এইট বি স্ট্যান্ডে এসে আমিও ভুলে যাই এক দুপুরে মদ খেয়ে কী করেছিলাম আর না করেছিলাম। সময়ের বেগবান স্রোতে ভেসে যায় আমার সব গতকাল। থাকে শুধু বর্তমান। আর থাকে অদেখা এক ভবিষ্যৎ।
একদিন এখান থেকে ভাড়া নিয়ে গেছি বিজয়গড়ে জাগরণী ক্লাবে। ওখানে একটা রিকশা লাইন আছে। যারা ভাড়া নিয়ে আসে আমরা একটা ফিরতি ভাড়া দিয়ে দিই। ওরাও তাই করে। আমরা গেলে একটা ভাড়া দিয়ে দেয়। এখন তাকিয়ে দেখি আমার আগে আটদশখানা রিকশা লাইন দিয়ে রয়েছে। এখন দুপুর, পথঘাট ফাঁকা তাই রিকশায় সওয়ারি কম ওঠে। যদি প্রতি দশ মিনিটেও একজন সওয়ারি হয় আমার লাইন আসতে দেড় দুঘন্টা। এত সময় ফালতু নষ্ট করা যায় না। তাই রিকশার উপর বসে চোখের সামনে মেলে ধরি একখানা বই।
আমি এই করে থাকি। রিকশা লাইনে লাগিয়ে তার উপর বসে বসে বই পড়ি। সওয়ারি নিয়ে যেখানে যাই, সওয়ারিলমিয়ে কোনলাইনেরিকশা লাগিয়ে যতক্ষশফিরতি ভাড়া না পাই-বই পড়ি। এইভাবে সওয়ারি আনা নেওয়ার ফাঁকে ফাঁকে যতটা পারি পড়ে নিই। আমার হাতে সময় যে বড় কম। এর মধ্যে অপচয় করার মত সময় এক সেকেণ্ডও নেই। ভাবি জীবনটা কেন হাজার বছর হল না। কেন এক একটা দিন হল না আটচল্লিশ ঘন্টার! এত ছোট দিন আর এতক্ষুদ্র জীবনে কি করে আমি এমন বইয়ের বিশাল পাহাড় পড়ে শেষ করতে পারব। বোদ্ধা পাঠকেরা বলেন, শুধু রবীন্দ্রনাথই এক জীবনে পড়ে শেষ করা যায় না। তাহলে বিদ্যাসাগর পাঠাগারের ওই হাজার হাজার বই তার কতটুকু আমি আত্মসাৎ আর আত্তীকরণ করে নিতে পারব? আমার যে সব বই পড়তে হবে। কালিদাস থেকে কোকো পণ্ডিত, রবিবাসরীয় থেকে রবি ঠাকুর, মপাশা থেকে মহাশ্বেতা দেবী, রামায়ণ থেকে রাহুল সংস্কৃতায়ন সব আমার চাই। প্রতিটি বই থেকে আমি কিছু না কিছু শিখি। নতুন কিছু জানতে পারি। বইয়ের সাহায্যে আমি এক অদ্ভুত ভালোলাগার জগতের সন্ধান জেনে গেছি। যে জগতের সন্ধানে পরিব্রাজক হাজার মাইল পথ হেঁটে পৌঁছায় পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তে। প্রাণ হাতে করে ডুবুরি নামে মহা সমুদ্রের অতলে। পর্বতারোহী ওঠে হিমালয় চূড়ায়। বইয়ের মধ্যে আমি পেয়ে যাই সেই সত্য যার সন্ধানে যোগীগণ নির্জন গুহায় কাটান বছরের পর বছর। আগে আমি অন্ধ ছিলাম। এখন ফিরে এসেছে চোখের আলো। সেই আলোয় আমি খুঁজে পেয়েছি চেনা জগতের মধ্যে এক অদেখা অচেনা ভূবন।এ এক নতুন বিস্ময়। এক অনাস্বাদিত স্বাদে অবগাহন।
