একদিন খুব ঝগড়া হয়েছিল। ঝগড়ার কারণ সে নাকি কোন বিশ্বস্ত সূত্র থেকে সংবাদ পেয়েছে, আমি কোন একটা মেয়ের সাথে নাকি একটা সম্পর্ক পাতিয়ে রেখেছি। আমার সব রোজগার তারই পিছনে উড়ে যাচ্ছে।
আমি আগে যাদবপুর স্টেশনে থাকতাম। এখনও সেখানে থাকি। আমার রিকশা স্ট্যাণ্ড এখানেই। যে সব মেয়েদের সাথে আগে পরিচয় ছিল তারা সবাই অন্যত্র চলে যায়নি। কেউ কেউ আছে। কেউ কেউ দিল্লী বিহার ঘুরে আবার ফিরে এসেছে। তাদের কারও কারও সাথে দেখা হলে কথা বলে, হয়ত হাসে, নয়তো কাঁদে। তার ধারণায়–এদের সাথে আমার একটা কিছু নিশ্চয় আছে। পুরুষলোক হচ্ছে”কুত্তার জাত”,দশ হাড়ি চেটে বেড়ায়, সেটা সে তার অভিজ্ঞতায় জানে। মেয়েছেলে হচ্ছে “কুত্তির জাত”মদ্দ দেখলেই তার নোলা থেকে লালা গড়ায়, সেটাও তার অজানা নয়। আর চির ধ্রুব হচ্ছে, আগুনের কাছ ঘি থাকলে গলে যায়। আমি গলে গেছি। আমি যে দু কথায় গলে যাই সেটা তার চেয়ে আর বেশি কে জানে!
সেদিন কঁচা কাঁচা খিস্তি খেয়ে মাথাটা গরম হয়ে গিয়েছিল। আমিও তো খুব ভালো মানুষ নই। আমার মধ্যেও তো ঘুমিয়ে আছে একটা বুনো ষাঁড়। সে সেদিন খেপে গেল। মারধোর করে দিলাম ওকে। তারপর চলে গেলাম নিজের কাজে। রাত্রে বাসায় ফিরে দেখলাম–আমার একটা তিন সাড়ে তিনশো পাতার পাণ্ডুলিপি, যা আমি লিখেছিলাম জেলবাসের দিনগুলোর স্মৃতি নিয়ে–তা কুঁচিকুঁচি করে ঘরময় ছড়িয়ে দিয়ে সে তার কাপড় চোপড় নিয়ে চলে গেছে। প্রায় এক বছরের শ্রম বিফলে চলে গেছে আমার। সারা ঘরময় উড়ছে আমার “জেলখানার দিনগুলি”।
আমি তখন তাকে খুন করব বলে খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম। আর সে পালাচ্ছিল। এ ভাবেই সম্পর্ক ছেদ হয়ে গেল তার সাথে।
মহাশ্বেতা দেবীর একমাত্র পুত্রের নাম নবারুণ ভট্টাচার্য–আমরা ডাকি বাপ্পাদা বলে। যিনি কবি গল্পকার উপন্যাসিক এবং অভিনেতা। বিজন ভট্টাচার্যের নাটক ‘নবান্ন’ নামে তার একটা নাটকের দল ছিল। আমি সেই দলের প্রয়োজনে দেবী গর্জন নাটকে একটা ছোট পার্টও করেছিলাম। একবার রবীন্দ্র সদনে আর একবার নাট্য অ্যাকাডেমি মঞ্চে।
বাপ্পাদা থাকেন সদ্য গড়ে ওঠা গলগ্রিনের ফ্ল্যাটে। স্বামী স্ত্রী আর পুত্র “বাউ”, তিনজনের সুখী সংসার। আমি এই বাড়িতেও খুব যেতাম। আমার উপর সে সময় বাউকে রিকশা করে স্কুলে দিয়ে আসা নিয়ে আসার দায়িত্ব বর্তে ছিল। ফলে বালিগঞ্জে মহাশ্বেতা দেবীর ওখানে যাওয়া কমে গিয়েছিল। বাউকে দিয়ে আসা নিয়ে আসার জন্য বাপ্পাদা প্রণতিদি আমাকে মাসে পঞ্চাশ টাকা করে দিতেন। এক বছর পরে বাউয়ের স্কুল বদলে যায়। তখন আর রিকশার দরকার ছিল না।
