সে সময় আমার অবস্থা পাগলের চেয়ে খুব একটা ভালো ছিল না। ফুটপাতবাসী আজন্ম দরিদ্র কোন মানুষ যদি ঘুম থেকে উঠে শোনে সে কোটি টাকার মালিক হয়ে গেছে তখন তার যা অবস্থা হবে, আমার অবস্থা এখন তাই। কাল পর্যন্ত আমি ছিলাম একজন ফালতু রিকশাঅলা। আজ আমাকে শিক্ষিত মানুষরাও সমীহের চোখে দেখছে। ডেকে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে চা খাওয়াচ্ছে। সবার সঙ্গে পরিচয় করাচ্ছে। এর দেখো, আর শেখো। অধ্যবসায় কাকে বলে। তখন মনে হয় আমি ধন্য। জীবন আমার সার্থক।
সকাল হলেই আমি সব কাজ ফেলে ছুটে যাই বালিগঞ্জ। ট্রেনের টিকিট কাটার পয়সা নেই। বিনা টিকিটে শেষ কামরায় চেপে রানিং ট্রেন থেকে নেমে পিছন দিক থেকে পালাই। এদিকে চেকার থাকে না, তারা ওদিকে–সামনে। সকাল বেলা ও বাড়ি গিয়ে দুপুরে ওখানে খেয়ে ফিরি বিকেল বেলা। মহাশ্বেতা দেবীর ঘরে আলমারি, তাক, ঠাসা গাদাগাদা বই। কোন বাধা নেই, আমি যেটা খুশি নিয়ে পড়তে পারি। এই অল্য রত্ন ভাণ্ডার আমাকে টানে, আটকে রাখে চুম্বক আকর্ষণে। আমার কাছে তখন বিশ্বজগত অসার। সারাক্ষণ শুধু পড়া আর লেখা। রিকশা চালানো, চাল, ডাল, ঘরভাড়া সব তার পরে।
আমি সম্ভবতঃ সেই ভাগ্যবান লেখকদের একজন–যাকে লেখা নিয়ে পায়ের চপ্পল ক্ষয় করে সম্পাদক প্রকাশকদের দরজায় দরজায় ঘুরে বেড়াতে হয়নি। সময়াভাবে লিখতে পেরেছি খুবই কম, তবে যা লিখেছি, কেউ না কেউ এসে সমাদরে নিয়ে গেছে। যে পত্রিকায় পাঠিয়েছি, ছাপা হয়ে গেছে। একদিন জিজীবি ছদ্মনামে পাঁচটা কাগজে পাঁচটা ছোট গল্প পাঠাই হাতিয়ার, রানার, লোক বিজ্ঞান, সিসৃক্ষা এবং বঙ্গবার্তায়। সব কাগজেই আমার গল্প ছাপা হয়ে যায়। এ কারণে আত্মবিশ্বাস আমার আকাশ ছুঁয়ে ফেলে। পারি, আমিও পারি। পিরবো, আমিও পারবো……।
জেলখানা থেকে বের হয়ে রিকশা চালানো শুরু করার কিছুদিন পরে আমি চেয়েছিলাম–কোথাও একটু থিতু হই। হোটেলে খেয়ে–রিকশার পর্দা বিছিয়ে রিকশার গদি মাথায় দিয়ে রেল স্টেশনে ফুটপাতে শুয়ে রাত কাটানো যে জীবন, বৃষ্টি এলে ভেজা, শীত এলে কাঁপা, পুলিশ এলে রাত দুপুরে লাথি মেরে তুলে দেওয়া যে জীবন তা আর তখন ভালো লাগছিল না। চাইছিলাম, আমার একখানা ছোট ঘর হোক। নিভৃতে বসে সারস্বত সাধনার জন্য একটা নিরিবিলি কোণ হোক। কিন্তু তা চাইলেই তো পাওয়া যাবে না।
