“আমার ভাগ্যে যা এসেছে”। আমার ভাগ্য। সত্যিই আমার ভাগ্য। না হলে উনি আজ আমার রিকশায় উঠবেন কেন?
আমি নাস্তিক এবং তা অতি সচেতন ভাবে। অথবা স্বামী বিবেকানন্দের মত সচেতন আস্তিক যিনি বলেছেন—”যে ভগবান ক্ষুধার্তকে অন্ন দিতে পারে না বিধবার চোখের জল মোছাতে পারে না, মানুষের দুঃখ দূর করতে পারে না আমি সেই ভগবানকে বিশ্বাস করি না।” ভগবানে বিশ্বাস না থাকলে তার ভাগ্যতেও বিশ্বাস থাকার কথা নয়। তবে আমার জীবনে বারবার এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে-সেই “সংযোগ”গুলোকে অন্যকোন শব্দ দিয়ে বোঝাতে না পারা গেলে ভাগ্য শব্দের সাহায্য না নিয়ে উপায় থাকে না। অনিচ্ছা সত্ত্বেও বইখানা রিকশার গদির নিচে চালান করে দিয়ে প্রস্তুত হই আমি।
বেলা সামান্য হেলে গেলেও রোদের তেজ এখনও সমান আছে।শরীর বেয়ে নামছে কুলকুল ঘাম। পথের জনসংখ্যা এখন একটু বেড়েছে। শনিবার হবার কারণে এ সময়ে স্কুল কলেজ ছুটি হয়ে গেছে। যে জন্য ছাত্রছাত্রী শিক্ষক শিক্ষিকারা সব পথে। চলেছে বাড়ির দিকে।
যে প্রৌঢ়া মহিলা এখন এসে দাঁড়ালেন আমার রিকশার সামনে, আমি আগে কখনও দেখিনি। মাথায় কাঁচা পাকা চুল, চোখে চশমা, কাঁধে সাইড ব্যাগ। গভীর গম্ভীর মুখ। দেখেই মনে হয়–উনি শিক্ষিকা। এবং তিনি তাই। জ্যোতিষ রায় কলেজে পড়ান।
উনি যাদবপুরে যাবেন। ওনাকে রিকশায় বসিয়ে চালাতে শুরু করি রিকশা। মাত্র অল্প কিছু পথই পার হয়েছিলাম। তখনই মনে পড়ে যায়, কদিন আগে চাণক্য সেনের একখানা বই পড়েছিলাম। যার মধ্যে একটা শব্দ ছিল–জিজীবিষা। যার মানে আমি জানি না। এখন আমার নাগালে এক বিদ্বান মানুষ পেয়ে মাথায় কিলবিল করে ওঠে আপৃচ্ছা পোঁকারা। এনাকে জিজ্ঞাসা করলে কেমন হয়? আর তখন আগপাছ সাতসতেরো না ভেবে বলে বসি—দিদি কিছু মনে করবেন না, আপনাকে একটা কথা জিগ্যেস করব? জিজীবিষা মানে কি?
উনি সেদিন এক রিকশা চালকের মুখে এমন একটা কঠিন শব্দের অর্থ জানার আকুতি দেখে অবাক হয়েছিলেন নিশ্চয়। বলেছিলেন–জিজীবিষার মানে হচ্ছে বেঁচে থাকা বা বাঁচিবার ইচ্ছা। তারপর পাল্টা প্রশ্ন করেছিলেন এই শব্দ তুমি পেলে কোথা থেকে?
বলি আমি–একটা বই থেকে।
নিস্তব্ধ উত্তপ্ত এক দুপুর। মাথার উপর আগুনের গোলক, ঘাম ঝরছে শরীর থেকে। ভিজে জবজবে হয়ে যাচ্ছি। আমার দৃষ্টি সামনের দিকে। বুঝতে পারছি না তখন উনি রিকশার সিটে বসে কি ভাবছিলেন আমাকে দেখে। কিছু সময় পরে আবার প্রশ্ন করেন উনি–তোমার পড়াশোনা কতদূর। মাঝ পথে তখন ওনার সাথের ছেলেটা নেমে চলে গেছে।
বলি–আমি কোন ইস্কুলে যেতে পারিনি।
–তবে বই পড়ো কি করে?
–নিজের চেষ্টায় সামান্য একটু শিখেছি।
চাকা ঘুরছে। রিকশা এগিয়ে চলেছে। পথ ফুরিয়ে আসছে। কিন্তু কীসের চাকা ঘুরছে? রিকশার না ভাগ্যের? কে এগিয়ে চলেছে?রিকশা, না আমি?কীসের পথ ফুরাচ্ছে। এক সাওয়ারিকে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার? নাকি অপমানিত অপরিচিত অন্ধকার জগতের এক জীবের সম্মানীয় আলোক মঞ্চে দিকে অভিগমনের?
