বইখানা হাতে নিয়ে নিশ্চল দাঁড়িয়ে উনি তখন কি ভাবছিলেন তা আমি জানিনা। তবে ওনার সারা মুখমণ্ডল জুড়ে ফুটে ওঠা অদ্ভুত এক প্রশান্তির ছবি আমি সেদিন দেখেছিলাম। একজন জনবাদী সাহিত্যিক, যে শ্রমজীবী মানুষদের জন্য লেখেন সেই মানুষরা পরম নিষ্ঠায় তার লেখা পড়ছে, সম্ভবতঃ এটা ওনার ভালো লাগছে।
আমি তখন বিহ্বল হয়ে গেছি। যেন ডুবে গেছি এক মহাঘোরের মধ্যে। কিছুতেই স্বাভাবিক হতে পারছি না। আনন্দে-উত্তেজনায় আমার বুকটা উথাল পাথাল হচ্ছে। যেন এক্ষুণি ফেটে চারদিকে ছড়িয়ে যাবে। আলিবাবার গুপ্তগুহার দরজা যেন হাট হয়ে খুলে গেছে। মহার্ঘ সব সম্পদের সামনে দাঁড়িয়ে আমি দিশেহারা। পাগল পাগল অবস্থা আমার। মন কাঁপছে, শরীর কাঁপছে, জীবন কাঁপছে। আর আমি নিজেকে দুপায়ের উপর দাঁড় করিয়ে রাখতে পারিনা। মাথা আর উঁচু করে রাখতে পারি না। মাথা উঁচু করে রাখার সুযোগ জীবনে বারবার আসে। আসে না নত করার সুযোগ! প্রণাম করার এমন পা আর কবে পাবো। পথের ধুলোয় আভূমি লুটিয়ে পড়ি আমি। রিফিউজি ক্যাম্পের ভাঙা স্কুল ঘরে যে মায়ের পীযুষপানে এক রাখাল বালক তার দগ্ধ জীবন জুড়িয়েছিল। সেই হংসবাহিনী বিদ্যার দেবী এখন তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন মহাশ্বেতা দেবীর রূপ ধরে। সরস্বতীর আর এক নামই তো মহাশ্বেতা। বোকা কালিদাস সরস্বতী দেবীর বরে মহাকবি হয়েছিলেন। আমি সেই দেবীর পায়ের ধুলো পেয়েছি। একটা লেখা লিখতে পারব না?
এক সময় বলেন তিনি-কাল, কালকে তুমি একবার আমার ওখানে এসো। দুপুরে আমার সাথে খাবে। বাস এসে গিয়েছিল। উনি বাসে উঠে আমাকে হাত নাড়লেন। সে হাতে যেন বরাভয় মুদ্রা। যে হাতে চেপে ধরা কলম কামানের নলের মতো আগুন ওগড়ায়, সেই হাত এখন আশিস ছুড়ছে আমার মস্তকে। সেদিন সারাটা দিন সারাটা রাত কেটেছিল অসহনীয় অস্থিরতার মধ্য দিয়ে। কোন কাজে মন বসেনি খিদে লাগেনি ঘুম আসেনি। পরের দিন সকাল সাতটা বাজার আগেই পৌঁছে গিয়েছিলাম বালিগঞ্জ রোডের সেই ঠিকানায় যেখানে থাকেন মানবী মহাশ্বেতা। আমার সামনে লোহার সেই পেঁচানো সিঁড়ি যা পাক খেয়ে খেয়ে উঠে গেছে ওপরের দিকে। যার একটা প্রান্ত সেই মাটিতে প্রোথিত, যেখানে ফুল ফোটে, ফসল ফলে। হ্যাঁ, সেখানে ঘাস আগাছাও আছে। সাপ জোঁক বিছেও থাকে। আর একটা প্রান্ত যা সব মাথা ছাড়িয়ে সব উচ্চতা মাড়িয়ে উঠে গেছে কোন মহাকাশে, যার পরিমাপ করার ক্ষমতা বর্তমানের নেই, সেখানে গোপন রয়েছে অনাগত ভবিষ্যত কালের ইতিবৃত্তের গোপন কন্দরে।
আমি সেই সিঁড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে উপরের দিকে উঠি। ক্যাচকোচ করে সে আমাকে তার নিজের ভাষায় স্বাগত জানায়। সে যেন বলে–আমি সেই সিঁড়ি যেখানে পা রেখে দাঁড়াতে পারলে সব নিচুতা সব নীচতা হীনতা পায়ের কাছে পড়ে থাকে। জিজীবিষা প্রাণ জিতামিত্র জিতাহব হয়ে যায়। আমি সেই সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠি। দোতলা নয় আমি যেন উঠেছি সেই উচ্চতায় যেখানে পৌঁছাবার পর মনে হল আমার সাধনা সফল, জীবন সার্থক হয়ে গেল।
