সেদিন হরির হোটেলে খেতে বসেছে এক নব যুবক স্বামী আর তার যুবতী স্ত্রী। এরা লক্ষ্মীকান্তপুরের দিকের লোক। স্বামী ছেলেটির শহর কলকাতায় আসা যাওয়া আছে। হতে পারে জন মজুর খাটে বা রিকশা টিকশা চালায়। ফলে শহরের বিষয়ে কিছু অভিজ্ঞ। আর গ্রামদেশের লোকের সাধারণত যে শহরভীতি থাকে তা তার নেই। সে তার স্ত্রীকে নিয়ে বাঙুর হাসপাতালে গিয়েছিল ওয়ান-এ বাস ধরে। স্ত্রীর পেটে বাচ্চা। তাকে রুটিন চেকআপ করিয়ে ফিরে এসেছে যাদবপুর স্টেশনে। এবার এখান থেকে ট্রেন ধরে নিজের গ্রামে ফিরে যাবে। বেলা অনেক হয়ে গেছে তাই সস্তার হোটেলে দুটো ডাল ভাত খেতে বসেছে।
কে যেন বলেছেন—”মদ খেলে আমার নেশা হয় না, একথা যে বলে হয় সে মিথ্যা কথা বলে নতুবা মদের বদলে জল খায়।” আমি জল খাইনি তাই নেশা হয়েছে আমার। নেশা হলে আমার চোখ লাল হয়ে যায়, জিভ জড়িয়ে আসে, পা টলে। টলোমলো পায়ে গিয়ে ঝুপ করে বসে পড়ি হরির বেঞ্চিতে—’মাছ ভাত দে হরিদা’! আমার ডানদিকে সেই যুবতী, তার ডান পাশে সেই স্বামী, তারা তখন খাচ্ছে। বাটা মশলা দিয়ে রাঁধা চারাপোনার ঝোল আর ধোয়া ওঠা গরম ভাত, ক্ষিদের সময় তার কী অপূর্ব স্বাদ। প্রথম গ্রাস মুখে দিতেই মনপ্রাণ শীতল। কিন্তু দ্বিতীয় গ্রাস আর মুখে গেল না, ছিটকে ছড়িয়ে গেল মুখ মণ্ডলে-চোখে। কিছুনা বলে আচমকাই স্বামী আমার ডান হাতের কনুইয়ে একটা চড় মেরে দিয়েছে, এসব তারই ফলাফল।
আগেই বলেছি বেঞ্চিষ্টা ছোট, কোনক্রমে তিনজন বসা যায়। আমরা বসেছি তিনজনই, তবে পুরুষ হলে অসুবিধা হতো না। অসুবিধা হয়ে গেছে একজন মেয়ে হওয়ায়। প্রকৃতি মেয়েদের যে স্তন দিয়েছে। আর এই মেয়ে–যার স্তন দুটি সত্যিই অসাধারণ। যেন অহঙ্কারী উদ্ধত্বে বিশ্বদৃষ্টিকে বিধবে বলে ধনুকে জোড়া বাণের মতো তাক করে আছে। মেয়েটির যে স্বামী–সে পুরুষ হবার সুবাদে জানে–নারীর ওই অঙ্গটির কী আকর্ষণ। ট্রেনে বাসে পথে লোভি পুরুষ ও দুটোকে স্পর্শ-মর্দন-পিষ্টন করার জন্য কতরকমের না সুযোগ খোঁজে। তাই সে তার স্ত্রীর ওই অমূল্য সম্পদ দুটিকে আগলে আগলে রাখে। সব সময় সতর্ক দৃষ্টি থাকে যেন কেউ ছুঁয়ে না দেয়–পিষে না দেয়।
আমি নেশার খেয়ালে ছিলাম, বুঝতে পারিনি ভাত মেখে মুখে ভোলার সময় আমার ডান হাতের কনুই মেয়েটি বা স্তনকে ছুঁয়ে ফেলেছে। এমনিতে তো মদ্যপ লোক সাধারণের চোখে এক দুবৃত্ত। আমি মেয়েটির পাশে বসা মাত্রই স্বামী বুঝে গিয়েছিল নিশ্চয় বদ মতলব আছে। এখন হাত বুকে ঠেকা মাত্র তার সন্দেহ সত্যি হয়ে গেল। আর তখনই তার রাগে শরীর জ্বলে উঠল-পেয়েছে কী ব্যাটা মদখোর। আমি বসে আছি, আর আমার সামনে আমার বউকে…। দেখাচ্ছি এর মজা। দ্বিতীয়বার যখন কনুই বুকের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল এক চড়ে থামিয়ে দিল সে। ফাজলামো হচ্ছে। ভাত খাওয়া কারে বলে দেখিয়ে দেবো।
