বাজার কমিটির তত্ত্বাবধানে প্রতি বছরের ন্যায় এবছরও ত্রিপল খাঁটিয়ে তার নিচে বসেছিল সংকীর্তনের আসর। রাত অনেক, এ সময়ে তাই ভক্তশ্রোতাদের সংখ্যা সর্বসাকুল্যে কুড়ি বাইশ জন। যারা অধিকাংশই জীবনের সব ব্যস্ততা থেকে মুক্ত বৃদ্ধ। যাদের এখন একটাই কামনা হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হল, পার করো আমারে।
এই বৃদ্ধদের মধ্যে একটি মেয়ে রয়েছে একেবারে একা, একদম বেমানান। যার শরীরে যৌবন চুপিসারে অনুপ্রবেশ করে ফেলেছে কিন্তু কৈশোর বেলা এখনও দখল ছাড়েনি। মেয়েটি মেঝেয় পাতানো চটের ধুলোর মধ্যে শুয়ে ঘুমের ঘোরে অচেতন। তার শ্যাম্পু করা একরাশ চুল খোঁপা খুলে ধুলোয় লুটিয়ে পড়েছে। পরিধানে লাল রঙের ফুল প্যান্ট আর টি শার্ট। কপালে ছোট্ট একটা কচলোকা টিপ, কানে সোনার সরু রিং। বিন্টুদার আর্তনাদ এই মেয়েটির জন্যই।
এই মেয়েটির বাড়ি পূর্ববাংলার খুলনা জেলার গিলেতলা গ্রামে। এদের বাড়িতে দুর্গাপূজা হোত। দত্ত বাড়ি বললে এক ডাকে সবাই চিনত। ১৯৭১ সালে মুক্তি যুদ্ধের সময় এর বাবা রমেন দত্তকে খান সেনারা গুলি করে মেরে ফেলে। প্রাণভয়ে তখন এর মা দুই মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে এপার বাংলায় চলে আসে। কিছুদিন কাটায় মদনপুরে এক আত্মীয়ের বাড়ি। শেষে তারা আর রাখতে চায় না। তখন মেয়ে দুটো নিয়ে চলে আসে যাদবপুরে। থাকতে শুরু করে সদ্য পত্তন হওয়া শহীদ স্মৃতি কলোনির এক অল্প ভাড়ার ঘরে। খুব বেশি টাকা পয়সা দেশ থেকে নিয়ে আসতে পারেনি। যা এনেছিল এক আধ বছরে শেষ হয়ে যায়। তখন নিজে কাজে লেগে পড়ে এক নার্সিংহোমে আর বড় মেয়ে পুতুলকে দেয় এক বাড়িতে রান্নার কাজে, সে কী ভাবে কে জানে গায়ে আগুন লেগে পুড়ে মারা যায়।
এত শোক দুঃখ কষ্টের মধ্যেও মা আর মেয়ে কোনভাবে দিন কাটাচ্ছিল। কিন্তু সমস্যা হয়ে গেল যেই ছোট মেয়ে অনিতা একটু বেড়ে উঠল। যে পাড়ায় ওরা থাকে সেখানকার এক দুষ্কৃতকারী হার্মাদ লেগে গেল তার পিছনে। তাকে ওখানকার লোক প্রচণ্ড ভয় পায়। ডাকাতির কেসে সে জেল খেটে এসেছে। আমারই আসল নামের সে বদমাশ আগে যাদবপুর রেল কলোনিতে থাকত। সে অনিতাকে বিয়ে করতে চাইল। নানাভাবে প্রলোভন দিয়ে ব্যর্থ হয়ে শেষে হুমকি দিল স্বেচ্ছায় রাজি না হলে জোর করে তুলে নিয়ে যাবে। তারপর এমন অবস্থা করবে যে কারও সামনে আর মুখ দেখাতে পারবে না। এরা গরিব এবং অসহায়। ও পাড়ায় তখন কেউ ওদের পাশে দাঁড়াবার মত ছিল না। সময়টা বড় খারাপ। এ সময়ে কে কার পাশে দাঁড়ায়। তখন এক মাত্র পথ ছিল–এ পাড়া ছেড়ে চলে যাওয়া। কিন্তু এত অল্প ভাড়ায় অন্য কোথাও ঘর পাওয়া মুশকিল এবং তা খুঁজতে কিছু সময়ও দরকার।