দরজার কড়া নাড়তেই বন্ধ দরজার ওপার থেকে ওনার উচ্চগলা ভেসে এল দরজা খোলা আছে ভিতরে এসে বসো মদন। আমাকে তো উনি দেখতে পাননি, তাহলে কী করে বুঝলেন আমি এসেছি? তবে কী এই সাত সকালে “উতলভীরু” কড়ার শব্দ বলে দিয়েছে ওনার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের কাছে কোন সাংকেতিক ভাষায়–এই সেই কালকের দেখা হওয়া পাগলটা। সারারাত ও ঘুমাবেনা আর এই সাত সকালে আপনার ঘুম ভাঙাতে ছুটে আসবে।
এ সেই ঘর যেখানে বসে উনি লেখেন। আমার সামনে সেই টেবিল, যার উপর লেখার সাজসরঞ্জাম। ওই ঘরে একটা চেয়ারে আমি বসে থাকি। মিনিট দশ-বারো পরে উনি এসে ওনার লেখার টেবিলে বসে পড়েন। একটি মেয়ে এসে দু কাপ চা দিয়ে যায়। এককাপ আমাকে দেয়। চা খেয়ে আমার সঙ্গে নানা রকম গল্প শুরু করেন। আজ রবিবার, ওনার ছুটি। যারা আসছেন তাদেরও ছুটি। আলোচনা হতে থাকল দেশের নানা সমস্যা নিয়ে। যে আসছে তারই সঙ্গে উনি আমার পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন এক লেখক বলে। একে দেখে নাও, আমার নতুন লেখক। বর্তিকার আগামী সংখ্যায় এর লেখা থাকবে, উনি আমাকে লেখক বলছেন। লেখক।
তারপর? তারপর শুরু হল আমার জীবনের সবচেয়ে দুরূহ সবচেয়ে কঠিন এক যাত্রা। যা বোমা পাইপগান চালাবার চেয়েও ভীষণ ভয়ংকর ভয়ানক ভয়াল এক যুদ্ধযাত্রার সমতুল জিগীষা। একটি লেখা তৈরি করার দুর্মর প্রয়াশ। সে যে কী দুরূপ প্রয়াশ! একটা লাইন বেঁকে আর একটা লাইনের উপর উঠে যায়। একটা শব্দের বানান নানা জায়গায় নানা রকম লেখা হয়। কোন শব্দ কোথায় বসালে বাক্য শুদ্ধ এবং সম্পূর্ণ অর্থবহ হয় মাথায় আসে না। পড়ে মনে হয় ধুস। তখন আবার তাকে ছিঁড়ে কুচিকুচি করে নতুন করে লিখতে বসি। কয়েক দিস্তা কাগজ কয়েক লিটার কেরোসিন, কয়েক দিনের কাজ কামাই করে অনেক ধস্তাধস্তির পর একটা লেখা মোটামুটি তৈরি করা যায়। “রিকশা চালাই” শিরোনামে ১৯৮১ সালের জানুয়ারি-মার্চ সংখ্যায় বর্তিকা পত্রিকার পাতায় স্থান পায়।
কবি মনীষ ঘটকের কন্যা ঋত্বিক ঘটকের ভাইঝি, নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্যের স্ত্রী অকাদেমি সাহিত্য পুরস্কারে সম্মানীয় মহাশ্বেতা দেবীতখন তো আর শুধুমাত্র একজন সাহিত্যিকই নন–পাঠক সমাজে সাহিত্যের এক বিশিষ্ট প্রতিবাদী ধারা রূপে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্ব। সেই মহাশ্বেতা দেবীর সম্পাদনায় প্রকাশিত পত্রিকা বর্তিকায় আমার লেখাটি স্থান পেয়ে যাওয়ায়–মানুষের দৃষ্টিপথে এসে গেলাম আমি। যাতে আর একটি বিশেষ মাত্রা যোগ হল যখন যুগান্তর পত্রিকার পাতায় এক পুস্তক সমালোচক আমার লেখাটির প্রশংসা করে দু লাইন লিখে দিলেন। যা আমার উৎসাহকে দশগুণ বাড়িয়ে দিল–আমি পারি। আমি পেরেছি।
