–দেবে! বলে বউদি–তুমি মত দাও মেয়ে আমি যোগাড় করব। পুরুষ লোকের ও রকম একটু আধটু দোষ থাকেই। গোয় তুলসী পাতা আজকালতোéড়ও সব যা ছিল সে সব তো আগের ব্যাপার। তখন তুমি এক রকম ছিলে এখন আর এক রকম। এখন তোমার কত নাম! বই লেখো, চাকরি করো। যে মেয়ে তোমাকে পাবে তার কী ভাগ্য! হেসে হেসে বলে বউদি-বড় তাড়াহুড়ো করে ফেলেছি। পাঁচটা বছর পরে যদি জন্মাতাম তোমাকে কী আমার ছাড়া আর কারও হতে দিতাম।
কোনভাবে পাশ কাটাতে না পেরে শেষে একদিন বলি বউদিকে–ঠিক আছে দেখো মেয়ে। তবে আমি চাই, আমার যা দোষগুণ সবটা যেন তাকে অবশ্যই খুলে বলা হয়। কোন কিছু গোপন রাখা চলবে না। যতটুকু তুমি জানো তুমি বলবে আশা করি ওতে হয়ে যাবে। নাহলে আমি বলব। তবু যদি না পিছোয়-মরুক।
–কেমন মেয়ে চাও তুমি?
–যেমন হোক।
–না, তবু বলো।
–শান্ত ভদ্র নম্র, আমাকে যেন লোকের সামনে খানকির ছেলে বলে থান ইট নিয়ে তেড়ে মারতে না যায়। গায়ের রঙ কালো হতে হবে, খুব একটা সুন্দরী হওয়া চলবে না। রূপের দেমাকে তাহলে তার মাটিতে পা পড়বে না। অল্প যেন লেখাপড়া জানে। সারাদিন খেটেখুটে বাসায় গিয়ে ছেলে মেয়েকে অ আ শেখাতে বসবো, সে আমার দ্বারা হবে না। তবে সে যেন কোন ডিগ্রিধারী না হয়। তাহলে আমাকে পাত্তা দেবে না। আর তার যেন বাবা মা ভাইবোন কাকা জেঠা মাসি পিসি কেউ না থাকে। যেন ঝগড়া ঝাটি হলে সেখানে গিয়ে ঘাপটি মেরে থাকতে না পারে।
–আর কিছু? কোন পন ফন?
–না পনফন নেব না। আমি এর বিরোধী।
আমি যখন এসব কথা বলছিলাম, বলেছিলাম একেবারে হাল্কা চালে, কিছুটা রসিকতার মুডে। কারণ আমি জানতাম এতগুলো শর্ত পূরণ হবার কোন সম্ভাবনাই নেই। কিন্তু আমার কথা শেষ হবার প্রায় সাথে সাথে বলে বউদি, তুমি যেমন যেমন বলেছ ঠিক তেমনই মেয়ে তোমাকে দেব। আছে তেমন একজন। তবে। তবে সব তো একেবারে একশো ভাগ মেলে না, একটু উনিশ বিশ হয়ে থাকে। সেটা একটু মানিয়ে নেওয়া লাগে। তা ধরো রঙটা মেয়ের কালোর বদলে শ্যামলা পড়াশোনার ব্যাপারটা মোটামুটি ঠিক আছে-এইট ফেল। আত্মীয় স্বজন তেমন কেউ নেই, শুধু মা-সেও খুব বুড়ি, বেশিদিন বাঁচবে বলে মনে হয় না।
আমার তখন জানা ছিল না যে বউদির সাথে এসে কবে যেন দূরে দাঁড়িয়ে আমাকে এবং আমার কর্মস্থল দুটোই মেয়ের মা দেখে গেছে। তার নাকি জামাই হিসাবে আমাকে পছন্দ হয়েছে। তারপরই বউদি আদাজল খেয়ে আমার পিছনে ধাওয়া করেছেন। মেয়ের মা যার মাথার সব চুল সাদা বলে লোকে তার নাম রেখেছে পাকা মাথা বুড়ি তার সাথে বউদির বহুদিন ধরে আলাপ পরিচয়। বুড়ির