এই শহরতলিতে কোন বস্তি বা কলোনিতে আমাদের মত নিম্নআয়ের দরিদ্র মানুষকে–বিশেষ করে যারা রিকশা চালায়, তাদের বয়স যদি কম হয়, কোন বাড়িঅলা বিশ্বাস করে একা থাকার জন্য ঘর দেবে না। এমন ধরনের মানুষ, তাদের ধারণায় নির্ভরযোগ্য নয়। ভাড়া বাকি ফেলে পালিয়ে যেতে পারে। পালাবার সময় কার ও মেয়ে কারও বউ ফুঁসলে নিয়ে যেতে পারে। এর চেয়েও যেটা বেশি ভয়ের-হয়ত এ কোথাও কোন ক্রাইম করে এসে এই শহরে রিকশাঅলার ছদ্মবেশে গা টাকা দিয়ে আছে। এমন কেস আগে দু একটা ধরা পড়েছে। যাতে বাড়িওয়ালা ঝুলে গেছে। তাই তারা আর কোন ঝুঁকি নিতে চায় না। তাদের পছন্দ ফ্যামিলি ম্যান ভাড়াটিয়া। তাও যেন ছোট হয়–স্বামী স্ত্রী আর একটা বাচ্চা।
তখন আমার মনে পড়ে গেল পাগলা সরদারের মেয়ের কথা। প্রায় আড়াই বছর তার খবর জানি না। সে কেমন আছে কী করছে, সব অজানা। তবু তাকে একবার এখন খুঁজে দেখা আমার মানবিক কর্তব্য বলে মনে হল। খবর পেলাম সে আজকাল গ্রাম থেকে কলসি ভরে তাড়ি নিয়ে গিয়ে পার্কসার্কাস স্টেশনের কাছে রেল লাইনের উপর বসে বিক্রি করে। বেশ কয়েক দিন খোঁজবার পরে তাকে পেয়ে গেলাম। এবং নিয়ে এলাম সাথে করে। জীবনে আমি আরেকটা ভুল করে বসলাম। প্রথমবার যদি ও ভুল করে থাকে তাবশ্যই এবার আমার।
মানুষ পরিবেশের দাস। জলছাড়া মাছ আর পরিবেশ বিচ্ছিন্ন মানুষ বড় বিপন্ন হয়ে পড়ে। যে পরিবেশ ভাষা ও সংস্কৃতিতে সে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে অন্যের কাছে তা নিন্দনীয় হলেও তার কাছে বড় প্রিয় ও সাচ্ছন্দের এ আমি জেলখানাতেও দেখেছি। আমাদের যে ভাত মেপে দিত তার নাম অনিল। সে বাইরে মোটেই থাকতে চাইত না। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে চলে যাবার এক দেড় মাসের মধ্যে আবার ফিরে আসত। জেলই ছিল তার স্বচ্ছন্দ বিচরণ ভূমি।
আমি ওকে নিয়ে এসে একটা পনের টাকা ভাড়ার ঘরে স্ত্রী পরিচয় দিয়ে রাখলাম। দিতে চাইলাম নিরুপদ্রব নিরুদ্বেগ শান্ত একটা জীবন। যেখানে পুলিশের তাড়া নেই, মাতালের আশ্রাব্য ভাষা নেই। চাইলাম, আমি যেমন নিজেকে বদলে নিয়েছি সে-ও বদলে যাক। কিন্তু সেটা তার পক্ষে সম্ভব হল না। বৃত্তি বদলে গিয়ে ছিল, কিন্তু পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি স্বভাবে, চরিত্রে, ব্যবহারে। সে যে ভাষায় এতদিন তার খরিদ্দারদের সাথে কথা বলেছে, ঝগড়া, নোংরা গালিগালাচ, জামা ধরে টানা সে আমার প্রতিও সেই একই ব্যবহার করে ফেলত। আগেই বলেছি, আমাকে তখন বইপোকায় কামড়ে দিয়েছিল। যে কারণে রিকশা চালানো সে ভাবে পারতাম না। সংসারে অভাব লেগেই ছিল। যা নিয়ে ঝগড়া চেঁচামেচির বিরাম ছিল না। কোন কোনদিন যা মারামারির দিকে গড়িয়ে যেত। কখনও আমি ওকে মারতাম কখনও সে আমাকে। তোক হাসত, বিরক্ত হতো, নিন্দা করত।
আমার তখন লেখক হিসাবে একটু নামটাম হয়ে গেছে। শুধু রিকশাঅলা হলে যা হোত না এখন তা হয়, লোকের নিন্দা মন্দ অপমান বড় গায়ে লাগে।