বাপ্পাদার এক বন্ধু টুলুদা, যিনি নবান্ন নাট্য দলের একজন সদস্য, তিনি ভারত টেলিভিশন কোম্পানীর ক্যাশিয়ার পদে চাকরি করতেন। এই সময় তিনি আমাকে ওই কোম্পানীতে তিনশো পঁচিশ টাকা মাইনের দারোয়ানের কাজ দিয়েছিলেন। প্রায় বছর খানেক করতে পেরেছিলাম সে কাজ! তারপর কোম্পানী সিটু ইউনিয়নের আন্দোলনের জেরে কলকাতা থেকে ব্যবসা গুটিয়ে হায়দ্রাবাদ চলে যায়। আমারও কাজ আর থাকে না।
সে যাই হোক, যখন আমি চাকরি পেয়েছিলাম, যখন চার-পাঁচ মাস কাজ করে বেতন পেয়ে একটু ভালো জামাকাপড় কিনে–পড়ে কিছুটা ভদ্রগোছের হতে পেরেছিলাম আর এক মহিলা আমার পিছনে পড়ে গেলেন–বিয়ে করো। লাফালাফি নাচানাচি তো অনেক করেছ। এবার একটা ভালো মেয়ে বিয়ে করে সুখে সংসার করো।
আমার সেই বন্ধু যার নাম নানু, সাতাত্তরের নির্বাচনের পর সব সি.পি.এম. কর্মীর মতো সেও পাড়ায় ফিরে এসেছে। এখন আর করার মতো কোন কিছু নেই বলে বিয়ে করেছে। টিবি হাসপাতালে সে ওয়ার্ডবয়ের একটা চাকরিও পেয়ে গেছে। মহিলা এইনানুর বড় শ্যালিকা। যাকে আমি বউদি বলে ডাকি। সে হিন্দুস্থান পার্কে আমার কোম্পানীর কাছে এক বাড়িতে রান্নার কাজ করে। আমার সাথে তার মাঝে মাঝে দেখা হয়। আমি তখন কোম্পানীর আরও তিন বন্ধুর সাথে মেস বানিয়ে কোম্পানীর দেওয়া এক ঘরে থাকি। বউদি আমার নামী কোম্পানীর গাড়ি, কাঁচের দরজা, ঘোরা চেয়ার, সুবেশ পোশাক কর্মী, এ সব দেখে ভুলে গেছে। সে ভাবে, তার এই দেওরটি–যার নাম খবরের কাগজে ওঠে, নিশ্চয় কোন বড় চাকরি করে, ভালো মাইনে পায়। তাই তার নিবেদন একটা মেয়েকে উদ্ধার করো।
ঘরপোড়া গরু আমি। মহিলা সঙ্গ যে কত ভয়ানক, যে যম যন্ত্রণায় ভুগেছি আমি আর ও পথে হাঁটতে মনের সায় পাইনা। যেমন আছি বেশ আছি–সুখে আছি। কিন্তু বউদি নাছোড়বান্দাহাতের পাঁচটা আঙুল সমান হয়না। দুনিয়ার সব মেয়ে এক রকম হলে জগত চলত না। কেউ মন্দ কেউ ভালো। আরে হাঁটতে গিয়ে পায়ে হোঁচট লাগে, তাবলে কী মানুষ হাঁটে না? বোঝয় বউদি-মানুষ একা না বোকা। যে মানুষ বিয়ে থা না করে বাউন্ডুলে হয়ে ঘুরে বেড়ায় কেউ তাকে বিশ্বাসও করে না। একদিন দুদিন নয় দিনের পর দিন বউদি আমাকে বোঝাতে থাকে। আমি বুঝে উঠতে পারি না, সব শালাকে ছেড়ে আমাকে চেপে ধরার কারণ কী!
শেষে একদিন বলি তাকে, তুমি নানুর শালি। আমার কথা তোমার তো কিছু অজানা নেই। সাধারণ মানুষের কাছে আমি এখনও এক গুন্ডা ছাড়া আর কিছুই। জেল খেটেছি, একটা মেয়ের সাথে সম্পর্ক ছিল। আমার মত মানুষকে কেউ মেয়ে দেবে না।