এটা যাদবপুর স্টেশন। এখানে সবাই আমাকে চেনে। আমার হাতে বা হাতে নয়–মাথায় যেন লাথি পড়ে গেছে। হরি দেখেছে, সবাই দেখেছে, ওই একটা ছোট্ট চড়ে স্বামী যেন আমাকে দশহাত মাটির মধ্যে সেধিয়ে দিয়েছে। কাল সবাই বলবে–মদন একটা বউয়ের বুক টিপে মার খেয়েছে। এই লজ্জা আমি কোথায় রাখব। কী দিয়ে ঢাকব? স্বামী ছেলেটা বোকা। ওর সাথে গর্ভবতী স্ত্রী রয়েছে। এই সময় একটু মাথা ঠাণ্ডা রাখা উচিৎ ছিল। কিন্তু আমি এখন কী করি? আমার যে পিছিয়ে আসার উপায় নেই। অন্য কোথাও হলে সরে পড়া যেত। এটা যে আমার নিজের ঘাটি। এখানে আমার অনেক সম্মান। তাই আর এক মুহূর্ত দেরি করিনি, ঘুরিয়ে এক ঘুষি মেরে দিয়েছি স্বামীর মুখে। ঠোঁট ফেটে গরম রক্ত গড়িয়ে পড়ল সামনের ভাতের থালার উপর। কিন্তু সেও হার মানবার ছেলে নয়, উঠে ছুটে গিয়ে তুলে নিল একটা আধলা ইট আর সেটা ছুঁড়ে দিল আমার শরীর লক্ষ্য করে। ইট আমার গায়ে লাগেনি, পাশে পড়েছে। এবার সেই ইটের টুকরো
আমি কুড়িয়ে নিলাম–তুই আমাকে ইট দিয়ে মেরেছিস। এবার আমিও তোকে ইট দিয়েই মারব। ছুঁড়ে দিলাম সেটা স্বামী ছেলেটার দিকে। কিন্তু লক্ষ্য ভ্রষ্ট হয়ে আধলাটা গিয়ে লাগল বউটার গায়ে। সে বাবা গো বলে ঘুরে পড়ে গেল পথের উপর। বউটার পেটে বাচ্চা। এই অবস্থায় জনতা আমার বিরুদ্ধে চলে যাবার কথা। গেলও তাই। স্থানীয় তো নয়, যারা ট্রেনে আসা যাওয়া করে সেই পাবলিক খেপে গেল আমার উপর। বুঝলাম যে এখন অবস্থা খারাপ। আর এখানে থাকা ঠিক নয়। পাবলিক বড়ো ভয়ানক জীব। তারা যা ইচ্ছা তা করে ফেলতে পারে। তাই পালালাম। লাফিয়ে পার হয়ে গেলাম টিবি হাসপাতালের পাঁচিল। ওপারে পড়ে দে দৌড়। আর আমার নাগাল কে পায়।
এরপর পাবলিক স্বামী স্ত্রী দুজনকে নিয়ে স্টেশনস্থ জিআরপিতে আমার নামে একটা অভিযোগ দায়ের করল। আর স্থানীয় কিছু ছেলে হামলা করে দিল স্টেশন ঘিরে ব্যবসা চালান চোলাই ঠেক গুলোর উপর। যত নষ্টের গোড়া তো এই মদই। আজ আমি যা করেছি মদ খেয়ে, কাল তা আর কেউ করে বসবে। তাই চোলাই ঠেক গুঁড়িয়ে দাও। এই তাদের যুক্তি।
সে তো যা হবার তা হলো এবার আমার কী হবে? স্টেশনে যে আর আসা যাবে না। এলেই জি.আর.পি ধরবে। এখন রিকশা কোথায় চালাবো? রিকশা না চালালে পেট চলবে কী করে? তাই চলে এলাম এইট বি বাসস্ট্যান্ডে। এখানেরিকশার কোন ইউনিয়ান এখন নেই। তেমনশৃঙ্খলাবদ্ধভাবে কেউ ভাড়া তোলে না। যে কেউ এখানে খাটতে পারে। এলাকা গরম, এক দুমাস আমাকে এখানে থাকতে হবে। স্টেশন এলাকা একটু ঠাণ্ডা হয়ে গেলে, যে পুলিশগুলো এখন জি.আর.পি ক্যাম্পে থাকে ওরা বদলি হয়ে গেলে আবার স্টেশনে ফিরে যাব। এটা তো নতুন নয়, এই রকম আগে যে কতবার স্টেশন ছেড়ে পালাতে হয়েছে তার কোন গোনাগাথা নেই। সময় এখন বড় বেগবান, ঘটনাবহুল ও সংঘাতময়। মানুষ এক সপ্তাহ আগে কী ঘটেছিল এক সপ্তাহ পরে আর মনে রাখতে পারে না। অথবা আগের ঘটনাকে চাপা দিয়ে দেয় সদ্য সদ্য ঘটে যাওয়া আরো বড় কোন ঘটনা। মানুষ সেটা নিয়ে মেতে ওঠে।