এক সময় বলেন তিনি–আমি একটি পত্রিকা বের করি। তাতে তোমার মতই যারা অল্প লেখাপড়া জানা মানুষ তারা তাদের নিজেদের কথা লেখে। তুমি তোমার কথা লিখবে? লিখলে আমি সেটা ছাপাবো।
আমার ধারণায় যাদের নাম ছাপার অক্ষরে থাকে, যাদের গলা রেডিওতে শোনা যায়, যাদের মুখ টিভি কিংবা সিনেমার পর্দায় ভেসে ওঠে তারা সব এক উচ্চমার্গের মানব। যারা খায় দায় বাজার করে, অফিসে যায় রাস্তায় হাঁটে–তাদের মতো সাধারণ মানুষ কখনই নয়। এবং রিকশা চালাবার মতো ছোটকাজ তো কখনই করতে পারে না। ইনি এক রিকশাঅলাকে সেই অবিশ্বাস্য উচ্চতায় নিয়ে যাবার লোভ দেখাচ্ছেন। যা বিশ্বাস করতে বড় ভয় হয়। একী হয়! হওয়া সম্ভব?
আশ্চর্য হয়ে বলি–আপনি আমার লেখা ছাপাবেন?
–হ্যাঁ। সেটাই তো বললাম। পারবে লিখতে?
–কিন্তু কি বিষয়ে লিখব।
তোমার এই রিকশাচালান সংক্রান্ত জীবন। কিভাবে রিকশা চালাতে এলে। দিনে কত রোজগার হয়। সংসার কি ভাবে চলে। পারবে?
ভয়ে ভয়ে বলি–কোনদিন তো লিখিনি। দেখি চেষ্টা করে। যদি লিখতে পারি গিয়ে আপনাকে দিয়ে আসব। আপনার ঠিকানাটা একটু দিয়ে যান। যাদবপুরের মোড়ে এসে গেছি। রিকশা থামাতে উনি নিচে নেমে ব্যাগ খুলে পেন আর কাগজ বের করে তাতে ওনার নাম আর ঠিকানা লিখে আমার দিকে এগিয়ে দিলেন–এই নাও। চিরকুটে চোখ বুলিয়ে সারা পৃথিবী দুলে গেল আমার। এই পথ, পথের উপর দাঁড়ানো মানুষ, বাস লরি দোকানপাট আকাশ সূর্য-আরও যা কিছু সব দুলছে। দুলে যাচ্ছে আমার জীবন, আমার বর্তমান আমার ভবিষ্যৎ। আমি যেন সেই ছেঁড়া বস্তা কাঁধে এক কাগজ কুড়ানো বালক যে পেয়ে গেছে ছেঁড়া কাগজের গাদায় লুকানো কোন হীরা জহরতের ভাণ্ডার। একী অবিশ্বাস্য ব্যাপার! এমন ঘটনা তো গল্প উপন্যাস সিনেমায় দেখা যায়। বাস্তবে কি সম্ভব? আমি কি এখন জেগে আছি, না ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কোন অলীক স্বপ্ন দেখছি? তখন আমার গলা চিরে বুকের ভিতর থেকে বের হয়ে আসে এক মহাবিস্ময়–আপনি!
–চেনো আমাকে?
চিনি। ভীষণ ভাবে আপনাকে আমি চিনি হে বরেণ্য কথাশিল্পী। সে চেনা শ্রমে ঘামে প্রতিবাদ প্রতিরোধ সংগ্রামে। শোষিত বঞ্চিত মানুষের জন্য আপনার কলম সূর্য সমান ক্রোধে ঝলসে ওঠে। আপনার দ্রৌপদী গল্প পড়ে ওই ধর্ষকদের খুন করব বলে খুঁজে বেড়িয়েছি একদিন, সারাটা দিন। তাদের না পাই তাদের মতো কেউ একজনকে পেলেও চলবে। এসব কথা ওনাকে বলা হয় না। শুধু বলি–আপনার অনেক বই পড়েছি। আপনার ‘অগ্নিগর্ভ’ আমার রিকশার নিচে রাখা আছে। এটাই পড়ছিলাম কিছুক্ষণ আগে। কথা শেষ করে রিকশার গদি খুলে বের করি সেই বইখানা। যার গর্ভে লুকিয়ে আছে আগুন।
