শ্যামা কলোনীতে ছিলেন সুবোধ চক্রবর্তী নামে এক মাষ্টার মশাই। রবীন্দ্র রচনা সমগ্র, বিভূতি মানিক তারাশংকর এই তিন বাড়ুজ্জে শরৎ আর সতীনাথ ভাদুড়ির বহু বই ছিল ওনার আলমারিতে। উনি বই নিয়ে আসতে দিতেন। পড়ে ফেরত দিয়ে আসতাম। এ ছাড়া কিছুদিন পরে কালীবাড়ি লেনের বিদ্যাসাগর পাঠাগারেরও আমি মেম্বার হয়েছিলাম। মহাশ্বেতা দেবী, সুনীল, সমরেশ, শ্যামল, শীর্ষেন্দু, শংকর সহ বর্তমান সময়ে বাংলা সাহিত্যের বরেণ্য লেখকদের বিভিন্ন রচনা এখান থেকে নিয়ে পড়েছিলাম।
বই মনের খিদে মেটায়, কিন্তু জঠরের আগুন কে নেভাবে? তখন বাধ্য হয়ে আবার সেই পুরনো পেশায় ফিরে যেতে হয়। আবার রিকশা চালাতে শুরু করি। আগে আমার রিকশার গদির নিচে একখানা ভোজালি রাখা থাকত। কখন কোন দরকারে লাগে। এখন সেই জায়গাটি অধিগ্রহণ করে নেয় বই। নশ নিরানব্বই জন মানুষের প্রাণ হরণকারী অঙ্গুলিমাল বুদ্ধের সংস্পর্শে এসে পরিণত হয়ে গিয়েছিলেন এক অহিংসার পুজারিতে। চণ্ডাশোক হয়েছিলেন ধর্মাশোক। পুস্তকের পূত পবিত্র স্পর্শে হয়ে যাই আমি এক অন্যমানুষ। এক গ্রন্থকীট চন্দ্ররেণু। জ্ঞানবান প্রজ্ঞাবান বিদ্বজনের শ্রমের ফসল আত্মসাৎ করে ভরে তুলতে থাকি আমার শূন্যঝুলি। আমার চারপাশে প্রতিনিয়ত কিছু না কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা সংঘটিত হয়, যা আমার মনের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়া শয়তানটাকে জাগিয়ে দিতে চায়। আমি আমার মনকে ধমক দেই আর বলি দূর হটো রত্নাকর, কাছে এসো বাল্মীকি।
আমি এখন ভীষণ রকম স্বার্থপর হয়ে উঠেছি। বিশ্বজগতের বিঘটন আমাকে বিচলিত করে ব্যথিত করে, সক্রিয় করে না। বন্ধু নারান বাস চাপা পড়ে মারা যায়। মোমিনপুর গিয়ে লাশ ময়নাতদন্তের পর আমাদের হাতে দিতে দুঘন্টা দেরি দেখে সেই লাশঘরের পাশে বসে পড়ি মরণের পারে’বইয়ের পাতা খুলে। বন্ধুর মৃত্যুশোক ভুলতে বই আমার বন্ধু হয়। যাদবপুর স্টেশনে সম্প্রতি একটা বইয়ের স্টল হয়েছে। যেখানে একখানা পোস্টার টাঙানো আছে, যদি একদিনের সুখ চাও ভোজন করো, যদি একমাস সুখ চাও ভ্রমণ করো, যদি এক বছরের সুখ চাও বিবাহ করো, যদি সারা জীবন সুখে থাকতে চাও বই পড়ো। ঠিক এখন মনে করতে পারছি না, কে যেন বলেছেন–মেহনতি মানুষ বই ধরো, ওটা হাতিয়ার। আমি সুখের সন্ধানে হাতিয়ার করি বইকে। বই আমার কাছে হয়ে ওঠে সেই বন্ধু যে কখনও বেইমানি করেনা। ৭৭ থেকে ৮১–চারটে বছর কেটে যায় কথাসাহিত্য লোক-সাহিত্য অনুবাদ সাহিত্য ভ্রমণ কাহিনী ধর্মগ্রন্থ প্রবৃন্ধ নিবন্ধ গল্পগ্রন্থ এই সব নিয়ে। সময়ের কোন খেয়াল থাকে না। কেউ আমার পাঠমগ্নতার প্রশংসা করে, কেউ উপহাস। সব “বাইপাস” করে দিই। কোনটাই মনে দাগ কেটে বসে না।
.
