আমি পুলিশের হাতে ধরা পরার পর, যাদের সাথে আমাকে বা আমার সাথে যাদের জুড়ে দেওয়া হয়েছিল সেই ছয়জন আর্থিক দিক থেকে সক্ষম, তারা সব জামিন নিয়ে বাইরে চলে গেছে। সে-ও প্রায় বছর খানেক হয়ে গেল। হিসেব করলে আমার জেলবাস দু বছর হয়ে গেল। এর মধ্যে পুলিশের পক্ষ থেকে কোন চার্জশিটও দেওয়া হয়নি। যারা একদিন বলেছিল আমার দশ বছর জেল হতে পারে। তারাই এখন বলছে এই কেসে কোন দম নেই। সেটা আমারও বিশ্বাস হল যখন মেজিস্ট্রেট আমার বেল মঞ্জুর করলেন–এক হাজার টাকায়। বুড়ো রতন মুহুরি আমার হয়ে কোর্টে এক হাজার টাকার বন্ড জমা করবে এর জন্য আমাদের তাকে দিতে হবে দশ শতাংশ অর্থাৎ একশো টাকা। কী অভাগা আমি। এতগুলো দিন তো জেলে গেছে আবার মাত্র একশো টাকার জন্য আরও চৌদ্দদিন জেলে থাকতে হল।তখন নরেশ ঠাকুরের কাছে একশো টাকা ছিল না। জেলখানায় আমার চেয়েও আর এক হতভাগাকে দেখেছিলাম–যে পঁচিশ কিলো নুন চুরি করে এগারো মাস জেলে পঁচেছিল। একশো টাকার জামিন দিয়েছিল মেজিস্ট্রেট স্বেচ্ছা প্রণোদিত হয়ে। মালমুদ্দা কেস, তার খালাস দেবার ক্ষমতা ছিল না। তবু বন্দী লোকটা দশটাকা দিয়ে মুক্তি কিনতে পারেনি। পড়েছিল কে খালাস না হওয়া পর্যন্ত।
সে যাইহোক, এরপর একদিন জামিনে মুক্ত হলাম আমি। ততদিনে দুই বছরের চেয়ে সামান্য কিছুদিন বেশি হয়ে গিয়েছিল আমার জেলবাস। তবে তার জন্য তখন আর আমার কোন আক্ষেপ ছিল না। আমার একটা দিনের একটা মিনিটও অপচয় হয়নি। প্রতিটি দিন আমার জীবনকে সমৃদ্ধ করবার কাজে ব্যায় হয়েছে। যিনি আমার এতবড় উপকার করেছেন, আজ থেকে প্রায় পঁচিশ বছর পরে ২০০৬ সালে, সেই পুলিশ অফিসারকে আমি কৃতজ্ঞতা জানাতে গিয়ে শুনব, তিনি রিটায়ার্ড হয়ে গেছেন।
এই পর্ব আমি এখানে শেষ করার আগে আর একটা কথা বলে নিতে চাই ওই কেসে পরে আমি বেকসুর প্রমাণিত হয়ে খালাস হই। সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা ধারণা আছে যে কেউ যদি কোন অপরাধ করে আর পুলিশ যদি তাকে ধরে নিশ্চয় সাজা হবে। কিন্তু ব্যাপারটা এমন নয়। কাউকে শাস্তি দিতে হলে প্রচুর তথ্য প্রমাণ সাক্ষী সাবুদের প্রয়োজন হয়। যেগুলো সংগ্রহের ক্ষেত্রে পুলিশের অনেক ত্রুটি থেকে যায়। যে ফাঁক দিয়ে অপরাধ করেও তোক ছাড়া পেয়ে যায়।
.