সেইদিন–এটাও প্রতিদিনের মত একটা অতি সাধারণ দিন। অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে খুঁজেও কোথাও অন্যদিনের চেয়ে কোন পার্থক্য চোখে পড়ার মত নয়। তবে আজ ছিল শনিবার এবং এ বছরের সর্বাপেক্ষা উত্তাপময় একটা দিন। রোদের তাপে পথের পিচগুলো এই সময়ে ফুটছিল বুডবুড করে। একটুও হাওয়া ছিল না। তাই একটা গাছের পাতাও নড়ছিল না। দাবদাহে চারদিক যেন জ্বলে যাচ্ছিল। আকাশ আর মাটির মাঝামাঝি যেন এক অদৃশ্য সুতোয় ঝুলেছিল মধ্যাহ্ন সূর্য। তার বর্শামুখ তীব্র রশ্মিচ্ছটা আছড়ে পড়ে বিঁধছিল আমাদের। এই নিদাঘ দুপুরে আমি রিকশা নিয়ে বসেছিলাম জ্যোতিষ রায় কলেজের পাশে, জাগরণী ক্লাবের সামনে। আর ডুবে গিয়েছিলাম অক্ষরের যক্ষপুরীতে বর্ণময় খেলায়। মসিবর্ণ খুদে খুদে এই অক্ষরগুলোর এক সম্মোহনী শক্তি আছে। যারা কথা বলে, হাঁসায় কাঁদায়, ভাবায় স্বপ্ন দেখায়, সাহসী করে খিদে ভোলায় এবং কোথা থেকে কি ভাবে যেন টের পাবার আগে সময় পার করে দেয়।
এখন যে বইখানা খুলে বসেছি বইখানার নাম অগ্নিগর্ভ। এটা একটা গল্প সংকলন। এর প্রতিটি গল্পের সব চরিত্রই মনে হয় আমার খুব চেনা। আপনজন। সব গল্পেরই কেন্দ্রীয় চরিত্র নিম্নবর্গের একজন শ্রমজীবী মানুষ। সে যেন ওই সমাজের এক প্রতিবাদী প্রতিনিধি। যে হেরে যেতে জানে না। লড়াই করে, মরে, আবার লড়াই করে।
এই বইয়ের লেখিকার প্রতি আমার একটা বিশেষ দুর্বলতা আছে। এক কালে ঘটনাচক্রে নকশাল আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলাম। জেলখানাতেও এদের সাথে অনেকটা সময় কাটিয়েছি। তাদের মুখে বারবার এনার নাম শুনেছি। নকশাল আন্দোলনের এক শহীদ “ব্রতাঁকে নিয়ে ওনার উপন্যাস হাজার চুরাশির মা। যা লিখে উনি নকশালদের মাতৃসমা হয়ে গেছেন। আমি হাজার চুরাশির মা ছাড়াও ওনার অরণ্যের অধিকার পড়েছি। আর এখন পড়ছি অগ্নিগর্ভ। এরপর পড়ব নৈঋতে মেঘ!
বইয়ের মধ্যে এমন ডুবে গিয়েছিলাম যে কখন আমার আগের রিকশাগুলো সব ভাড়া নিয়ে চলে গেছে টের পাইনি। এবার আমরা যাবার পালা। বইখানার আর মাত্র ছয়-সাত পাতা বাকি ছিল। দেখতে পাচ্ছি জ্যোতিষ রায় কলেজের দিক থেকে একজন প্রৌঢ়া মহিলা আসছেন। উনি একা নন সাথে একটি বছর পঁচিশের ছেলেও আছে।এনাকে রিকশাওয়ালা সবাই চেনে। উনি ওই কলেজে পড়ান।এখান থেকে রিকশায় ওঠেন এইট বি বাসস্ট্যান্ডের মোড়ে গিয়ে নামেন। এখনও উঠবেন রিকশায়।
আমার একটু সামান্য ক পাতা পড়া বাকি আছে। পরবর্তী যাত্রী আসার আগে শেষ হয়ে যাবে। তাই আমার পিছনের রিকশাওলাকে বলি, এই প্যাসেঞ্জারটা তুই নিয়ে যা। আমি তোর পরে যাব। বইটার আর পাতা কয়েক বাকি।
ঝাঁঝিয়ে ওঠে সে–বেশি কায়দা করিসনা। তোর চালাকি সব বুঝি। ডবল প্যাসেঞ্জার দেখে নাটক কচ্ছিস। তোর ভাগ্যে যা এসেছে তাই নিয়ে তুই সরে পড়। আমার ভাগ্যে যা আসবে আমি তাই নেব। আমিও তোর মত মানুষ। গরমে তোর যেমন কষ্ট হয় আমারও হয়। বই রাখ আর প্যাসেঞ্জার নিয়ে লাইন খালি কর।