একটি বিবাহযোগ্য মেয়ে আছে। যে কারণে তিনি সবিশেষ চিন্তিত। এটা শুধু তার একার নয় বর্তমান সময়ে বিবাহযোগ্য সব মা বাপের চিন্তার বিষয়। ফলে সেই চিন্তিত মা বলেছে বউদিকে, যদি তুমি আমার মেয়ের জন্য একটা ভালো পাত্র খুঁজে এনে দাও, আমি তোমাকে ঘটক বিল্টুদায়ের প্রাপ্য স্বরূপ ভালো একখানা শাড়ি দেব সাথে সায়া ব্লাউজ। মেয়েদের শাড়ির প্রতি লোভ সর্বজন বিদিত। তাই সে ছিনে জোঁকের মত লেগে গেছে আমার পিছনে। একটা ভাল শাড়ির পিছনে।
মেয়ের মা আমাকে পছন্দ করেছে সে নিয়ে আমার কোন দুশ্চিন্তা নেই। কেননা এরপর মেয়ে রয়েছে। আট কেলাসে পড়া আধুনিকা মেয়ে। মা যা বলবে, যা এনে দেবে চোখ বুজে সে মেনে নেবে তেমন দিন আজকাল আর নেই। সে ছিল আমাদের মায়েদের কালে। কাজেই শাড়ি পাবার লোভে বউদি যতই চেষ্টা চালাক এ বিয়ে যে হবে না সে বিষয়ে আমি একশো ভাগ নিশ্চিন্ত।
কদিন পরে বউদি আবার এসে আমাকে পাকড়াও করল–কবে মেয়ে দেখতে যাবে বলো? তখন আমি বলি–আমার মেয়ে দেখার কোন প্রয়োজন নেই। তুমি দেখেছো ওতেই হবে। তুমি বরং মেয়েকে নিয়ে এসে একবার আমাকে দেখিয়ে নিয়ে যাও। সে যদি আমাকে দেখে পছন্দ করে তখন না হয় আমি যাব।
আমি যত পিছলে যেতে চাই বউদি তত চেপে ধরে–সে মেয়ে তোমাকে দেখবে না। কেন দেখবে? আমি দেখেছি তার মা দেখেছে–আমাদের উপর তার ভরসা আছে। সে জানে আমরা যা করব তার ভালোর জন্যই করব।
–বোকা মেয়েটার এই ভালো করছো?
–মন্দ করছি না। না তোমার না তার।
মন্দ করছে না। বউদি একখানা দামি শাড়ি পাবে সেটা মোটেই মন্দ নয়। কিন্তু আমি ভাবছি অন্যকথা। আজকের দিনে যে মেয়ে মায়ের কথায় চোখ কান বুজে বিয়ে করে নেয় সে তো এক নির্বোধ। অথবা খুব স্বভাব চরিত্র খারাপ মেয়ে।নতুবা কোন শারীরিক খুঁত আছে। যে কারণে পাত্র পেতে সমস্যা হচ্ছে। এখন চেষ্টা চলছে যার হোক গলায় ঝুলিয়ে দিয়ে আইবুড়ো নামটা ঘুচিয়ে নেওয়া নরেশ ঠাকুরের মুখে শুনেছি গলির কুমারী মেয়েদের নাকি শিলনোড়ার সাথে বিয়ে দিয়ে এঁয়োতি বানানো হয়।
জানতে চাই বউদির কাছে–আমার জীবনের সব কথা তাকে কি বলা হয়েছে? বলে বউদি–বলেছি। কতটা? সবটা? না, কিছু রেখে ঢেকে? বলে সে যতটা আমি জানি। তা সে কী বলেছে? বলেছে যা তার ভাগ্যে আছে তাই তো হবে। আর আমিও তার কথা মানি। বলে না, চুড়ি মিলিয়ে দেয় দোকানদার, আর জুড়ি মিলিয়ে দেয় উপরঅলা। সে যার হাড়িতে যার চাল মেপে রেখেছে তাই তার জুটবে।
অনেকক্ষণ পরে বলি–উপরঅলার উপর যখন তোমাদের এত গভীর বিশ্বাস তবে আর কী! যা পারো করো।