আবার আমি ফিরে এসেছি আমার একান্ত আপন বড়প্রিয় ভীষণ ভালোবাসার ভূমি যাদবপুরে। এই শহরটা আমাকে কোনদিন ভালোবাসেনি। অনেক অপমান অত্যাচার দিয়েছে। অনেক রক্তপাত ঘটিয়েছে। তবু একে আমি ভালোবাসি। এই শহরের পথঘাটইট পাথর আমার বড় চেনা। এখানকার গাছপালা রোদ হাওয়া শীত বৃষ্টি সব আমার আপন। আমি জানি, এখনও এই শহরে আমার কিছু শত্রু আছে। তবু এই শহর ছেড়ে কোথাও যেতে মনে সায় পাই না। স্থির করে নিই এখানেই থাকব। এতদিন পরে গণেশ গোপালরা আমাকে কাছে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা, দাদা তুই আমাদের সাথে থাক। আর কোথাও যাস না।
অনেকদিন পরে আজ দলবেধে গরফার ঝিলে গিয়ে চান করলাম। শরীর মন সব হালকা হয়ে গেল। তারপর সবাই মিলে একসাথে ছেচনের হোটেলে গিয়ে খেলাম। আজ যেন এক উৎসব। বড়ভাই বিদেশ থেকে ফিরে এসেছে, ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে এসেছে, সেই খুশিতে সব মাতোয়ারা। খাওয়া দাওয়ার পরে বলে গণেশ, কার্তিক মরে গেছে।
যতদূর মনে পড়ে, সে সময় সাতাত্তরের নির্বাচন হয়ে গিয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গের শাসন ক্ষমতা দখল করেছিল বামফ্রন্ট। তাতা দত্ত, নানু দাস, শিবু রায়চৌধুরী সব পাড়াছাড়া মানুষগুলো ফিরে এসেছিল যে যার পাড়ায়। জেলবন্দী রাজনৈতিক কর্মীদেরও মুক্তি দেবার তৎপরতা শুরু হয়ে গিয়েছিল।
আমি তখন আর কিছুই চাই না। শুধু পড়তেই চাই। মহাবিশ্বের কত কিছু অজানা, তাকে জানতে চাই। হাজার হাজার প্রজ্ঞাবান মানুষের হাজার বছরের অধ্যবসায়ে অর্জিত গুপ্তধন রক্ষিত আছে দু মলাটের মধ্যে। আমি এক পথিক। আমি তা থেকে পথ চলার রসদ আহরণ করে নিতে চাই। সারস্বত অঙ্গনে গলবস্ত্র হয়ে নিতে চাই সেই মহাপাঠ যার সামনে কুড়ি লক্ষ কাঞ্চনমুদ্রা খোলামকুচি হয়ে যায়।
।আমি এখন একবদ্ধ উন্মাদ। জেলখানা থেকে সঙ্গে করে নিয়ে আসা নেশা আমাকে অনবরত তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। বই কোথায় পাবো, বই। স্টেশনে এক হকার বসে। তার কাছে পাওয়া যায় আনন্দবাজার, যুগান্তর, বসুমতি তিনখানা দৈনিক পত্রিকা আর দেশ সহ কিছু ম্যাগাজিন। সকালে সেগুলো খাই। একজন আছে বই বিক্রেতা তার কাছে পাওয়া যায় ঠাকুরমার ঝুলি, শ্রীকৃষ্ণের অষ্টোত্তর শতনাম, সরল এ্যালোপাথি চিকিৎসা, বনৌষধি, লতাপাতার গুণ, স্বপন কুমারের গোয়েন্দা গল্প, কোক শাস্ত্র, রতিবিজ্ঞান, পঞ্জিকা, হস্তরেখা দেখে ভাগ্য জানুন ইত্যাদি। দুপুরে এগুলো হয় আহার। ছেচন সাউয়ের বড় ছেলের “পুরানা শিশি বোতল খবর কাগজ” এর দোকান। এখানে মেলে শুকতারা, উল্টোরথ, প্রসাদ সহ বিভিন্ন পূজা বার্ষিকী। এই পুরানো বাতিল বইপত্রের মধ্যে একবার পেয়ে গিয়েছিলাম একখানা প্রবাসী পত্রিকা। পেয়েছিলাম পোকাকাটা হলুদ পাতা একখানা সঞ্চয়িতা। এতসব গোগ্রাসে গিলেও আমার খিদে মিটল না। উত্তরোত্তর বেড়েই চলল।
টিবি হাসপাতালের সেই তাতা দত্ত, একদিন হামলে পড়লাম তার ঘরে। ওখানে পেলাম ম্যাকসিম গোর্কির মা, জন রীডের দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন সহ প্রচুর মার্কসবাদী সাহিত্য। ভারত সুইটস হোমের দোতলায় ভাড়া থাকতেন অমরনাদ দে নামে এক পত্রিকা-প্রতিবেদক। ওনার সংগ্রহে ছিল বিদেশী সাহিত্যের বাংলা অনুবাদের এক বিশাল ভাণ্ডার। তবে বই তিনি নিয়ে আসতে দিতেন না। ওনার রুমে বসে যতক্ষণ ইচ্ছা পড়ে আসায় বাধা ছিল না কোন। এখানে এসে বই পড়ায় আমার লাভই হোত। সকালে টিফিন দুপুরে ভাত পাওয়া যেত। আমি সামনে বসে থাকলে অমরদা কী করে আমাকে না দিয়ে খেতে পারেন?