কী বিচ্ছিরি আর বিড়ম্বনাময় জীবন। যখন আমি আমার জীবনস্মৃতির পাতা উল্টে অনুসন্ধান করার চেষ্টা করি কোথাও কোন শুভ বা মঙ্গলের সরল প্রাপ্তি আছে কী না তখন বড়ো বিস্ময়ে দেখি তা যদি এসে থাকে, তবে এসেছে কোন না কোন অশুভ অন্যায়ের পথ ধরে। সেই যে একটা গান আছে–আমি যদি হাসি আমার সাথে হাসে–চোখের জল, আমি কাদলে কাঁদে আমার চোখের জল। অর্থাৎ হাসি কান্না সুখ বা দুঃখ সবটাই আবর্তিত হয় অশ্রুকে অবলম্বন করে। আমার জীবনেও তেমনি ভালো বা মন্দ যাই ঘটে থাকুক, ঘটেছে এক অস্বাভাবিক অপরাধীক উপায়ে।
এক সময় আমি সম্পূর্ণ “অন্ধ” অজ্ঞ নিরক্ষর ছিলাম। অন্ধ থেকে চক্ষুন্মান নিরক্ষর থেকে সাক্ষর–জীবনের এতবড় পরিবর্তন সে কি জেলে না গেলে হতো? জেলযাত্রার চেয়ে জীবনে বড়ো অশুভ আর কী কিছু হয়?
এই রকম আর একটা দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটে গিয়েছিল একদিন। যা আমার জীবনে এক বিরাট আশীর্বাদ হয়ে ফিরে এসেছিল। যাকে জীবনের এক মহান সূর্যোদয় বললে খুব একটা ভুল বলা হবে না।
সেটা ছিল এক গ্রীষ্মকালের উত্তপ্ত দুপুর। সেদিন রোদ যেন গলানো সোনার মত ঝরে ঝরে পড়ছিল মাথার উপর স্থিতরাগী সূর্যের শরীর থেকে। সেইদিন আমি একটু চোলাই মদ খেয়েছিলাম। জেলে যাবার আগে তো ব্যাপক খেতাম। এখন “পেলে খাই-পার্বণে খাই”। একেবারে মাদক মুক্ত মহাপুরুষ হয়ে যেতে পারিনি। তা বোধহয় হতেও চাইনি। একটু বইটই পড়তে শিখেছি, আগে যা জানতাম না এখন তা জানি, কিন্তু আমি তো এক জেল খাটা আসামিই। এক রিকশাঅলাও। জগতে কিছু লোক যেমন দুধ ঘি, মাখন খাবার জন্যে জন্মেছে, কিছু লোক তেমনই অখাদ্য কুখাদ্য খাবে। সাক্ষর হয়ে আমার লেজ শিং কিছুই গজায়নি। আছি সেই আগের মতোই অপদার্থের দলে। তাই অখাদ্য খাওয়া অকথা বলা অকাজ করা।
.
সেদিন টিবি হাসপাতালে গুরুপদর ঠেকে বসে এক পাঁইট চোলাই টেনে হাসপাতালের পুকুরে চান টান করে এসে খেতে বসেছি হরির হোটেলে। হরি আগে রিকশা চালাতো। একটা কঠিন রোগ হয়ে যাবার পর আর পারে না। ওকে আমরাই রিকশা লাইনের পেছনে একটা গুমটি বসাবার মতো জায়গা করে দিয়েছি। হাত সাতেক লম্বা হাত তিনের চওড়া এই গুমটিতে বসে হরি ভাত ডাল তরকারি বানায়, বেঁচে। পঁচা-ভাঙা, পুরানো টিন ছাওয়া গুমটির সামনে একটা সরু বেঞ্চ রাখা, এতে চেপে চুপে তিনজন বসা যায়। বেশির ভাগ রিকশাওলাই এখানে খায়। অন্য হোটেলের চেয়ে হরির খাবার পরিমাণে বেশি আর দামেও কম। রান্নাটাও বেশ ভালো। যেমন ভালো গ্রামবাংলার গরিব গুর্বো মানুষেরা পছন্দ করে। একটু ঝাল ঝাল ঝোল ঝোল।
